প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৩ এপ্রিল ২০২৩ ১৯:৫১ পিএম
আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২৩ ১৩:২৯ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
বাংলাদেশে করপোরেট খাত, ব্যক্তি খাত ছাড়াও বিভিন্ন খাতে কর ফাঁকি ও কর এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, যা কর স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে বড় ঘাটতি। আর্থিক অঙ্কে এর পরিমাণ ৫৫ হাজার ৮০০ কোটি টাকা থেকে ২ লাখ ৯২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। যা আদায় করা হলে বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা খাতে ৮ গুণ এবং স্বাস্থ্য খাতে দ্বিগুণ বরাদ্দ রাখা সম্ভব।
এদিকে দেশে ৬৮ শতাংশ মানুষ করযোগ্য আয় করার পরও আয়কর দেন না। এর বাইরের একটি বড় অংশ হচ্ছে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত। তবে এ খাতের করপ্রাপ্তি তুলনামূলকভাবে খুবই কম। এসবের অন্যতম কারণ কাঠামোগত দুর্বলতা। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে করজালের আওতা বৃদ্ধি করা, কর অব্যাহতি দেওয়ার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসার পরামর্শ দিয়েছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
সোমবার (৩ এপ্রিল) ‘করপোরেট খাতে কর স্বচ্ছতা এবং জাতীয় রাজস্ব ও বাজেটে এর কী প্রভাব পড়তে পারে’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এ তথ্য তুলে ধরেন।
কর অব্যাহতির নির্দিষ্ট সময় ও লক্ষ্য, আর্থিক খাতের সমন্বিত লেনদেন, এ সম্পর্কিত রিপোর্ট স্বচ্ছ, ডিজিটালাইজেশন ও ইন্টারনেটভিত্তিক লেনদেন এবং কর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানগুলোর বাধ্যতামূলক প্রতিবেদন তৈরি প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন সিপিডির এই পরিচালক।
ট্যাক্স জাস্টিস নেটওয়ার্কের ২০২২ সালের রিপোর্ট তুলে ধরে তিনি বলেন, ’প্রতিবছর সারা বিশ্বে প্রায় ৪৮৩ বিলিয়ন ডলার কর ক্ষতি হচ্ছে শুধু কর ফাঁকি ও কর এড়ানোতে। এর মধ্যে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে ক্ষতি ৩১২ বিলিয়ন ডলার এবং ব্যক্তি পর্যায়ে সম্পদশালীদের মাধ্যমে ১৭১ কোটি। কিন্তু এর মাধ্যমে অভিঘাত পড়ে স্বল্প আয়ের দেশগুলোর ওপর। এর কারণে স্বাস্থ্য খাতের ৪৮ শতাংশ বাজেট কমে যায়।‘
তিনি আরও বলেন, ’বৈশ্বিক পর্যায়ে করপোরেট করহার কমে আসছে। দুর্ভাগ্যবশত বাংলাদেশে বেড়েছে। করপোরেট করহার কমিয়ে করজাল বাড়িয়ে কর আদায় জরুরি। বাংলাদেশ করপোরেট করহার দক্ষিণ এশিয়ার ভেতরে সর্বোচ্চ। কিন্তু কর-জিডিপি অনুপাত আফগানিস্তানের পরে সর্বনিম্ন। পারসোনাল ও সেলস ট্যাক্স কম না, কিন্তু সেটা আমরা নিতে পারছি না। উচ্চ করহার দিচ্ছি ঠিকই, কিন্তু তার যে সুফল সেটা আমরা ভোগ করতে পারছি না। আবার কর কমিয়ে দিলেও রাজস্ব বাড়ে, সেটারও নিশ্চয়তা নেই। দক্ষিণ এশিয়ায় কর-জিডিপি অনুপাত এবং করহারের মধ্যে ফারাকটা বাংলাদেশে সর্বোচ্চ। এর প্রধান কারণ কর কাঠামোর দুর্বলতা।’
সিপিডির গবেষণায় তুলে ধরা হয়েছে, দেশের অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের আকার ৩০ শতাংশ। অথচ কর-জিডিপি অনুপাত ৯ শতাংশ। ব্রাজিলের অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতির আকার ৩৩ শতাংশ। কিন্তু তার কর-জিডিপি অনুপাত ৩২ শতাংশ। অন্যদিকে চীনের জিডিপিতে অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতির আকার ১২ দশমিক ৭ শতাংশ। কিন্তু দেশটির কর-জিডিপি অনুপাত ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, যদি কর প্রশাসন শক্তিশালী হয়, তাহলে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত থেকেও কর আদায় বাড়ানো সম্ভব।
গবেষণায় দেখানো হয়েছে, বাংলাদেশে ২০১০ সালে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে করের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার কোটি টাকা, যা ২০২১ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৪ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ছায়া অর্থনীতিতে ৮৪ হাজার কোটি টাকা কর ক্ষতি হচ্ছে। সে হিসাবে ১১ বছরের ব্যবধানে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে করের পরিমাণ বেড়েছে চারগুণ। যা জিডিপির প্রায় ৩০ শতাংশ। এই টাকা যদি পাওয়া যেত, তাহলে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় তিনগুণ বৃদ্ধি করা যেত। ফলে কর ক্ষতি দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সিপিডির গবেষণায় বলা হয়েছে, ৬৮ শতাংশ তথা দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ করযোগ্য আয় করার পরও আয়কর দেন না। বিপুল পরিমাণ কর আওতার বাইরে থেকে যাওয়া কর-জিডিপির জন্য মাথাব্যথার কারণ। কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি না হওয়ার বড় কারণ এটি। অন্যদিকে জয়েন্টস্টক কোম্পানিতে ২ লাখ ১৩ হাজার কোম্পানি রেজিস্ট্রার্ড হলেও রিটার্ন দাখিল করে মাত্র ৪৫ হাজার কোম্পানি।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম আরও বলেন, ’কর অসচ্ছতাকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। কর ফাঁকি ও কর এড়ানো। কর ফাঁকি দিতে গিয়ে কোম্পানি তার প্রকৃত আয় কম দেখিয়ে থাকে, অন্যদিকে কর এড়ানোর বিষয়টি হলো লিগ্যাল ফ্রেমের আওতায় সরকারের দেওয়া সুবিধা নিয়ে থাকে। আমাদের দৃষ্টিতে এটাও কর অস্বচ্ছতা।’
তিনি বলেন, ’সরকারের ছাড়, বিভিন্ন ধরনের সুবিধা, ট্যাক্স ব্রেক, ইনসেনটিভ—যেগুলো আসলে সরকারের রাজস্ব ব্যয়, সেটির সুবিধা দিয়ে থাকেন। এটি কিন্তু বৈধ। কিন্তু কর ফাঁকি অবৈধ। একটি বৈধ এবং একটি অবৈধ। কিন্তু দুটিই কর স্বচ্ছতার পরিপন্থি। সরকার বিভিন্ন সুবিধা দিয়ে থাকেন বিভিন্ন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। কিন্তু একটি আদর্শ কাঠামোতে বলা হয়ে থাকে, এই জায়গাগুলো সমতাভিত্তিক হওয়া দরকার।’
কর ফাঁকি ও কর এড়াতে আর্থিক তথ্য লুকাতে বা গোপন করার প্রবণতা বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ’বৈশ্বিক ইনডেক্সে কর ফাঁকি ও কর এড়াতে আর্থিক তথ্য গোপন করার প্রবণতায় ১৪১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৫২তম। বাংলাদেশ ২০২২ সালে আগের বছরের চেয়ে দুই ধাপ পিছিয়েছে মানে দেশে আর্থিক তথ্য গোপনের প্রবণতা বেড়েছে।’
কর ক্ষতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ’রাজস্ব কর্মকর্তা ও অডিটরদের সঙ্গে কথা বলে যে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, তা হলো, কর ফাঁকি ও কর এড়ানোর মাত্রা ব্যাপক। কেউ কেউ বলছেন, কর ক্ষতি যেটি হচ্ছে কর এড়ানোর জন্য সেটি ৫ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। আর কর ক্ষতি যেটি হচ্ছে কর ফাঁকির জন্য, সেটি ১৫ শতাংশ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। একটি পূর্ণাঙ্গ তথ্য বলা খুব কঠিন। কেউই এটি বলেনি যে বাংলাদেশে কর ফাঁকি হচ্ছে না।’
তিনি বলেন, ’কর ফাঁকি যদি ৮০ শতাংশ হয়, তাহলে ২ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকার মতো রাজস্ব হারাচ্ছি। যদি এটি ৫০ শতাংশ ধরা হয়, তাহলে রাজস্ব হারায় ৪১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। ৪১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা থেকে ২ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকার মতো আমাদের বাড়তি কর আদায়ের সুযোগ রয়েছে।
’অন্যদিকে কর এড়ানোতে যে ব্যয় হচ্ছে, সেটা যদি ৫-২৫ শতাংশ পর্যন্ত হয়, তাহলে সেটার পরিমাণ ১৪ হাজার কোটি টাকা থেকে ৬৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকার মতো। এই বিপুল পরিমাণ রাজস্ব সরকার পাচ্ছে না।’
এ সময় সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ’একটি যৌক্তিক, প্রগতিশীল ও সুষম করব্যবস্থা জাতীয় উন্নয়নের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। করব্যবস্থার মাধ্যমে সরকার আয় করে এবং সেই আয়টাই বিভিন্ন জাতীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে ব্যয় হয়ে থাকে। আমরা যত স্বচ্ছভাবে, যত ভালোভাবে এই করব্যবস্থা আধুনিক করতে পারব এবং করব্যবস্থা থেকে কর আহরণ করতে পারব, তত ভালোভাবে ব্যয়ের জন্য সুযোগ থাকবে। এজন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ সম্পদ সঞ্চালন। এর অন্যতম একটি উৎস হচ্ছে করপোরেট খাতের কর এবং সারা বিশ্বেই এই করপোরেট খাতের কর নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা-সমালোচনা এবং কীভাবে আরও স্বচ্ছতার মধ্যে আনা যায়, সেটা নিয়েও অনেক প্রচেষ্টা আছে।’
তিনি বলেন, ’শুধু করপোরেট খাতেই নয়, বিভিন্ন খাতে, ব্যক্তি খাতেও কর এড়িয়ে যাওয়া কিংবা কর ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। এ ছাড়া করের নীতিমালাগুলোর ফাঁক-ফোকর ব্যবহার করে কম কর দেওয়ার একটা চেষ্টা বিশ্বব্যাপীই রয়েছে। এর মাধ্যমে সামগ্রিকভাবে জাতীয় উন্নয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’