× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বোঝা শুধুই বাংলাদেশের কাঁধে

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশ : ২৫ আগস্ট ২০২২ ১২:১৭ পিএম

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০২২ ১২:২০ পিএম

রোহিঙ্গা ক্যাম্প। ফাইল ছবি

রোহিঙ্গা ক্যাম্প। ফাইল ছবি

করোনা মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতসহ একের পর এক বৈশ্বিক সংকটের মুখে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে রোহিঙ্গা ইস্যুর গুরুত্ব অনেকটাই ম্লান হয়ে পড়েছে। এর ফলে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য মানবিক সহায়তার পরিমাণও দিন দিন কমছে। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিয়েও নেই কোনো অগ্রগতি। এমন হতাশাজনক প্রেক্ষাপটে রোহিঙ্গা সংকটের আরও একটি বছর পার করল বাংলাদেশ। পাঁচ বছর পর রোহিঙ্গারা এখন শুধুই বাংলাদেশের বোঝা। 

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিভিন্নভাবে দায় এড়ালেও গাম্বিয়ার করা মামলায় মিয়ানমারের আপত্তি প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় আন্তর্জাতিক আদালতে রোহিঙ্গা গণহত্যার ঘটনায় ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিশ্চিতের জন্য বাংলাদেশকে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। 

সংকট বাড়ছে প্রতিনিয়ত : ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের ওপর ভয়াবহ নিষ্ঠুরতা ও গণহত্যা শুরু করে মিয়ানমারে সামরিক বাহিনী। প্রাণ বাঁচাতে নিজ দেশ থেকে পালিয়ে নাফ নদী পাড়ি দিয়ে দলে দলে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে থাকে। ওই বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা এসে ঠাঁই নেয় কক্সবাজারে। 

অবশ্য নির্যাতনের ভয়ে গত তিন দশকে পালিয়ে আসা আরও অন্তত তিন লাখ রোহিঙ্গা আগে থেকেই বাংলাদেশে অবস্থান করছিল। নতুন ঢলের পর আরও অন্তত দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। সব মিলিয়ে প্রায় সাড়ে ১১ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী হিসেবে বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়। 

এর কিছুদিনের মধ্যে রোহিঙ্গাদের দেশে ফেরত পাঠানো যাবে বলে ধারণা করা হলেও পাঁচ বছর পর এখনও মিয়ানমারে তাদের ফেরার অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়নি। এখনও মাঝেমধ্যেই মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অভিযানের খবরও পাওয়া যাচ্ছে। 

জাতিসংঘ এ মুহূর্তে রোহিঙ্গা সংকটকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক সংকট হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও এর সমাধানে গত পাঁচ বছরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা দেখা যায়নি। 

বরং গত পাঁচ বছরে রোহিঙ্গাদের জন্য সহায়তার পরিমাণ ক্রমাগত কমেছে। জাতিসংঘ-সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সংকট মোকাবিলায় ৯২ কোটি ডলারের চাহিদা ছিল। ওই বছরের ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত সংগ্রহ হয়েছে মাত্র ৬২ কোটি ডলার। অর্থাৎ ২০১৯ সালে মোট চাহিদার মাত্র ৬৭ শতাংশ অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে।

এর আগের বছরগুলোতেও চাহিদার শতভাগ তহবিল জোগাড় করা যায়নি। ২০২১ সালেও সংগ্রহ করা গেছে চাহিদার মাত্র ৬০ শতাংশ। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকও অর্জিত হয়নি। গতকাল বুধবার জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়। ওই বিবৃতিতে মানবিক সংকটে থাকা রোহিঙ্গাদের ভুলে না গিয়ে তাদের পাশে থাকার জন্য আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ও দেশের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বাড়ছে অপরাধ : পুলিশের তথ্য অনুযায়ী গত পাঁচ বছরে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে ৯৯টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল রোহিঙ্গা নেতা মহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ড। এ ঘটনা বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তুলেছে। 

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা হত্যা, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, মানবপাচার, অপহরণ, অগ্নিসংযোগ, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই এবং ধর্ষণসহ ২১ ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। এসব অপরাধের অভিযোগে গত ৫ বছরে ১ হাজার ৯০৮টি মামলা হয়েছে। 

এ ছাড়া সর্বনাশা মাদক ইয়াবা চোরাচালানের ক্ষেত্রেও বাহক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে রোহিঙ্গারা। 

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন জানিয়েছেন, রোহিঙ্গা পরিস্থিতি খুবই জটিল অবস্থায় আছে। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে রোহিঙ্গারা মাদক ও মানব পাচারের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তারা জঙ্গিবাদের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়তে পারে। 

স্থবির প্রত্যাবাসনের কূটনীতি : কোভিড-১৯ মহামারি এবং এরপর ইউক্রেন সংকটের কারণে এখন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ এখন নেই বললেই চলে। এই অবস্থায় রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আরও দীর্ঘ সময় রেখে বাংলাদেশকে আরও বেশি সহায়তা দেওয়া যায় কি না সেটা নিয়েও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে আলোচনা চলছে। 

একাধিক সূত্র জানায়, বাংলাদেশ চীনের কথায় বিশ্বাস রেখে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় প্রত্যাবাসন চুক্তি করেই কূটনীতির চোরাবালিতে আটকে যায়। সেই চোরাবালি থেকে বাংলাদেশ আর বের হতে পারেনি। এখন অবস্থাটা বিশ^জুড়ে যত জায়গায় বাংলাদেশ প্রত্যাবাসন নিয়ে কথা বলছে, প্রতিটি ক্ষেত্রে মিয়ানমার দ্বিপক্ষীয় চুক্তির বিষয়টি সামনে নিয়ে এসে বলছে, তারা চুক্তি অনুযায়ী পদক্ষেপ নিচ্ছে, আলোচনা চলছে।

চীনও এই চুক্তির কথা তুলে ধরে মিয়ানমার চুক্তির পথ ধরেই এগোচ্ছে এমন বার্তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে দিচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিভ্রান্ত হচ্ছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনেও এই চুক্তি একটা গোলকধাঁধা তৈরি করে রেখেছে। দুটো দেশ যখন একটা চুক্তি করেই ফেলেছে, অতএব সংকট সমাধানে তারা চূড়ান্ত ধাপেই আছে। অতএব দেখা যাক, কী হয় এমন একটা অবস্থানে থেকে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। 

রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশ-মিয়ানমারের দ্বিপক্ষীয় ইস্যু দেখিয়ে রোহিঙ্গা সংকটে মিয়ানমারকে সমর্থন দেওয়া চীন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদেও আলোচনাই তুলতেই দেয়নি। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডাসহ পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোও রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে মিয়ানমারের ওপর কার্যকর কোনো চাপ প্রয়োগ করেনি। বরং নানাভাবে মিয়ানমারের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়িয়েছে। আসিয়ানের মতো আঞ্চলিক জোটগুলোও রোহিঙ্গা সংকটে কোনো ভূমিকাই নিতে পারেনি। 

যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা : একশনএইড বাংলাদেশ, সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড জাস্টিস এবং সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজের যৌথ উদ্যোগে গতকাল রাজধানীতে ‘রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ : আশায় অনিশ্চয়তা’ শীর্ষক এই গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষজ্ঞরা বলেন, আন্তর্জাতিক আদালতের কিছু বড় সিদ্ধান্ত সত্ত্বেও পাঁচ বছরে রোহিঙ্গাদের ন্যায়বিচার নিশ্চিতে সামান্যই অগ্রগতি হয়েছে। জাতিসংঘ এবং আসিয়ানের ভূমিকা আরও শক্তিশালী হওয়া উচিত। 

গোলটেবিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়র আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ও সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজের ডিরেক্টর ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের পাঁচ বছর হয়ে যাওয়া এবং ভাগ্যের কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন না হওয়াার ফলে তারা অধৈর্য হয়ে পড়েছেন। কিন্তু শরণার্থীদের ক্ষেত্রে দুই থেকে তিন প্রজন্ম ধরে আটকে থাকার নজির রয়েছে অনেক। এই সংকট সমাধানে রোহিঙ্গাকেন্দ্রিক কণ্ঠস্বর শোনারও আহ্বান জানান। এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে রোহিঙ্গা সংকট সম্পর্কিত ইতিবাচক অগ্রগতি, যেমন আইসিজে কর্তৃক ঘোষণার পর রোহিঙ্গাদের নিজস্ব পরিচয়ে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রশংসা করেন।

রিসার্চ ইনিশিয়েটিভস, বাংলাদেশের (আরআইবি) নির্বাহী পরিচালক মেঘনা গুহঠাকুরতা বলেন, সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের মতো নাগরিক নয় এমন যেকোনো ব্যক্তির সুরক্ষার অধিকার রয়েছে। এটি বাস্তবতা যে প্রত্যাবাসনে কিছুটা সময় লাগবে। সুতরাং, তারা এখানে থাকাকালীন আমাদের সৃজনশীল সমাধান এবং মিয়ানমারসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক সমাজ ও সংস্থাগুলোর মধ্যে যোগাযোগের প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে। 

বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআরের প্রতিনিধি জোহানেস ভ্যান ডের ক্লাউ বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের আশা বাঁচিয়ে রাখতে হবে। ক্যাম্পে যেসকল কার্যক্রম চলছে সবই রোহিঙ্গাদের কল্যাণের কথা মাথায় রেখে করা হচ্ছে। কোনোভাবেই রোহিঙ্গা সংকটকে বৈশ্বিক নেতাদের অগ্রাধিকারের এজেন্ডা থেকে সরানো যাবে না।’ তিনি রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবকদের জন্য উপবৃত্তি এবং শিশুদের জন্য মিয়ানমারের পাঠ্যক্রমে শিক্ষার বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সাম্প্রতিক দুটি বড় চুক্তির কথাও উল্লেখ করেন। 

অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির বলেন, ‘রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বর্তমান প্রয়োজনে সহায়তা করার জন্য আমরা সবাই ক্যাম্পে কাজ করছি, কিন্তু তাদের নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা থেকে মনোযোগ সরানো যাবে না। আমাদের সর্বদা মনে রাখতে হবে যে কেউ শরণার্থী হতে চায় না।’ 

প্রবা/ইউরি/


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা