রাহাত হুসাইন
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ২ ঘণ্টা আগে
ডিএসসিসির নির্মাণাধীন ঢাকেশ্বরী রোডসাইড মার্কেটে জমে থাকা পানি হয়ে উঠেছে মশার প্রজননক্ষেত্র। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
রাজধানীজুড়ে এডিস মশা ও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে চিরুনি অভিযান চালাচ্ছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন।
শহরের বাসিন্দাদের বাসাবাড়ি বা বেসরকারি কোনো স্থাপনায় মশার লার্ভা মিললেই ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে করা হচ্ছে মোটা অঙ্কের জরিমানা।এ ছাড়া নাগরিকদের প্রতি সচেতন হওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
অথচ দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নিজস্ব একটি নির্মাণাধীন মার্কেটই এখন মশার বিশাল কারখানায় পরিণত হয়েছে। তাও আবার মশা মারার মূল কেন্দ্র ‘ঢাকা মশক নিবারণী দপ্তর’-এর ঠিক নাকের ডগায়।
পুরান ঢাকার লালবাগে ঢাকেশ্বরী মন্দির এলাকার পাশেই নির্মাণাধীন ‘ঢাকেশ্বরী রোড সাইড মার্কেট’ নামের এই প্রকল্পস্থানের চারপাশে টিনের বেড়া দেওয়া। দক্ষিণ পাশেই রয়েছে শহিদ আব্দুল আলীম মাঠ এবং মাঠের ঠিক পেছনে নূর ফাতাহ লেনে অবস্থিত ঢাকা মশক নিবারণী দপ্তর। এই দপ্তরের মূল কাজ পুরো রাজধানীর মশা নিয়ন্ত্রণ করা; অথচ এটির সীমানাপ্রাচীরের কাছেই এই নির্মাণাধীন প্রজেক্টটি হয়ে উঠেছে মশার সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল।
সরকারি এই সংস্থার বেহাল অবস্থায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের প্রশ্ন, সাধারণ মানুষের আঙিনায় লার্ভা মিললে যদি জরিমানা হয়, তবে সিটি করপোরেশনের এই চরম গাফিলতির জন্য তাদের জরিমানা করবে কে?
২০১৭ সালের ২ অক্টোবর এই মার্কেটটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। তবে ভবনটির বেজমেন্ট এবং গ্রাউন্ড ফ্লোরের ছাদ ঢালাই করার পরপরই এর নির্মাণকাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। ২০২৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির পর এগোয়নি কাজ। ঠিকাদারকে কয়েক দফা চিঠি দিলেও প্রতিষ্ঠানটি তা পাত্তা দেয়নি। দীর্ঘদিন প্রকল্প ঝুলিয়ে রাখায় শেষ পর্যন্ত ওই ঠিকাদারের কার্যাদেশ বাতিল করে ডিএসসিসি।
তবে ঠিকাদার বিদায় হলেও বন্ধ হয়নি এডিসের বংশবিস্তার। কাজ বন্ধ থাকায় ভবনের উন্মুক্ত বেজমেন্ট, অসমাপ্ত ফ্লোর, খোলা পিলারের বেস ও ড্রেনেজবিহীন গর্তে দীর্ঘদিন ধরে বৃষ্টির পানি জমে রয়েছে। অনেক জায়গায় জমে থাকা পানি পচে কালচে হয়ে গেছে এবং শ্যাওলা পড়েছে। এই জমে থাকা পানি নিয়মিত অপসারণ বা ভবনটি পরিষ্কার করার কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ এখনো চোখে পড়েনি।
শহিদ আব্দুল আলীম মাঠ সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা ও সাবেক ক্রিকেটার মাসুদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “সন্ধ্যা নামলেই মাঠের যে কোনও স্থানেই দাঁড়িয়ে থাকা মুশকিল হয়ে পড়ে। মশা যেন খাবলে ধরে। সিটি করপোরেশনের এই মার্কেটের কাজ দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। মার্কেটটির নিচে বৃষ্টির পানি জমে মশার প্রজনন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে”।
এলাকাবাসীর ক্ষোভ, সাধারণ মানুষের বাড়ির টবে বা উঠানে সামান্য পানি জমলে ম্যাজিস্ট্রেট এসে জরিমানা করে যান; অথচ সিটি করপোরেশনের এত বড় প্রজেক্টে বছরের পর বছর পানি জমে মশার চাষ হলেও তা নিয়ে কার্যত কোনো নজরদারি নেই।
এদিকে রাজধানীর মশার উপদ্রব বৃদ্ধি ও ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ে স্বয়ং ঢাকা মশক নিবারণী দপ্তরও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। গত ৮ জুন মশক নিধন কার্যক্রম আরও গতিশীল করার লক্ষ্যে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে একটি বিশেষ চিঠি দিয়েছেন দপ্তরের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. রবিউল ইসলাম।
চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, সম্প্রতি ঢাকা মহানগরীতে মশার উপদ্রব ও ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। এই পরিস্থিতি থেকে নগরবাসীকে রক্ষার লক্ষ্যে দুই সিটি করপোরেশনে মশক নিবারণী দপ্তর থেকে সংযুক্ত কর্মচারীদের যথাযথভাবে কাজে নিয়োগসহ মশক নিধন কার্যক্রম আরও গতিশীল করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “বিষয়টি নির্দিষ্ট করে আমাদের জানান, আমরা ব্যবস্থা নেব”। বৃষ্টির পানি জমে থাকার বিষয়ে তিনি মন্তব্য করেন যে, “বৃষ্টির পানি বের করে দিলে আবার জমবে। তবে নির্মাণাধীন মার্কেটের খোঁজখবর নিয়ে মশার প্রজনন ধ্বংসে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে”।
করপোরেশনের এমন ভূমিকার বিষয়ে সমালোচনা করে নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “সিটি করপোরেশন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। তারা জরিমানা আদায় করে আমাদের অনুশাসন দেয়। তাদের নিজেদের যত ধরনের মার্কেট ও স্থাপনা আছে, সেগুলোর সর্বোচ্চ তদারকির জন্য একটা শক্তিশালী ব্যবস্থাপনা থাকা উচিত। এখানে কারও গাফলতি থাকলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। করপোরেশন নিজেই যদি এমন ভুল করে, তাহলে নাগরিকদের কাছে তাদের নৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়ে যাবে”।
মশা নিয়ন্ত্রণের মূল যুদ্ধটা যদি সিটি করপোরেশন নিজের আঙিনা থেকেই শুরু করতে না পারে, তবে পুরো রাজধানীজুড়ে এই অভিযান কতটা সফল হবে তা নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন নাগরিক অধিকার ভিত্তিক সংগঠন সেন্টার ফর সিটিজেনস রাইটস (সিসিআর)-এর আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট নোমান সালমান। তিনি বলেন, “শুধু নগরবাসীকে জরিমানা করলে হবে না। সিটি করপোরেশনসহ রাজধানীতে চলমান অন্যান্য সরকারি প্রকল্পগুলোতেও নিয়মিত খোঁজ নিতে হবে, যাতে সেখানে কোনোভাবেই পানি জমে না থাকে। মশক মুক্ত ঢাকা গড়তে হলে আইন ও জবাবদিহির প্রয়োগ সাধারণ মানুষ ও সরকারি প্রকল্প উভয়ের জন্যই সমান হতে হবে”।