মামলার অজুহাতে পেশাদাররা ওএসডি
ফসিহ উদ্দীন মাহতাব ও তানভীর হাসান
প্রকাশ : ৪ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ৩ ঘণ্টা আগে
পুলিশের লোগো।
মামলার অজুহাতে নিয়মিত পোস্টিং থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে বিভিন্ন পেশাদার পুলিশ কর্মকর্তাদের। এতে একদিকে তাদের সামাজিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে, অন্যদিকে তাদের মধ্যে এক ধরনের ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিচ্ছে।
নিয়মিত পোস্টিং না পাওয়া এই কর্মকর্তারা দাবি করছেন, ষড়যন্ত্রমূলকভাবে তাদের এ সব মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। যার নেপথ্যে রয়েছে পুলিশের ভেতরের একটি গোপন ও শক্তিশালী সিন্ডিকেট।
ওএসডি হয়ে থাকা এমন অন্তত ১৩ জন পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে প্রতিদিনের বাংলাদেশের কথা হয়েছে। তারা তাদের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরতে গিয়ে জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে ওএসডি হয়ে থাকা পুলিশ কর্মকর্তাদের অনেকের পরিবারই বাসা, এমনকি তাদের সন্তানদের স্কুল পর্যন্ত পরিবর্তন করেছেন। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কাছে দফায় দফায় যোগাযোগ করেও তারা উদ্ভূত পরিস্থিতির সমাধান বা প্রতিকার পাচ্ছেন না।
তবে বঞ্চিত কর্মকর্তারা এ-ও জানিয়েছেন, কোনো বিশেষ রহস্যময় কারণে মামলা থাকলেও তাদের অনেকে আবার পোস্টিং পাচ্ছেন। পুলিশ সুপার (এসপি) পদমর্যাদার এমন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “এন’ আদ্যাক্ষরের এক কর্মকর্তা ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের আমলে নিয়মিত পদোন্নতি পেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে পদায়ন পান। পুলিশ অধিদপ্তরে তৎকালীন শীর্ষপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ‘আশীর্বাদপুষ্ট’ হিসেবে তার পরিচিতি ছিল। এ কারণে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তার বিরুদ্ধে আরও অনেকের মতো একাধিক মামলা হয়েছিল। কিন্তু এর ফলে অনেক কর্মকর্তার ক্যারিয়ার স্থবির হয়ে পড়লেও তার ক্ষেত্রে ঘটেছে উল্টো। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর কোনো বিশেষ কারণে তিনি আবারও একটি বড় জেলার এসপি হিসেবে পদায়ন পান”।
সূত্র জানিয়েছে, শুধু এই ‘এন’ আদ্যাক্ষরের কর্মকর্তাই নন এমন আরও প্রায় একশ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় মামলা থাকলেও বর্তমান রাজনৈতিক সরকারের আমলে তারা পুলিশ বিভাগের বিভিন্ন পদে বহাল আছেন। অন্যদিকে একই সময়ে দলনিরপেক্ষ ও পেশাদার হিসেবে পরিচিত বেশকিছু সংখ্যক পুলিশ কর্মকর্তা শুধু তাদের বিরুদ্ধে মামলা থাকার ‘অপরাধে’ পোস্টিং পাচ্ছেন না। মামলার অজুহাতে মাসের পর মাস বা বছরেরও বেশি সময় ধরে তাদের বিভিন্ন রেঞ্জ ডিআইজি অফিস ও অন্য কিছু ইউনিটে সংযুক্ত করে রাখা হয়েছে। সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠেছে : পেশাদারত্বের সংকট, নীতির দ্বৈততা নাকি পুলিশ প্রশাসনে অদৃশ্য কোনো সিন্ডিকেট কাজ করছে?
মামলার বর্তমান চিত্র : গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে পুলিশের এমন অন্তত ৫৫টি মামলার তদন্তভার দেওয়া হয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই)। এর মধ্যে ঢাকার ৪৯টি, নারায়ণগঞ্জের দুটি, সিলেটের তিনটি ও রংপুরের একটি মামলা রয়েছে। এসব মামলায় পুলিশের কনস্টেবল থেকে তৎকালীন আইজিপিসহ ৯৯ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪ জন গ্রেপ্তার এবং বাকি সদস্যরা পলাতক ও সংযুক্ত অবস্থায় আছেন।
পিবিআইয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এসব মামলার তদন্তে অন্তত ২৭ জন পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এমনকি দেখা গেছে যে, বাদীও আসামিকে চেনেন না। বিষয়টি নিয়ে আদালতে অগ্রগতি প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে”।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “পুলিশে সংযুক্তরা রাষ্ট্রের আইন ও আদেশ মেনে কাজ করেছেন। আবার অনেকে বিনা কারণেও আসামি হয়েছেন। যারা প্রকৃত অপরাধী, তাদের আইনের আওতায় এনে বিচারের পাশাপাশি নির্দোষ ব্যক্তিদের জন্য আবারও কাজের পরিবেশ তৈরি করা সরকারেরই দায়িত্ব। সেরকম না হওয়ায় নিরপরাধ ব্যক্তিরা সামাজিক ও পারিবারিকভাবে ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছেন। এ অবস্থায় চরম হতাশা থেকে পারিবারিকভাবে বড় কোনো দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে”।
তিনি বলেন, “প্রতিটি পেশাতেই প্রতিযোগিতা আছে। তেমনি পুলিশেও আছে। তবে সেটি ব্যক্তিপর্যায়ে নিয়ে গেলে বাহিনীর ক্ষতি হবে। মাঠপর্যায়ে এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। ফলে পুলিশের ঘুরে দাঁড়াতেও বেগ পেতে হবে। এ কারণে সরকারকে এখনই গুরুত্বসহকারে বিষয়টি খতিয়ে দেখা উচিত”। কে কোন সরকারের আমলে নিয়োগ পেয়েছে, সেসবের পেছনে না দৌড়িয়ে পেশাদারত্বের ভিত্তিতে পদায়নে জোর দেওয়ার তাগিদ দেন এই অপরাধ বিশেষজ্ঞ।
স্বরাষ্ট্র ও পুলিশ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত অনেক কর্মকর্তা বর্তমানে নানা মামলার মুখোমুখি হলেও তাদের পদায়ন থেমে নেই। বরং ব্যক্তিসখ্য, লবিং ও ‘ম্যানেজমেন্ট’-এর মাধ্যমে অনেকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাচ্ছেন।
পুলিশের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “পদায়ন প্রক্রিয়ায় এখনও একটি অদৃশ্য নেটওয়ার্ক সক্রিয়। যারা আগে প্রভাবশালী ছিলেন, তাদের একটি অংশ নতুন বাস্তবতায় নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছেন”।
সংযুক্তির ‘শাস্তি’তে দীর্ঘ অপেক্ষা : অনুসন্ধানে দেখা গেছে, যারা ‘দলনিরপেক্ষ’ ও ‘পেশাদার’ হিসেবে কাজ করেছেন, তাদের অনেকেই সংযুক্তির বোঝা বইছেন। তাদের অভিযোগ, শুধু ব্যক্তি-সম্পর্ক বা ‘লবি’ না থাকায় তারা পদায়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
এ প্রসঙ্গে ঢাকার বাইরে পুলিশের বিভাগীয় রেঞ্জ অফিসে সংযুক্ত থাকা এসপি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা বলেন, “আমার বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতি বা অনিয়মের অভিযোগ নেই। শুধু উদ্দেশ্যমূলক একটি রাজনৈতিক মামলায় নাম রয়েছে। সেটিকেই অজুহাত করে আমাকে বসিয়ে রাখা হয়েছে”।
এমন কর্মকর্তাদের অনেকের ধারণা ছিল, রাজনৈতিক সরকার গঠনের পর তারা পুনর্বাসনের সুযোগ পাবেন। নির্বাচিত সরকারের সময় তারা সংযুক্তি থেকে মুক্তি পাবেন। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন এখনও ঘটেনি। বরং পুলিশের একটি মহল (যাদের অনেকে আগের সরকারের সময় ভালো অবস্থানে ছিলেন, কেউ কেউ ব্যক্তিগত নৈতিক স্খলন ও অন্যান্য কারণে পদোন্নতি পাননি) সরকারের নীতিনির্ধারকদের তাদের বিষয়ে ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করছেন। এর অবসান হওয়া উচিত বলে মনে করছেন তারা। প্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একই ধরনের অভিযোগ থাকার পরও একদল কর্মকর্তার পদায়ন ঘটানো, অন্যদিকে বাকিদের সংযুক্তিতে রাখাÑ এটি নীতিগত অসঙ্গতির প্রকাশ।
এ বিষয়ে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “প্রশাসনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা। যদি দেখা যায়, একই অভিযোগে অভিযুক্ত দুই কর্মকর্তার ক্ষেত্রে ভিন্ন আচরণ করা হচ্ছে, তাহলে সেটি প্রশাসনিক ন্যায্যতার প্রশ্ন তোলে।’ তিনি বলেন, “সংযুক্তি কোনো শাস্তি নয়, এটি সাময়িক প্রশাসনিক ব্যবস্থা। কিন্তু যদি এটি দীর্ঘমেয়াদি হয়ে যায়, তাহলে তা কার্যত শাস্তিতে পরিণত হয়”।
পদায়ন না হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা : সংযুক্তিতে থাকা কর্মকর্তাদের অনেকেই মাঠপর্যায়ে কাজ করার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। তাদের দাবি, তারা দায়িত্ব পেলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারতেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিআইজি পদমর্যাদার এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “দক্ষ ও পেশাদার পুলিশ কর্মকর্তাদের বসিয়ে রাখা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর। এতে শুধু ব্যক্তিগত হতাশা তৈরি হয় না, বরং প্রশাসনিক সক্ষমতাও কমে যায়। বিষয়টি কর্মরত সদস্যদের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পিআরবি অনুযায়ী, পুলিশ সরকারের বাহিনী (রাষ্ট্রের নয়)। অর্থাৎ বিধি অনুযায়ী তারা সরকারি আদেশ পালন করতে বাধ্য। এক সরকারের সময়ে সরকারি আদেশ পালন করতে গিয়ে কোনো পুলিশ সদস্য ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতির শিকার হলে, কর্মরত অন্যরাও ভবিষ্যতে ক্ষতিগ্রস্ত হবার আশঙ্কায় অনেক ক্ষেত্রে সাহসের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতি সার্বিকভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলে”।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের এক সদস্য হতাশা প্রকাশ করে বলেন, তিনি মারা গেলে তো বিচারও হবে না, তার পরিবারকেও কেউ দেখবে না, শুধু শুধু মরতে কেন যাবেন?
‘ম্যানেজমেন্ট কালচার’ পুরনো সমস্যা, নতুন রূপ : পুলিশ প্রশাসনে ‘ম্যানেজমেন্ট’ বা ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে পদায়ন পাওয়া নতুন বিষয় নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এটি আবারও আলোচনায় এসেছে।
প্রশাসন বিশ্লেষকরা বলছেন, যতদিন না পদায়ন প্রক্রিয়া পুরোপুরি স্বচ্ছ ও ডিজিটাল করা হচ্ছে, ততদিন এই ধরনের অভিযোগ থাকবে। তারা সুপারিশ জানিয়ে বলেছেন, পদায়নের জন্য একটি নির্দিষ্ট নীতিমালা প্রকাশ করা দরকার। মামলার ভিত্তিতে নয়, তদন্তের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এছাড়াও সংযুক্তির সময়সীমা নির্ধারণ করা ও একটি স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ : বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের সামনে অন্যতম চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা এবং নিরপেক্ষ ও পেশাদার কর্মকর্তাদের পুনর্বাসন করা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারলে প্রশাসনে আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। কারণ পুলিশ প্রশাসন রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। এখানে যদি পদায়ন ও সংযুক্তির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা না থাকে, তাহলে তার প্রভাব পড়ে সরাসরি আইনশৃঙ্খলার ওপর।
মামলা থাকা সত্ত্বেও কিছু কর্মকর্তার পদায়ন এবং নিরপেক্ষদের দীর্ঘদিন সংযুক্তিতে রাখাÑ এই দ্বৈততা কেবল প্রশাসনিক প্রশ্নই নয়, এটি রাষ্ট্রীয় ন্যায়বিচারের প্রশ্নও।