বিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
সালাহউদ্দিন আহমদ। ছবি: সংগৃহীত
কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক দল হিসেবে শিগগিরই বিচারের আওতায় আনা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত কার্যক্রম এগিয়ে চলছে এবং খুব শিগগিরই দলটিকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে শনিবার জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত ‘জুলাই জাতীয় সম্মেলন’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। ‘জুলাই-২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি’ ও ‘আমরা জুলাই যোদ্ধা’ যৌথভাবে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইন সংশোধন করা হয়েছে। পাশাপাশি সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সংক্রান্ত আইনের বিধান অনুযায়ী রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের বিচার করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তাই বিচার প্রক্রিয়ার জন্য সবাইকে অপেক্ষা করার আহ্বান জানান তিনি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা নিয়ে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার প্রবণতার সমালোচনা করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, যারা এই চেতনাকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চায়, ভবিষ্যতে তাদের পরিণতিও ইতিহাসে প্রতিফলিত হবে। তিনি বলেন, একসময় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিক্রি করে রাজনীতি করা ব্যক্তিদের পরিণতি দেশবাসী দেখেছে; তাই কোনো মহান অর্জনকে রাজনৈতিক ব্যবসার উপকরণে পরিণত করা উচিত নয়।
তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস ও শহীদদের আত্মত্যাগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সংরক্ষণ করতে হবে, যাতে তারা বুঝতে পারে কীভাবে স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের পতন ঘটে এবং ভবিষ্যতে কোনো সরকার যেন একই ধরনের শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা না করে।
অনুষ্ঠানে শহীদ ওয়াসিম আকরামের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, শহীদ হওয়ার মাত্র দুই দিন আগে ওয়াসিম ভারতের শিলংয়ে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করেছিলেন। পরে দেশে ফিরে আন্দোলনে অংশ নিয়ে জীবন উৎসর্গ করেন।
মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ পর্যন্ত গণহত্যা সংক্রান্ত পাঁচটি মামলার রায় হয়েছে। বর্তমানে ২৭টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে এবং আরও ৭২টি মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে। শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলায় দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্যসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকজন বিভিন্ন মেয়াদের সাজা পেয়েছেন বলে তিনি জানান।
তিনি আরও বলেন, প্রথম গণহত্যা মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে। তৎকালীন আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হওয়ায় তার সাজা কম হলেও দণ্ডিত হয়েছেন। আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানোর মামলায়ও দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড এবং সাবেক এক এমপি, ওসি, ডিআইজিসহ অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদের সাজা হয়েছে।
চাঁনখারপুল ও রামপুরার পৃথক হত্যা মামলার রায়ের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড এবং অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া হাসানুল হক ইনুর ১০ বছরের সাজায় বাদীপক্ষ অসন্তোষ প্রকাশ করায় উচ্চতর শাস্তির দাবিতে আপিলের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে নিজের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ টেনে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তিনি ও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাসনে থাকলেও আন্দোলনের পুরো সময় সার্বক্ষণিক সমন্বয় করেছেন। তাদের নেতৃত্বে বিভিন্ন পর্যায়ে সংগঠিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে আন্দোলন এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন।
তার ভাষ্য, ১৬ জুলাই তারেক রহমান ‘দফা এক, দাবি এক স্বৈরাচারের পদত্যাগ’ ঘোষণা দেন। তখন আন্দোলনের অনেকেই কেবল বৈষম্যবিরোধী দাবিতে সীমাবদ্ধ থাকতে চাইলেও বিএনপি মনে করেছিল, স্বৈরাচার বহাল রেখে বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠন সম্ভব নয়।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন তথ্য থাকলেও বহু শহীদের পরিচয় ও নথি হারিয়ে গেছে। অনেককে বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে দাফন করা হয়েছে, যার ফলে স্বজনরা এখনও তাদের কবরের সন্ধান পাচ্ছেন না।
সভায় সভাপতিত্ব করেন জাতীয় সংসদের প্রধান হুইপ নুরুল ইসলাম মনি। অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, গৃহায়নমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আজম খান, প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, ছাত্রদল ও বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা বক্তব্য দেন। এ ছাড়া জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহত আন্দোলনকারীরা নিজেদের স্মৃতিচারণ ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।