‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও উচ্চশিক্ষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিপাদ্যে বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ এবং ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১০৫ বছর অতিক্রম করে ১০৬তম বর্ষে পদার্পণ করেছে।
১৯২১ সালের ১ জুলাই পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের উচ্চশিক্ষার প্রসারে নবাব স্যার সলিমুল্লাহর স্বপ্ন বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করে।
এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এবার দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে।
‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও উচ্চশিক্ষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিপাদ্যে বুধবার বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ।
সকালে বিভিন্ন হল ও হোস্টেল থেকে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা শোভাযাত্রাসহ স্মৃতি চিরন্তন চত্বরে সমবেত হন।
পরে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের নেতৃত্বে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে।
এতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।
সকাল ১০টায় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) চত্বরে জাতীয় পতাকা, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন হলের পতাকা উত্তোলন এবং কেক কাটার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।
অনুষ্ঠানে সংগীত বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা জাতীয় সংগীত, বিশ্ববিদ্যালয়ের থিম সং, রবীন্দ্রসংগীত ও নজরুলসংগীত পরিবেশন করেন। বিদেশি শিক্ষার্থীরাও সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় অংশ নেন।
এরপর টিএসসি মিলনায়তনে ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও উচ্চশিক্ষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
এতে সভাপতিত্ব করেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইংরেজি বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. এ এফ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।
আলোচনায় অংশ নেন প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. এম. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক শামসুজ্জামান দুদু এবং ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম।
অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আ ফ ম ইউসুফ হায়দার, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক মো. লুৎফর রহমান, সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক ড. সদরুল আমিন, একুশে পদকপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়ুয়া এবং অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
সভায় উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, দেশের ইতিহাস, গণতান্ত্রিক আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং জাতি গঠনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
ভাষা আন্দোলন, মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ, নব্বইয়ের গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অবদান রাখা শহিদ ও সংগ্রামীদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন তিনি।
তিনি বলেন, সংকটের প্রতিটি মুহূর্তে এই বিশ্ববিদ্যালয় জাতির প্রত্যাশা পূরণে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন র্যাঙ্কিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ধারাবাহিকভাবে উন্নত হচ্ছে। টাইমস হায়ার এডুকেশন ইমপ্যাক্ট র্যাঙ্কিং ২০২৬, কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিং ২০২৭ এবং কিউএস এশিয়া র্যাঙ্কিংয়ে অগ্রগতি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক উৎকর্ষের স্বীকৃতি।
গবেষণা, উদ্ভাবন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও শিক্ষার্থীদের কল্যাণকে গুরুত্ব দিয়ে ২০২৬-২০৪৬ মেয়াদের ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একাডেমিক প্ল্যান’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিশ্বমানের অন্তর্ভুক্তিমূলক বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
পাশাপাশি গবেষণা ও শিক্ষার্থী কল্যাণে পৃথক তহবিল গঠনে প্রাক্তন শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা কামনা করেন।
মূল প্রবন্ধে ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. এ এফ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস মূলত গণতন্ত্র, জ্ঞানচর্চা ও সামাজিক অগ্রগতির ইতিহাস। ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থানসহ প্রতিটি গণতান্ত্রিক সংগ্রামে এ বিশ্ববিদ্যালয় নেতৃত্ব দিয়েছে।
তিনি গবেষণা, মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা, মুক্তবুদ্ধি, অসাম্প্রদায়িকতা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম বলেন, শিক্ষা ও গবেষণার মান উন্নত করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বের শীর্ষ ২০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাতারে নেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে।
এ জন্য গবেষণায় বিনিয়োগ, আধুনিক অবকাঠামো, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং নারী শিক্ষার প্রসারের ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
একই সঙ্গে মেধাভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের আরও সক্রিয় সম্পৃক্ততার আহ্বান জানান।
প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, গণতন্ত্র ও উচ্চশিক্ষা পরস্পর নির্ভরশীল।
সরকারের পাশাপাশি প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আশা প্রকাশ করেন তিনি।
কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. এম. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ও নতুন জ্ঞান সৃষ্টিতে আরও পরিকল্পিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং অংশীজনদের সহযোগিতার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও সমৃদ্ধ করা সম্ভব বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক শামসুজ্জামান দুদু বলেন, শিক্ষা, গবেষণা ও অবকাঠামো উন্নয়নে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র ও অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বরাবরই নেতৃত্ব দিয়েছে এবং ভবিষ্যতেও দেশ গঠনে সেই ধারা অব্যাহত থাকবে।
দিবসটি উপলক্ষে বিকেলে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের উদ্যোগে অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
এতে সভাপতিত্ব করেন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম এবং প্রধান অতিথি ছিলেন প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম।
একই সময়ে রাজু ভাস্কর্যের সামনে অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের কনসার্ট এবং পরে সাইক্লিং ক্লাবের উদ্যোগে সাইকেল র্যালি ও স্টান্ট শো অনুষ্ঠিত হয়।
প্রায় ৬০০ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের গণতান্ত্রিক আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন পর্যন্ত দেশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ঐতিহাসিক ভূমিকার মাধ্যমে জাতীয় জীবনে অনন্য অবদান রেখে চলেছে।