ফাইল ছবি
কালপঞ্জির পাতায় জুলাই কেবল একটি মাসের নাম নয়, এটি আমাদের বুকে চেপে বসা এক অমর মহাকাব্যের নাম। দেখতে দেখতে কেটে গেল দুটি বছর। কিন্তু আজও চোখ বুজলে ভেসে ওঠে উত্তাল রাজপথ, কানে বাজে বুলেটের শব্দ ছাপিয়ে যাওয়া এ দেশের অকুতোভয় তরুণদের স্লোগান।
২০২৪ সালের সেই রক্তস্নাত জুলাইয়ে এ দেশের ছাত্র-জনতা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে যে অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থান ঘটিয়েছিল, তা কেবল একটি স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটায়নি, বরং আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে শৃঙ্খল ভেঙে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয়। আবু সাঈদ, মুগ্ধদের মতো শত শত তাজা প্রাণের আত্মত্যাগ আর হাজারো বীরের পঙ্গুত্ব বরণ, এই স্বাধীন বাংলার আকাশে আজ যে মুক্তির বাতাস, তা তাদেরই বুকের রক্তের ঋণে কেনা।
২০২৪ সালের জুলাই মাস বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত অধ্যায় হয়ে আছে। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলন মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পরিণত হয় দেশের অন্যতম বড় গণআন্দোলনে। ধারাবাহিক কর্মসূচি, সংঘাত, হতাহতের ঘটনা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে জুলাই-আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ দেশের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের সূচনা করে।
জুলাইয়ের প্রথম দিন থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সরকারি চাকরির কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনে নামেন। শুরুতে আন্দোলন ছিল মূলত শিক্ষার্থীদের অধিকারভিত্তিক কর্মসূচি। ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ এর ব্যানারে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন।
৬ জুলাই থেকে শুরু হয় ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মহাসড়কে অবস্থান নেন আন্দোলনকারীরা। এতে যান চলাচলে ব্যাপক ভোগান্তি তৈরি হয় এবং আন্দোলন দেশব্যাপী আলোচনায় আসে।
১০ জুলাই কোটা বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ স্থিতাবস্থা জারি করেন। তবে শিক্ষার্থীরা জানান, তাদের দাবি পুরোপুরি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। এরপর আন্দোলন আরও সংগঠিত রূপ নেয়।
১৪ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি বক্তব্যকে ঘিরে আন্দোলনকারীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। ওই মধ্যরাতেই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বিক্ষোভ শুরু হয়। পরদিন ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা করে ছাত্রলীগ। এতে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
১৬ জুলাই আন্দোলনের সবচেয়ে আলোচিত দিনগুলোর একটি। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার ঘটনা আন্দোলনে বড় প্রভাব ফেলে। তার মৃত্যুর পর দেশজুড়ে প্রতিবাদের মাত্রা বেড়ে যায়। বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে এবং হতাহতের সংখ্যা বাড়তে থাকে।
১৭, ১৮ ও ১৯ জুলাই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ, ভাঙচুর, গ্রেপ্তার এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। এ সময় ইন্টারনেট সেবা সীমিত করা হয় এবং পরে কারফিউ জারি করা হয়। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানো হয়। নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের দিকে তাজা গুলি ছুড়ে পুলিশ-বিজিবি।
২১ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সরকারি চাকরির কোটা বিষয়ে নতুন রায় দেন। রায়ে কোটা ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনা হলেও আন্দোলনের পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। পরবর্তী সময়ে আন্দোলনকারীদের গ্রেপ্তার, মামলা এবং বিভিন্ন কর্মসূচিকে ঘিরে উত্তেজনা অব্যাহত থাকে।
জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে আন্দোলন নতুন মোড় নেয়। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা ও প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। ৩ আগস্ট আন্দোলনের নেতৃত্ব থেকে এক দফা দাবি ঘোষণা করা হয়। এর মাধ্যমে আন্দোলন কোটা সংস্কারের দাবি ছাড়িয়ে সরকার পতনের এক দফার বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেয়।
৪ আগস্ট দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এরপর ৫ আগস্ট সব বাধা পেরিয়ে গণভবনমুখী হন ছাত্র-জনতা। ওই দিন শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে পালিয়ে যান। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ঘটে এক বড় পরিবর্তন।
এরপর ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার শপথ গ্রহণ করে। প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত সরকার দায়িত্ব নেয়।
জুলাইয়ের এই ৩৬ দিনের ঘটনাপ্রবাহ শুধু একটি আন্দোলনের ইতিহাস নয়; এটি ছিল মানুষের দাবি, প্রতিবাদ, ক্ষোভ ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার এক প্রতিচ্ছবি। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত সরকারবিরোধী বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেয়। সরকার পতনের মধ্য দিয়ে এই আন্দোলন পরবর্তীতে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’ হিসেবে পরিচিতি পায়। এই সময় বাংলাদেশের রাজনীতি, সমাজ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়, যার প্রভাব দীর্ঘদিন আলোচনায় থাকবে।
আজ আরও একটি বছরপূর্তিতে দাঁড়িয়ে আমরা কেবল স্মৃতির সাগরে ডুব দিচ্ছি না, বরং আমাদের হৃদয়জুড়ে রয়েছে এক অপূরণীয় বেদনার পাশে এক বুক গর্ব। এই জুলাই আমাদের একতার প্রতীক, এই জুলাই আমাদের নতুন করে বেঁচে থাকার ইশতেহার। শহীদদের পবিত্র স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়ে, তাঁদের স্বপ্নের সেই বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার শপথ নেওয়ার দিন আজ।
রক্তে ভেজা সেই জুলাই কোনোদিন মলিন হবার নয়; এ যেন আমাদের ইতিহাসের বুকে চিরকাল জ্বলজ্বল করতে থাকা এক অবিনাশী নক্ষত্র।