জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের (ওএইচসিএইচআর) ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং প্রতিবেদনে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ১৪০০ মানুষের মৃত্যুর ঘটনা চ্যালেঞ্জ করে শেখ হাসিনার দেওয়া চিঠি উড়িয়ে দিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক। ছবি: রয়টার্স
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের (ওএইচসিএইচআর) ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং প্রতিবেদনে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ১৪০০ মানুষের মৃত্যুর ঘটনা চ্যালেঞ্জ করে শেখ হাসিনার দেওয়া চিঠি উড়িয়ে দিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক।
জাতিসংঘ কার্যালয়ে নিয়মিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, প্রতিবেদনটি আমাদের মানবাধিকার অফিসের সহকর্মীরা প্রকাশ করেছেন এবং এটি নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো কারণ আমাদের নেই। তার এ বক্তব্যের মাধ্যমে শেখ হাসিনার ‘আশায় গুড়েবালি’ পড়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে ১,৪০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যুর তথ্য সংবলিত জাতিসংঘের প্রতিবেদনকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তর্জাতিক আইন উপদেষ্টা। গত ২৮ মে লন্ডনের ডাউটি স্ট্রিট চেম্বার্সের প্রখ্যাত আইনি পরামর্শক স্টিভেন পাউলেস কেসি শেখ হাসিনার পক্ষে এই চিঠি জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্কের কাছে পাঠান। চিঠিতে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং প্রতিবেদনকে ‘ত্রুটিপূর্ণ ও অত্যন্ত ভুল’ আখ্যা দিয়ে এই মৃত্যুর তথ্য জনসমক্ষে প্রত্যাহারের জোর দাবি জানানো হয়।
চিঠিতে শেখ হাসিনার আইনি দল দাবি করেছে, ওএইচসিএইচআর-এর প্রতিবেদনে উল্লিখিত ১,৪০০ জন নিহত হওয়ার তথ্যটি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অতিরঞ্জিত করা হয়েছে। আইনি দল তাদের যুক্তির পক্ষে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অফিসিয়াল গেজেটের (১৫ জানুয়ারি, ২০২৫) তথ্য উল্লেখ করেছে, যেখানে নিহত বা শহীদের সংখ্যা ৮৩৪ জন বলা হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়, জাতিসংঘের সংখ্যা এই সরকারি তালিকার প্রায় দ্বিগুণ।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নিজস্ব একটি হিসাবে নিহতের সংখ্যা প্রায় ৬৫০ জন উল্লেখ ছিল বলে চিঠিতে মনে করিয়ে দেওয়া হয়। চিঠিটিতে তদন্ত প্রক্রিয়ার স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়েছে, এই তদন্তটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমন্ত্রণে পরিচালিত হয়েছিল। এ ছাড়াও এতে আওয়ামী লীগ সমর্থক এবং আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হওয়া সহিংসতাকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।
শেখ হাসিনার এই চিঠি এবং আপত্তির পর জাতিসংঘ তাদের প্রতিবেদনের ওপর সম্পূর্ণ আস্থা পুনর্ব্যক্ত করেছে। শেখ হাসিনার দাবিকে নাকচ করে দিয়েছে তারা। গত ১ জুন নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে নিয়মিত ব্রিফিংয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক জানান যে, ওএইচসিএইচআরের প্রস্তুত করা ওই প্রতিবেদনকে সন্দেহ করার কোনো কারণ তাদের কাছে নেই। এর মাধ্যমে বিশ্ব সংস্থাটি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তারা তাদের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশনের তথ্যের ওপর দৃঢ়ভাবে অবিচল।
এই চিঠিটি এমন একসময়ে পাঠানো হয়েছে, যার একটি বড় আইনি প্রেক্ষাপট রয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের বিক্ষোভে সংঘটিত ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যা’র দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁনের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় প্রদান করে। শেখ হাসিনার আইনি দল অবশ্য শুরু থেকেই এই বিচার প্রক্রিয়াকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে দাবি করে আসছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই ভুল নিহতের সংখ্যা ব্যবহার করে শেখ হাসিনাকে দোষী সাব্যস্ত করার একটি বয়ান তৈরি করা হচ্ছে বলে এই চিঠিতে উল্লেখ করেছে।
বিদেশি লবিস্ট ও আইনজীবীর মাধ্যমে এই চিঠি পাঠানোর পর শেখ হাসিনাকে বেশ উজ্জীবিত দেখা গেছে। তার ফাঁস হওয়া কয়েকটি অডিও ক্লিপে দেশে ফিরে আসার ব্যাপারে তাকে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করতে দেখা গেছে। শেখ হাসিনা দেশে ফিরে বিচারের মুখোমুখি হওয়ারও ঘোষণা দিয়েছিলেন। যাতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বেশ উজ্জীবিত হয়েছিলেন। ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের খণ্ড খণ্ড মিছিলও বের হয়েছিল।
জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্রের প্রেস ব্রিফিংয়ের পর শেখ হাসিনার ওই আস্ফালন আপাত স্তিমিত হয়ে গেছে বলে মনে করা হচ্ছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘের রিপোর্ট নিয়ে প্রশ্ন করার আর সুযোগ রইল না।