বিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৩ জুন ২০২৬ ২০:৩৩ পিএম
আপডেট : ০৩ জুন ২০২৬ ২০:৫৪ পিএম
ফ্ল্যাটে পড়ে থাকা ৭৫ বছর বয়সী নূর জাহান বেগম ও তার যুগ্মসচিব পুত্র ড. এ.কে.এম. আনিসুর রহমান। কোলাজ: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
ঢাকার মিরপুরে একটি ফ্ল্যাট থেকে ৭৫ বছর বয়সী নূর জাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনার মধ্যেই তার যুগ্মসচিব পুত্র ড. এ.কে.এম. আনিসুর রহমানকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বুধবার এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (যুগ্মসচিব) ড. এ.কে.এম. আনিসুর রহমানকে বদলিপূর্বক জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে যুগ্মসচিব (সংযুক্ত) পদে পদায়ন করা হয়েছে।
তাকে আগামী ৪ জুনের মধ্যে বর্তমান কর্মস্থল থেকে অবমুক্ত হয়ে নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে বলা হয়েছে। অন্যথায় ওই দিন অপরাহ্ণে তাকে বর্তমান কর্মস্থল থেকে তাৎক্ষণিক অবমুক্ত (স্ট্যান্ড রিলিজড) হিসেবে গণ্য করা হবে।
কয়েক দিন আগে মিরপুরের একটি আবাসিক ভবনের ফ্ল্যাট থেকে নূর জাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ফ্ল্যাটের ভেতরের পরিবেশ ও মরদেহ উদ্ধারের সময়কার পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন ভিডিও ও ছবি ছড়িয়ে পড়ে।
সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, ফ্ল্যাটটির পরিবেশ ছিল অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর। মরদেহের অবস্থাও ছিল বেদনাদায়ক। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মরদেহে পোকার উপস্থিতিও দেখা গেছে।
এসব তথ্য সামনে আসার পর মানুষের মধ্যে প্রবীণদের নিরাপত্তা, পারিবারিক দায়িত্ববোধ এবং সামাজিক মূল্যবোধ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
নূর জাহান বেগমের সন্তানরা সবাই শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত পেশাজীবী বলে জানা গেছে। তাদের মধ্যে একজন যুগ্ম সচিব, একজন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক এবং আরেকজন স্কুলশিক্ষক।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, একজন মা, যিনি সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করতে জীবনের বড় অংশ ব্যয় করেছেন, তার শেষ জীবন কেন এমন নিঃসঙ্গ ও অবহেলার মধ্যে কাটল।
ঘটনাটি উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত সাফল্যের সঙ্গে মানবিক দায়িত্ববোধের সম্পর্ক নিয়েও নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
ঘটনার পর সরকারের পক্ষ থেকেও বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে বলে জানান জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘নূর জাহান বেগমের যুগ্ম সচিব পুত্রের বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ঘটনার বিভিন্ন দিক যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। প্রাপ্ত তথ্য ও তদন্তের অগ্রগতির ভিত্তিতে পরবর্তী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
সমাজবিজ্ঞানী ও প্রবীণ অধিকারকর্মীদের মতে, ঘটনাটি কেবল একটি পরিবারের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, এটি দেশের নগরজীবনের এক উদ্বেগজনক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। পরিবার ছোট হয়ে আসা, পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতা এবং প্রবীণদের প্রতি দায়িত্ব পালনে অবহেলা, এসব বিষয় আবারও সামনে নিয়ে এসেছে এ ঘটনা।
তাদের ভাষ্য, আর্থিক সচ্ছলতা বা উচ্চ পদে আসীন হওয়া একজন মানুষের মানবিক দায়িত্ববোধের নিশ্চয়তা দেয় না। প্রবীণ মা-বাবার প্রতি নিয়মিত খোঁজ-খবর, যত্ন ও মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করা পরিবার ও সমাজ উভয়ের দায়িত্ব।
নূর জাহান বেগমের মৃত্যুর ঘটনা এখন শুধু একটি সংবাদ নয়, এটি প্রবীণদের প্রতি দায়িত্ববোধ ও পারিবারিক মূল্যবোধ নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে আত্মসমালোচনারও উপলক্ষ হয়ে উঠেছে।