প্রতি ১০টি অজ্ঞাত লাশের মধ্যে প্রায় ৭টিই থেকে গেছে নাম-পরিচয়হীনভাবে। কোলাজ: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
দেশে অজ্ঞাতপরিচয় মৃতদেহ শনাক্তে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ঘটলেও বাস্তবতা এখনও উদ্বেগজনক। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআইয়ের) এক অনুসন্ধানের তথ্যমতে, গত সাত বছরে উদ্ধার হওয়া ৮ হাজার ৪৫৬টি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহের মধ্যে ৬ হাজার ১১৬টিরই পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। অর্থাৎ প্রতি ১০টি অজ্ঞাত লাশের মধ্যে প্রায় ৭টিই থেকে গেছে নাম-পরিচয়হীনভাবে। শতকরা হিসাবে দাঁড়ায় ৭২-এর বেশি। ফলে পরিচয়হীনভাবেই মাটিতে মিশে যাচ্ছে অজ্ঞাত এসব মানুষ। পরিচয় না থাকার কারণে অনেক ক্ষেত্রে ধর্মীয় আচারও পালন করা সম্ভব হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিএনএ ডাটাবেজ, নিখোঁজ ব্যক্তি ও অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহের সমন্বিত জাতীয় তথ্যভান্ডার এবং আন্তঃসংস্থার ডিজিটাল সমন্বয় ছাড়া এই সংকট কাটানো সম্ভব নয়।
আরও পড়ুন: পিবিআইয়ের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন: ধর্ষণের শিকার নারীদের মামলায় অনীহা |
অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ শনাক্তে প্রযুক্তিনির্ভর যুগে প্রবেশের লক্ষ্য নিয়ে ২০১৯ সালে পিবিআই এফআইভিইএস (Fingerprint Identification and Verification System) চালু করে। জাতীয় পরিচয়পত্রের ডাটাবেজের সঙ্গে ফিঙ্গারপ্রিন্ট মিলিয়ে মৃত ব্যক্তির পরিচয় বের করার এই প্রযুক্তি চালুর পর বহু আলোচিত হত্যা মামলার রহস্য উন্মোচিত হয়েছে, বহু পরিবার ফিরে পেয়েছে হারিয়ে যাওয়া স্বজনের পরিচয়। কিন্তু সাত বছরের হিসাব বলছে, সাফল্যের আড়ালেও রয়ে গেছে বড় এক অন্ধকার। এখনও নাম-পরিচয়হীনের পাল্লাই যথেষ্ট ভারী।
পিবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের মার্চ থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত সময়ে দেশে উদ্ধার হওয়া ৮ হাজার ৪৫৬টি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহের মধ্যে ৬ হাজার ১১৬টির পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। অর্থাৎ প্রায় ৭২ শতাংশই আজও রাষ্ট্রীয় নথিতে পরিচয়হীন। অন্যভাবে বললে, প্রতি ১০টি অজ্ঞাত মরদেহের মধ্যে প্রায় ৭টির নাম, ঠিকানা, পরিবার কিংবা জীবনের ইতিহাস এখনও অজানা।
অপরাধ তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এফআইভিইএস অজ্ঞাত মরদেহ শনাক্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি এনে দিলেও কেবল ফিঙ্গারপ্রিন্টভিত্তিক প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। কারণ বাস্তবতায় এমন অসংখ্য পরিস্থিতি রয়েছে, যেখানে ফিঙ্গারপ্রিন্ট প্রযুক্তি কার্যত অকার্যকর।
এফআইভিইএসের সাফল্য ও ব্যর্থতার নির্মম পরিসংখ্যান
পিবিআইয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৭ বছরে উদ্ধার হওয়া ৬ হাজার ১৮৪টি অজ্ঞাত পুরুষ মরদেহের মধ্যে শনাক্ত করা গেছে ১ হাজার ৭১১টি। অশনাক্ত রয়ে গেছে ৪ হাজার ৪৭৩টি। শনাক্তের হার ২৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ। একই সময়ে উদ্ধার হওয়া ২ হাজার ২৭২টি অজ্ঞাত নারী মরদেহের মধ্যে শনাক্ত হয়েছে ৬২৯টি। অশনাক্ত রয়ে গেছে ১ হাজার ৬৪৩টি। শনাক্তের হার ২৭ দশমিক ৬৮ শতাংশ। সর্বমোট ৮ হাজার ৪৫৬টি অজ্ঞাত মরদেহের মধ্যে মাত্র ২ হাজার ৩৪০টির পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। বাকি ৬ হাজার ১১৬টি মরদেহ এখনও পরিচয়হীন। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, প্রযুক্তি চালু হলেও অজ্ঞাত লাশ শনাক্তে রাষ্ট্র এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে।
পরিচয় মিলতেই বেরিয়ে এসেছে খুনের নেপথ্য কাহিনী
অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ শনাক্ত কেবল মানবিক দায়িত্ব নয়; এটি অনেক সময় ভয়ংকর অপরাধ উদঘাটনেরও প্রথম দরজা। পিবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, শনাক্ত হওয়া মরদেহগুলোর সূত্র ধরে ২২৮টি হত্যা মামলা হয়েছে। এর মধ্যে পুরুষ মরদেহ সংশ্লিষ্ট হত্যা মামলা ১৬৫টি ও নারী মরদেহ সংশ্লিষ্ট হত্যা মামলা ৭২টি। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বহু ক্ষেত্রে একটি অজ্ঞাত মরদেহের পরিচয়ই হয়ে ওঠে পুরো তদন্তের টার্নিং পয়েন্ট। পরিচয় জানা না গেলে হত্যার উদ্দেশ্য, অপরাধী চক্র, পূর্বশত্রুতা, অর্থনৈতিক বিরোধ কিংবা সংঘবদ্ধ অপরাধের নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
টাঙ্গাইলের সেই ক্লুলেস হত্যাকাণ্ড
প্রায় চার বছর আগে টাঙ্গাইলে এক অটোরিকশা চালককে গলা কেটে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। ঘটনাস্থলে কোনো প্রত্যক্ষদর্শী ছিল না, ছিল না কার্যকর কোনো আলামতও। এক বছর ধরে তদন্ত চললেও কোনো অগ্রগতি হয়নি। পরে আদালতের নির্দেশে তদন্তভার যায় পিবিআইয়ের কাছে। শুরু হয় নতুন কৌশল। কখনও অটোচালকের ছদ্মবেশে, কখনও ছিনতাইকারী চক্রের সদস্য সেজে মাঠে নামেন তদন্তকারীরা। গোয়েন্দা নজরদারি, প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ, তথ্য সংগ্রহ ও ফরেনসিক তদন্তের সমন্বয়ে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে ঘটনার পেছনের ভয়াবহ চিত্র। তদন্তে জানা যায়, যাত্রীবেশে ওঠা একটি সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্র অটো ছিনতাইয়ের সময় চালককে জবাই করে হত্যা করেছিল। পিবিআই কর্মকর্তারা বলছেন, এ ধরনের অসংখ্য ক্লুলেস, ব্লাইন্ড ও জটিল হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে বিশেষায়িত তদন্ত দক্ষতা, প্রযুক্তিনির্ভর অনুসন্ধানই তাদের প্রধান শক্তি।
২ লাখ ৫৭ হাজার মামলার তদন্ত, তবুও অজ্ঞাত লাশ শনাক্তে বড় দেয়াল
২০১২ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে পিবিআই এখন পর্যন্ত ২ লাখ ৫৭ হাজার ৩৫৪টি মামলার তদন্ত করেছে। এর মধ্যে ২ লাখ ৪৮ হাজার ২০টির নিষ্পত্তি হয়েছে। বর্তমানে ৯ হাজার ৩৩৪টি মামলা তদন্তাধীন রয়েছে। পিবিআইয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও বলছেন, প্রযুক্তিনির্ভর তদন্তে পিবিআই উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা দেখালেও অজ্ঞাত মরদেহ শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে কাঠামোগত ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এখনও বড় বাধা হয়ে রয়েছে।
কেন ব্যর্থ হয় ফিঙ্গারপ্রিন্ট
২০১৯ সালে চালু হওয়া এফআইভিইএস জাতীয় পরিচয়পত্রের ডাটাবেজের সঙ্গে ফিঙ্গারপ্রিন্ট মিলিয়ে পরিচয় শনাক্ত করে। কিন্তু বাস্তবতার মাটিতে এই প্রযুক্তির একাধিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো শিশুদের ক্ষেত্রে এটি কার্যকর নয়। ১৮ বছরের কম বয়সী ও জাতীয় পরিচয়পত্র ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত নয়Ñ এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রে এফআইভিইএস কোনো ফল দিতে পারে না। এ ছাড়া কামার, কুমার, ধোপা, বাবুর্চি, ইটভাটা শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিক ও ভিক্ষুকসহ বহু শ্রমজীবী মানুষের আঙুলের রিজ প্যাটার্ন দীর্ঘদিনের কাজের কারণে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। ফলে তাদের ফিঙ্গারপ্রিন্ট অনেক সময় ডাটাবেজের তথ্যের সঙ্গে মেলে না। বয়সজনিত কারণেও সমস্যা তৈরি হয়। অধিক বয়স্ক মানুষের আঙুলের ত্বক পাতলা হয়ে যাওয়ায় রিজ প্যাটার্নের কনট্রাস্ট কমে যায়। ফলে শনাক্তকরণ ব্যাহত হয়। একইভাবে আঘাত, পোড়া, কাটা কিংবা দুর্ঘটনার কারণে আঙুলের রিজ প্যাটার্ন নষ্ট হয়ে গেলে ফিঙ্গারপ্রিন্ট ম্যাচিং কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে। সবচেয়ে বড় সংকট দেখা দেয় পচা, গলিত, দগ্ধ বা পানিতে ডুবে থাকা মরদেহের ক্ষেত্রে। এসব ক্ষেত্রে আঙুলের চামড়া ও রিজ প্যাটার্ন সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় প্রযুক্তি কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে। পাশাপাশি অতিরিক্ত ঘামযুক্ত বা অতিরিক্ত শুষ্ক আঙুলের ক্ষেত্রেও ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সর সঠিক রিডিং নিতে ব্যর্থ হয়।
অশনাক্ত লাশ মানেই দীর্ঘ ট্র্যাজেডি
আইনশৃঙ্খলা বিশ্লেষকদের মতে, একটি অজ্ঞাত মরদেহের পেছনে থাকে এক বা একাধিক পরিবারের অসহায় অপেক্ষা। কারণ পরিচয় শনাক্ত না হলে পরিবার জানতে পারে না স্বজন বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন। ধর্মীয় ও সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে শেষ বিদায় জানানোর সুযোগ হারিয়ে যায়। হত্যাকাণ্ড হলে তার বিচারও বাধাগ্রস্ত হয়। বছরের পর বছর অনিশ্চয়তা, মানসিক যন্ত্রণা ও সামাজিক সংকটে ভুগতে হয় পরিবারকে। ফলে অজ্ঞাত মরদেহের প্রশ্নটি শুধু পুলিশি তদন্তের বিষয় নয়; এটি মানবাধিকার, নাগরিক মর্যাদা এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্নও।
ডিএনএ, জাতীয় ডাটাবেজ ও এআই প্রযুক্তিতে সমাধান
পিবিআইয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, অজ্ঞাত মরদেহ শনাক্তকরণের পরবর্তী বড় ধাপ হতে হবে ডিএনএভিত্তিক জাতীয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা। বর্তমানে সিআইডি অজ্ঞাত মরদেহের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিখোঁজ ব্যক্তির স্বজনের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে সংরক্ষিত ডিএনএ প্রোফাইলের সঙ্গে নিয়মিত ক্রস-ম্যাচ করা গেলে শনাক্তের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। এজন্য প্রয়োজন জাতীয় ডিএনএ রেফারেন্স ডাটাবেজ, স্বজনের ডিএনএ নমুনা সংরক্ষণ ব্যবস্থা, দ্রুতগতির ম্যাচিং সফটওয়্যার ও সাশ্রয়ী ব্যয়ে ডিএনএ পরীক্ষা। একই সঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তর, পিবিআই, সিআইডি, র্যাব, রেলওয়ে পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশের তথ্য একীভূত করে একটি কেন্দ্রীয় জাতীয় ডাটাবেজ গড়ে তোলার পরামর্শও দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সেখানে থাকবে ছবি, শারীরিক বর্ণনা, সম্ভাব্য বয়স, পোশাকের বিবরণ, উদ্ধারস্থল, বিশেষ শনাক্তকরণ চিহ্ন, ডিএনএ ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট তথ্য এবং তদন্ত কর্মকর্তার তথ্য। সফটওয়্যার স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্ভাব্য মিল খুঁজে বের করবে।
ডিজিটাল প্লাটফর্মের অভাবও বড় বাধা
অজ্ঞাত মরদেহ ও নিখোঁজ ব্যক্তির তথ্য প্রচারে এখনও কোনো সমন্বিত সরকারি ডিজিটাল প্লাটফর্ম নেই। পিবিআইয়ের প্রস্তাব অনুযায়ী, পুলিশ সদর দপ্তর বা সিআইডির তত্ত্বাবধানে একটি যাচাইকৃত অনলাইন প্লাটফর্ম গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে সংবাদ মাধ্যমগুলো করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার (সিএসআর) অংশ হিসেবে নিয়মিত এসব তথ্য প্রকাশ করতে পারে। তবে তথ্যের গোপনীয়তা, সত্যতা ও অপব্যবহার রোধে সুস্পষ্ট স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) থাকতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক, সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, পিবিআইয়ের এফআইভিইএস অজ্ঞাত লাশ শনাক্তে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছেÑ এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। হাজারো পরিবার তাদের হারিয়ে যাওয়া স্বজনের খোঁজ পেয়েছে, বহু হত্যা মামলার রহস্য উন্মোচিত হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে আরেকটি বাস্তবতাও স্পষ্টÑ প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও সাত বছরে ৬ হাজার ১১৬টি মরদেহ পরিচয়হীন। এ কারণেই এখন ফিঙ্গারপ্রিন্টের পাশাপাশি ডিএনএ, সমন্বিত জাতীয় ডাটাবেজ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ম্যাচিং সিস্টেম, গণমাধ্যম ও ডিজিটাল প্লাটফর্মের সমন্বিত ব্যবহার প্রয়োজন। তার ভাষায়, একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের কাজ শুধু অপরাধীকে খুঁজে বের করা নয়; পরিচয়হীন হয়ে যাওয়া একজন নাগরিককে তার নাম, পরিচয় ও মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়াও রাষ্ট্রের সমান দায়িত্ব।