ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ০২ জুন ২০২৬ ১৫:২১ পিএম
আপডেট : ০২ জুন ২০২৬ ১৭:২৬ পিএম
সচিবালয়। ফাইল ছবি
রাষ্ট্রের উচ্চ প্রশাসনে সচিব পদ শুধু একটি পদোন্নতি নয়; এটি নীতি নির্ধারণ, প্রশাসনিক নেতৃত্ব ও রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। ফলে এই পদে নিয়োগ ও পদোন্নতিকে ঘিরে সবসময়ই গুরুত্ব, প্রতিযোগিতা এবং বিতর্ক থাকে। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েকটি সচিব পদোন্নতিকে ঘিরে প্রশাসনের ভেতরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে- রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও কি পুরোনো ‘সুবিধাভোগী বলয়’ অটুট রয়েছে?
আরও পড়ুন: ৪ কর্মকর্তাকে সচিব পদে পদোন্নতি |
প্রশাসনের একাধিক সূত্র বলছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে জ্যেষ্ঠতা ও পেশাগত দক্ষতার চেয়ে ‘বিশেষ বলয়ের প্রতি আস্থা’ এবং অতীতের প্রশাসনিক অবস্থানকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত হিসেবে পরিচিত একটি অংশের কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে।
সম্প্রতি বিসিএস (প্রশাসন) ১৮ ব্যাচের চারজন অতিরিক্ত সচিবকে সচিব পদে পদোন্নতি দিয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে পদায়ন করেছে সরকার। তারা বিদ্যুৎ বিভাগ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সমন্বয় ও সংস্কার, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের দায়িত্ব পেয়েছেন।
প্রশাসনের অভ্যন্তরে আলোচনা রয়েছে- এই কর্মকর্তারা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নিয়মিত পদোন্নতি, গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব এবং বিদেশে দূতাবাসে পদায়নের সুযোগ পেয়েছেন। অথচ একই ব্যাচের আরও কয়েকজন কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতিবঞ্চিত থেকেছেন ‘বিএনপি সমর্থক’ পরিচয়ের কারণে।
আরও পড়ুন: বঞ্চিতই থাকবেন বঞ্চিতরা |
প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, অতীতে ‘গোয়েন্দা যাচাই’ বা ‘নেতিবাচক বা সরকারবিরোধী প্রতিবেদনের’ অজুহাতে অনেক যোগ্য কর্মকর্তাকে সচিব পদোন্নতি থেকে দূরে রাখা হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ধারণা ছিল, সেই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে প্রশাসনে মেধা, জ্যেষ্ঠতা ও নিরপেক্ষ মূল্যায়নের ভিত্তিতে পদোন্নতি দেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তারাই আবারও অগ্রাধিকার পেতে থাকেন। তখন একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের অনুগত কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও পদায়নে সুবিধা দেওয়া হয়।
তারা বলেন, ২০২৬ সালে ১২ ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় পায় বিএনপি। ১৭ ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি নতুন সরকার গঠন করে। বঞ্চিত কর্মকর্তারা মূল্যায়ন পাবেন বলে প্রত্যাশা জাগে। কিন্তু নতুন সরকারের তিন মাস অতিক্রান্ত হলেও সুবিধাভোগীরা আগের মতোই সুবিধা নিয়ে চলছেন। তারা রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। এদিকে বঞ্চিত কর্মকর্তারা প্রশাসনে আরও কোনঠাসা হয়ে আছেন। তাদের মধ্যে এখন হতাশা ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “প্রশাসনে একটি অলিখিত বলয় বহু বছর ধরে সক্রিয়। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর তারা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সখ্য রাখতে পেরেছেন, তারাই পরবর্তীতে নিয়মিত পদোন্নতি, বিদেশে পোস্টিং এবং গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় পেয়েছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- পরিবর্তনের পরও যদি একই ধারা চলতে থাকে, তাহলে বঞ্চিত কর্মকর্তারা ন্যায়বিচার কোথায় পাবেন?”
সূত্র বলছে, বিসিএস-১৮ ব্যাচের মেধাতালিকায় শীর্ষে থাকা সেই কর্মকর্তাকে সচিব পদোন্নতির বিবেচনায় আনা হয়নি। বরং মেধাক্রমের নীচে থাকা কর্মকর্তাদের সচিব পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অথচ মেধা তালিকায় প্রথমে থাকা সেই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বড় কোনো প্রশাসনিক অভিযোগ না থাকলেও অতীতে ‘বিএনপি সমর্থক’ সন্দেহে তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে দূরে রাখা হয়েছিল।
নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায়ও তিনি সচিব পদে পদোন্নতিতে উপেক্ষিত হয়েছেন। ফলে প্রশাসনের অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করছেন। প্রশাসনের ভেতরে প্রশ্ন উঠেছে- যদি অতীতের রাজনৈতিক বিবেচনা এখনও নিয়ামক হয়, তাহলে পরিবর্তনের সুফল কারা পাচ্ছেন?
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে সরকার সাধারণত কর্মদক্ষতা, জ্যেষ্ঠতা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের সমন্বয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু ‘গোয়েন্দা প্রতিবেদন’ প্রক্রিয়াটি দীর্ঘদিন ধরেই অস্বচ্ছ ও বিতর্কিত। কারণ, একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কী ধরনের তথ্য দেওয়া হচ্ছে, তা তিনি জানতেও পারেন না, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগও পান না।
তাদের মতে, গোয়েন্দা যাচাইয়ের প্রয়োজন অবশ্যই আছে। কিন্তু সেটি যদি অস্বচ্ছ হয় এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়, তাহলে পুরো পদোন্নতি ব্যবস্থাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
জনপ্রশাসন বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চপদে পদোন্নতি রাজনৈতিক আনুগত্যের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। ফলে একটি অংশ দ্রুত এগিয়ে যায়, অন্য অংশ স্থবির হয়ে পড়ে। এতে প্রশাসনে পেশাদারত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কর্মকর্তাদের মধ্যে বিভাজন তৈরি হয়।
এ প্রসঙ্গে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুক মনে করেন, প্রশাসনে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আনতে হলে পদোন্নতি ব্যবস্থাকে অবশ্যই রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে। সচিব পদে পদোন্নতি এমন একটি বিষয়, যেখানে সরকারের আস্থার প্রশ্ন থাকবে, কিন্তু সেটি যেন কখনও দলীয় আনুগত্যের সমার্থক না হয়। একজন কর্মকর্তার দক্ষতা, সততা, জ্যেষ্ঠতা এবং প্রশাসনিক অবদানই হওয়া উচিত মূল বিবেচ্য। অন্যথায় বঞ্চনার সংস্কৃতি থেকে বের হওয়া সম্ভব হবে না।
তিনি বলেন, “একটি নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী সিভিল সার্ভিস ছাড়া রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে কার্যকরভাবে চলতে পারে না। যদি কর্মকর্তারা মনে করেন রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তারা পিছিয়ে পড়ছেন, তাহলে প্রশাসনের মনোবল ভেঙে যায়।”
অভিযোগ রয়েছে, বিগত সরকারের সময়ে একটি নির্দিষ্ট বলয়ের কর্মকর্তারাই লাভজনক বিদেশ পোস্টিং পেয়েছেন। সেই কর্মকর্তাদের অনেকেই এখন আবার সচিব পদে পদোন্নতি পাচ্ছেন। ফলে দীর্ঘদিন মাঠ প্রশাসনে কাজ করা বা অপেক্ষাকৃত নিরপেক্ষ হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। যোগ্য অনেক কর্মকর্তা বিগত সময়ে অপমানজনক জুনিয়রের অধীনে ডাম্পিং পোস্টিংয়ে ছিলেন। একাধিক কর্মকর্তা মনে করেন, বর্তমানে প্রশাসনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ‘বিশ্বাসযোগ্যতা সংকট’। কারণ, একটি বড় অংশ বিশ্বাস করতে পারছেন না যে পদোন্নতি প্রক্রিয়া পুরোপুরি নিরপেক্ষ।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সরকার প্রশাসনে ‘ভারসাম্য’ বজায় রাখার চেষ্টা করছে। তবে বাস্তবে সেই ভারসাম্য কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েই গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসনে দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া বিভাজন একদিনে দূর করা সম্ভব নয়। তবে পরিবর্তনের পর সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা ছিল-অন্তত বঞ্চনার পুরোনো অভিযোগগুলো নতুনভাবে মূল্যায়ন করা হবে। কিন্তু যদি একই ধরনের কর্মকর্তারা বারবার পদোন্নতির শীর্ষে থাকেন, তাহলে ‘পরিবর্তন’ শব্দটি শুধু রাজনৈতিক স্লোগান হয়েই থেকে যাবে।
প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, যারা সব সরকারেই সুবিধা পান, তারা কখনোই প্রকৃত পরিবর্তন চান না। কারণ পরিবর্তন হলে জবাবদিহিতা বাড়ে। তাহলে সরকার কি সত্যিই প্রশাসনে নতুন সংস্কৃতি গড়তে চায়, নাকি পুরোনো বলয়কেই নতুনভাবে ব্যবহার করছে?
সচিব পদোন্নতি নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্ক তাই কেবল কয়েকজন কর্মকর্তার পদ পাওয়া বা না পাওয়ার বিষয় নয়। এটি রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো কতটা নিরপেক্ষ, কতটা জবাবদিহিমূলক এবং কতটা পেশাদার- সেই বড় প্রশ্নও সামনে এনে দিয়েছে। প্রশাসনে যদি মেধা ও ন্যায্যতার বদলে ‘সুবিধাভোগী পরিচয়’ সবচেয়ে বড় যোগ্যতা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবে রাষ্ট্রই।