× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

অসীমান্তিক বাঙালির শিকড়, সংস্কৃতির আকাশ উন্মুক্ত

প্রবা প্রতিবেদন

প্রকাশ : ২৯ মে ২০২৬ ১০:০১ এএম

আপডেট : ৩০ মে ২০২৬ ১৪:৩৮ পিএম

অসীমান্তিক বাঙালির শিকড়, সংস্কৃতির আকাশ উন্মুক্ত

দেশভাগ বা কাঁটাতারের বেড়া বাঙালির জাতিসত্তাকে দাবিয়ে রাখতে পারেনি। সীমান্তের দুই পারের শিল্পী-সাহিত্যিকরা তাদের সৃষ্টিসুখের উল্লাসে নিজেদের অসীমান্তিক করে তুলেছেন বারবার। ভৌগোলিক বা রাজনৈতিক সীমারেখার ছাড়িয়ে বাঙালিয়ানার সুবাস ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। দুই পারের হৃদয়েই তো রবীন্দ্রনাথ, চেতনাতে নজরুল! ভিসা জটিলতা বা সীমান্তে প্রহরীদের রক্তচক্ষু বাঙালির আবেগকে আটকে রাখতে ব্যর্থ। তাই বাঙালির সংস্কৃতি আজ গোটা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। 

বাংলা ভাষা ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মিলিত ঐতিহ্য, সাহিত্য, শিল্প, ও জীবনযাত্রা কোনও একটি দেশের মানচিত্রে সীমাবদ্ধ নয়। জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও অঞ্চল নির্বিশেষে সমস্ত বাঙালির আবেগ ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছিন্ন মেলবন্ধন বাঙালি জাতিসত্তা। ঢাকায় অমর একুশের সালাম-বরকতদের মতোই শিলচরে উনিশে মের কানাইলাল নিয়োগী, কমলা ভট্টাচার্যদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত মর্যাদার বাহক বাঙালি জাতিসত্তা। বাঙালি রক্তের বিনিময়ে দুনিয়া পেয়েছে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’। 

বিদায়ী ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা যথার্থই বলেছেন, ‘ভারত ও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বন্ধন জাতীয় সীমানার চেয়েও প্রাচীন ও গভীর’। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন একাত্তরে পাকিস্তানি বর্বরতার বিরুদ্ধে ভারতীয় শিল্পী রবিশঙ্করের বাংলাদেশের জন্য সংগীতানুষ্ঠান ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর কথা। এই কনসার্ট বিশ্ববাসীকে ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ’-এর প্রতি সহমর্মী করে তুলেছিল। সে কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রণয় ভার্মা বলেছেন, ‘এসবই আমাদের গভীর মানবিক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের প্রতিচ্ছবি, যা দীর্ঘস্থায়ী মৌখিক ইতিহাস ও চর্চায় সমৃদ্ধ’।

চিরকালই পদ্মা ও গঙ্গা পারের মানুষ একই সংস্কৃতিকে লালন করে এসেছেন। লোকসংস্কৃতির সুরও একই আঙ্গিকে বাঁধা। ভারত ও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন ভাষা, সাহিত্য, সংগীত এবং ঐতিহ্যগত উৎসবের মাধ্যমে প্রবহমান এক চিরন্তন আত্মিক সম্পর্ক। ভৌগোলিক সীমারেখা থাকলেও দুই বাংলার মানুষ একই শিকড় ও সংস্কৃতির ধারক। ধর্ম বা রাজনীতি দিয়ে যারাই বিভেধ ঘটাতে চেয়েছেন তারাই অতীতে বারবার পরাস্ত হয়েছেন। আমাদের আত্মীয়তার শিকড় অনেক গভীরে। উভয়ের রক্তেই বইছে একই কৃষ্টি ও পরম্পরার স্রোত।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম থেকে শুরু করে জীবনানন্দ দাস, হুমায়ুন আহমেদদের হাত ধরে সাহিত্যকর্ম অবিভক্ত বাংলার সীমানা ছাড়িয়ে গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানিয়েছেন বাংলাদেশের জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের চেতনাকে আরও ছড়িয়ে দিতে চলতি বছরের ২৫ মে থেকে শুরু করে আগামী এক বছর 'নজরুল বর্ষ' হিসেবে পালিত হবে। নজরুল হচ্ছেন বাঙালির আত্মার আত্মীয়। তাকে নিয়ে দুই বাংলাতেই বহমান বাঙালির সংস্কৃতিচর্চা।

বাংলা ভাষা আজ বিশ্বের নানা প্রান্তে সমাদৃত। বাংলার বাউল গান থেকে শুরু করে রবীন্দ্রসঙ্গীত, আধুনিক বাংলা গান এবং লোকসঙ্গীত বিশ্বমঞ্চে বাঙালির আত্মপরিচয় তুলে ধরে। বাংলাদেশের পহেলা বৈশাখ বা ভারতের দুর্গাপুজো এখন বিশ্ব ঐতিহ্য। বাঙালির খাদ্যাভাস এবং ঐতিহ্যবাহী পোশাক তাঁতের শাড়ি ও ধুতি-পাঞ্জাবি বিশ্বজুড়ে বাঙালিদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক। বেতার যোগাযোগ ব্যবস্থা আর মুঠোফোনের হাত ধরে বাঙালির সংস্কৃতি চর্চা আজ অসীমান্তিক চেহারা নিয়েছে। সামাজিক মাধ্যম, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং বিশ্বায়নের প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা বাঙালিরা আজ হয়ে উঠেছেন নিজেদের ভাষার ও সংস্কৃতির এক একজন অঘোষিত দূত।

দুই দেশের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত চলচ্চিত্র আমাদের সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করেছে। উভয় পারের প্রযোজক, পরিচালক ও কলাকূশলীরা একসঙ্গে কাজ করে দুই পারের মানুষের বিনোদনের চাহিদা মিটিয়ে সুস্থ সাংস্কৃতিক পরিবেশ গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা নিয়েছে। কলকাতা ও ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব সেই সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করেছে।

সীমান্তে বিএসএফ বা বিজিবি যতোই চোখ রাঙাক না কেন, মাছে ভাতে বাঙালি দুই পারেই সমান স্বচ্ছন্দ। পদ্মা বা গঙ্গার ইলিশ মাছের স্বাদ থেকে বাঙালিকে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে বঞ্চিত করা যাবে না। পিঠা-পুলির সঙ্গে দুই পারের বাঙালিরাই রসগোল্লা, সন্দেশ আর মিষ্টিদইয়ের প্রতি  নিজেদের ভালবাসা কখনও ভুলতে পারে না। ভোজনরসিক বাঙালির হেঁসেল দুই বাংলাতেই সমানভাবেই ভালো ভালো খাবার উপহার দিয়ে চলেছে।  

সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নিয়মিত মেলবন্ধন আরও বাড়াতে ঢাকা ও কলকাতায় ফের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন জরুরি।  তাই দুই বাংলার শিল্পীদের মেলবন্ধনে ইন্দিরা গান্ধী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র (আইজিসিসি) বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান কর্মসূচি পরিচালনা করছে। বাংলাদেশের তরফেও এধরনের কর্মকাণ্ড অতীতে পরিচালিত হয়েছে। নতুন সরকার ফের সেই কর্মকাণ্ড শুরু করবে বলে সংস্কৃতি কর্মীদের প্রত্যাশা রয়েছে। 

গত মাসেই আইজিসিসি আয়োজিত ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে শ্রীকান্ত আচার্যের সঙ্গী হয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রথিতযশা শিল্পী অদিতি মহসিন।  কলকাতায় ফিরে শ্রীকান্ত লিখেছেন, ‘বাংলাদেশ তথা এই উপমহাদেশের অন্যতম সেরা শিল্পী অদিতি মহসিন আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু। আমাদের দ্বৈত ও একক গানের মধ্য দিয়ে দুই বাংলার সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন আমি আরও একবার গভীরভাবে অনুভব করলাম’।

দেশভাগ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতালাভ থেকে শুরু করে বাঙালি জাতির ওপর দিয়ে ঝড় কম যায়নি। কিন্তু তারপরও বাঙালি আগলে রেখেছে নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধ বাঙালির আবেগ। বাঙালির সংস্কৃতির দৃশ্যরূপ আমরা চলচ্চিত্রের পর্দায় উপভোগ করতে পারি। ঋত্বিক ঘটকের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’, গৌতম ঘোষের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’, মনতাজুর রহমান আকতারের ‘মনের মতো মন’, ইফতেখার রহমানের ‘অগ্নি ২’, ওয়াজের আলির সুমন ‘অঙ্গার’ থেকে শুরু করে বহু সিনেমা উভয় পারের বাঙালিকে তার শিকড়ের টান উপভোগ করিয়েছে। ভারতের জনপ্রিয় বাঙালি অভিনেতাদের তালিকায় ঢুকে পড়েছেন, শাকিব খান, আরিফিন শুভ, সিয়াম আহমেদ, চঞ্চল চৌধুরী, মোশাররফ করিমদের থেকে শুরু করে জয়া আহসান, বিদ্যা সিনহা মিম, নুসরাত ফারিয়া, পূর্ণিমা, মেহজাবিন চৌধুরী, নুসরত ইমরোজ তিশারা। কলকাতা টলিউডের জিৎ, দেব, প্রসেনজিৎ, আবির চ্যাটার্জি, যিশু সেনগুপ্ত, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, শুভশ্রী গাঙ্গুলী, কোয়েল মল্লিক, মিমি চক্রবর্তী, পাওলি দামরা বাংলাদেশেও জনপ্রিয়।  দুই দেশের শিল্পীদের মেলবন্ধনে নির্মিত ‘শিকারি’, ‘বাদশা দ্য ডন’, ‘নবাব’, ‘চালবাজ’ ও ‘তুফান’-এর মতো চলচ্চিত্র দুই বাংলার জনপ্রিয় নায়ক-নায়িকাদের একসঙ্গে বাণিজ্যিক ছবির পর্দা কাঁপাতে দেখা গেছে।

বাংলাদেশের তারকারা এখন কলকাতার টলিউডে নিয়মিত অভিনয় করছেন, তেমনি ভারতের তারকারাও বাংলাদেশের সিনেমা ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মে নিয়মিত কাজ করছেন।  ভারত ও বাংলাদেশের সঙ্গীত শিল্পীরাও দুই বাংলাতেই সমানভাবে সমাদৃত। শানু, শ্রেয়া ঘোষাল, অরিজিৎ সিং, জীৎ গঙ্গোপাধ্যায়, এবং অনুপম রায়ের মতো ভারতীয় শিল্পীরা বাংলাদেশে দারুণ জনপ্রিয়। অন্যদিকে, রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিন, অর্ণব, জেমস, মমতাজ, তাহসান রহমান খানের মতো শিল্পীরা ভারতেও ব্যাপক জনপ্রিয়। রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, সাদি মহম্মদ, অদিতি মহসিন, ফিরোজা বেগম. ফেরদৌস আরা অথবা মান্না দে, কিশোরকুমার, ড. ভূপেন হাজারিকা বা সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়দের জনপ্রিয়তা দুই পারেই সমান। 

লালন শাহ (ফকির), শাহ আব্দুল করিম, হাসন রাজা, কাঙ্গাল হরিনাথ, পূর্ণদাস বাউল, পার্বতী বাউল, সনাতন দাস বাউলরা অসীমান্তিক। ড. ভূপেন হাজারিকার ‘গঙ্গা আমার মা পদ্মা আমার মা’-র ‘একই আকাশ একই বাতাস, এক হৃদয়ে একই তো শ্বাস’ মনে করিয়ে দিয়ে কবির সুমনও ঘেচাতে চেয়েছেন সীমান্তের ‘লেফট রাইট’! দুই বাংলার সুরেই ধ্বণিত হয়েছে বাঙালির জয়গান। ধর্ম বা রাজনীতির উর্ধে উঠে বাঙালি চিরকালই আগলে ধরতে চেয়েছে নিজের শিকড়কে, কৃষ্টিকে। তাকে উপেক্ষা করে সার সাধ্যি!

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা