সড়ক-মহাসড়ক
মাসুদুল হাসান
প্রকাশ : ২৬ মে ২০২৬ ১০:৫৬ এএম
আপডেট : ২৬ মে ২০২৬ ১১:০৪ এএম
টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে রডবোঝাই ট্রাক উল্টে সোমাবার প্রাণ গেছে ১৫ জনের। ছবি: ফেসবুক থেকে
প্রতি কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে প্রতিবেশী ভারত ও চীনের তুলনায় অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করে বাংলাদেশ। শুধু তাই নয়, বিশ্বব্যাংকের হিসাবে-পৃথিবীর সব দেশের মধ্যে সড়ক নির্মাণের খরচ বাংলাদেশেই সবচেয়ে বেশি। বেশি। তারপরও ব্যবস্থাপনায় অবহেলা, ত্রুটিপূর্ণ পরিকল্পনা ও আইন মানতে চালকদের অনীহার কারণে দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলো যেন হয়ে উঠেছে ‘মৃত্যু উপত্যকা’।
বিগত ২০২৫ সালে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৭৫৮৪টি। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৭৩৫৯ জন এবং আহত হয়েছেন ১৬৪৭৬ জন। এর আগের বছর (২০২৪) দেশে ৬ হাজার ৯২৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭২৯৪ জন নিহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ১২০১৯ জন। প্রাণে বাঁচলেও আহতদের অনেককেই বরণ করতে হয়েছে পঙ্গুত্বের অভিশাপ। চলতি বছরও প্রতিদিনই ঘটছে অসংখ্য সড়ক দুর্ঘটনা। গতকাল সোমবারই টাঙ্গাইলে ট্রাক উল্টে নিহত হয়েছেন ১৫ জন। এ ছাড়া এ দিন সারা দেশে পৃথক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন আরও ১১ জন। এসব পরিসংখ্যান বলছে, সড়ক-মহাসড়কে মৃত্যু ও পঙ্গুত্বের মিছিল কিছুতেই থামছেই না। ফলে উচ্চমূল্যে তৈরি করা সড়কের ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে।
এ বিষয়ে হাইওয়ে পুলিশ সুপার মোমতাজুল এহসান আহাম্মদ হুমায়ুন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “মহাসড়কে অবৈধ থ্রি-হুইলার বা তিন চাকার যান চলাচল ও ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ”।
মহাখালী বাস টার্মিনালে জামালপুরগামী যাত্রী একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা আবেদা হক এই প্রতিবেদককে বলেন, দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু যেন স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। গণমাধ্যমে প্রচার হওয়া প্রতিদিনের মৃত্যুর সংবাদ নিয়ে তেমন কোনো হইচই নেই।
প্রতিদিনের বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের সহায়তায় দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে খোঁজ নিয়ে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্ষায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে দেশের সড়কের মাঝে ছোট-বড় গর্তের সৃষ্টি, সড়ক-মহাসড়কে মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত রিকশা, সিএনজি অটোরিকশা, নসিমন-করিমন অবাধে চলাচল, জাতীয় মহাসড়কে রোড সাইন বা রোড মার্কিং, সড়কবাতি না থাকায় হঠাৎ ফিডার রোড থেকে যানবাহন উঠে আসা, সড়কে মিডিয়ান বা রোড ডিভাইডার না থাকা, সড়কে গাছপালায় বাঁকের সৃষ্টি- এসব কারণে মহাসড়কগুলোতে অনবরত দুর্ঘটনা ঘটেই চলছে।
জানা গেছে, মহাসড়কের নির্মাণ ত্রুটি, যানবাহনের ত্রুটি, ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতা এসব কারণও তো আছেই। এ ছাড়া উল্টো পথে যানবাহন চলাচল দুর্ঘটনার একটি অন্যতম কারণ। জেলা শহরের স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে মনে করছেন, অদক্ষ চালক এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচলের কারণেও দুর্ঘটনার ঝুঁকি প্রতিনিয়ত বাড়ছে। চালকদের বিরামহীন ও বিশ্রামহীনভাবে যানবাহন চালানোর ফলে মহাসড়কে গাড়ির ওপর নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ে।
মহাসড়কে দুর্ঘটনা নিয়ে হাইওয়ে পুলিশের উপ-মহাপরিদর্শক (সদ্য অবসরে যাওয়া) ইমতিয়াজ আহমেদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “রাতের বেলা মহাসড়কের পাশে গাড়ি থামিয়ে রাখার কারণে অনেক দুর্ঘটনা ঘটে। যদিও চালকরা এটি করতে বাধ্য হোন। চালকদের দীর্ঘ ভ্রমণে বিশ্রামের ব্যবস্থা না থাকায় শারীরিক ক্লান্তি দুর্ঘটনা ঘটায়”।
তিনি বলেন, “আবার মহাসড়কে দুর্ঘটনা ঘটার পর তৎক্ষণাৎ উদ্ধার করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দিতে পারলে প্রাণহানি কমে আসতে পারে। এ সবকিছু মাথায় রেখে হাইওয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলে প্রতিটি থানা সংলগ্ন একটি অ্যাম্বুলেন্সসহ ক্লিনিক স্থাপনের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে”।
এ বিষয়সহ হাইওয়ে পুলিশের চাহিদার বেশকিছু বিষয় মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে, যেগুলো ঝুলে আছে বলে তিনি জানান।
এ বিষয়ে বাংলাদেশে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) দুর্ঘটনা রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক হাদিউজ্জামান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “মহাসড়কের দুর্ঘটনা বেড়ে যাওয়ার বড় কারণ প্রয়োজনীয় সার্ভিস লেন করা হয় না। ফলে ধীরগতির যানবাহন মূল সড়কে উঠে আসে। মহাসড়কের মসৃণতায় গতি বাড়লেও তা নিয়ন্ত্রণে রাখার অনুশীলন করতে হবে”।