শিল্পকলা একাডেমিতে তিন দিনব্যাপী নজরুল জয়ন্তীর সমাপনী অনুষ্ঠানে নৃত্য পরিবেশন করছেন শিল্পীরা। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বিশ্বশান্তি, সম্প্রীতি ও সাম্যের বার্তাবাহী অসাম্প্রদায়িক চেতনার চির উন্নত শিরÑ কাজী নজরুল ইসলাম। অত্যাচার, অনাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে যুগ যুগ ধরে সোচ্চার তাঁর কবিতা। শুধু কি তাই? তাঁর রচিত প্রেম-বিরহের কবিতা বা গানেরও আবেদন চিরন্তন। আজ ১১ জ্যৈষ্ঠ বাংলা সাহিত্যের ‘বিদ্রোহী কবি’ এবং গানের জগতে ‘বুলবুল’ নামে খ্যাত এই কবির ১২৭তম জন্মবার্ষিকী।
কালজয়ী এই প্রতিভার কর্মময় স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পৃথক বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তার বাণীতে বলেন, কাজী নজরুলের অমর সৃষ্টি শুধু নিজ ধর্ম, সমাজ-সম্প্রদায়, দেশ ও কালের গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকেনি, ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে সর্বদা গেয়েছে মানবতার জয়গান। হয়ে উঠেছে সকল সমাজের, সকল কালের।
পৃথক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, আমাদের জাতীয় ইতিহাসের অবিস্মরণীয় নাম কাজী নজরুল ইসলাম। পরাধীন, পর্যুদস্ত, পরাভূত জাতির ভাগ্যাকাশে তার আবির্ভাব ছিল আলোকবর্তিকার মতো। দিকনির্শেক বাতিঘরের মতো। মুমূর্ষু জাতিকে জাগিয়ে দিয়ে সামগ্রিকভাবে সচেতন করার জন্য, স্বয়ংসম্পূর্ণ করার জন্য যেÑ সর্বপ্লাবী প্রতিভার তখন দরকার হয়ে পড়েছিল, জাতীয় কবি ছিলেন সেই প্রার্থিত ও বহু কাঙ্ক্ষিত প্রতিভা।
‘দ্রোহের কবি, প্রাণের কবি নজরুল’ প্রতিপাদ্যে কবির এবারের এ জন্মবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে জাতীয়ভাবে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এবার নজরুলজয়ন্তীর মূল আয়োজন অনুষ্ঠিত হচ্ছে ময়মনসিংহের ত্রিশালে কবির বাল্যস্মৃতি বিজড়িত দরিরামপুরের নজরুল একাডেমি মাঠের ‘নজরুল মঞ্চে’। গত শনিবার বিকালে তিন দিনব্যাপী এই আয়োজনের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ওই অনুষ্ঠানেই ‘নজরুল বর্ষ’ ঘোষণা করেন তিনি। আগামী বছরের জুন পর্যন্ত ‘নজরুল বর্ষে’ তার সাহিত্য ও জীবন-দর্শনের নানা দিক নিয়ে থাকবে নানা আয়োজন।
অন্যদিকে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমি, নজরুল ইনস্টিটিউট নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। এ ছাড়া জাতীয় কবির জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আগামী ৫ ও ৬ জুন দেশের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান ছায়ানট আয়োজন করবে দুই দিনব্যাপী ‘নজরুল-উৎসব ১৪৩৩’।
কবি নজরুল ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ (ইংরেজি ১৮৯৯ সাল) পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোলের জামুরিয়া থানাধীন চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার অকালমৃত্যুতে পরিবারের ভরণপোষণের জন্য শিশু বয়সেই মক্তবে শিক্ষকতা, মাজারে খাদেম এবং মসজিদের মুয়াজ্জিনের কাজ শুরু করেন তিনি। পরে ১৯১৭ সালে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। অংশ নেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধেও। এরই মাঝে একদিন সবাইকে চমকে দিয়ে মাত্র একুশ বছর বয়সে ১৯২১ সালে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা রচনার মধ্য দিয়ে বাংলার সাহিত্যাকাশে দোর্দণ্ড প্রতাপে আত্মপ্রকাশ করেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি নাড়িয়ে দিয়েছিলেন তৎকালীন ব্রিটিশ শাসকদের ভিত।
তারপর থেকে পাদ-প্রদীপের আলোয় উঠে আসা এই কবি একটানা লিখে গেছেন দেশের স্বাধীনতার পক্ষে আর গণমানুষের নিপীড়ন, বৈষম্য, শোষণ ও পরাধীনতার বিরুদ্ধে। তার লেখার প্রায় প্রতিটি কবিতা-গানের পরতে পরতে উঠে এসেছে সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মান্ধতা রোধে প্রাসঙ্গিক নানান বিষয় এবং বিশ্বমানবমুক্তি আর ভালোবাসার জয়গান। সময়ের পথপরিক্রমায় মানুষের চেতনায় আঘাত করে দেশপ্রেম আর সত্যের পক্ষে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে জাগিয়ে তোলার বিস্ময়কর ক্ষমতা লালন করতেন বলে তিনি হয়ে উঠেছিলেন অন্যায়-অবিচার, দুঃশাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের মূর্ত প্রতীক।
মাত্র ২২ বছর ব্যাপ্তির লেখক জীবনে তিনি দু’হাতে লিখেছেন গল্প-উপন্যাস ও নাটকসহ বিভিন্ন বিষয়ে দারুণ সব প্রবন্ধও। তবে তার সাহিত্যকর্মের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উল্লেখযোগ্য গান। তিনি তিন হাজারেরও অধিক গান রচনা করেছেন। এসব গানের বড় একটি অংশ তারই সুরারোপিত। তিনি ১৯টি রাগেরও সৃষ্টি করেনÑ যা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। এ ছাড়াও তিনি বাংলা গানে নতুন ধারা অর্থাৎ ইসলামী সংগীত তথা গজলের স্রষ্টা। তাঁর রচিত ‘চল চল চল, ঊর্ধ্বগগনে বাজে মাদল’ বাংলাদেশের রণসংগীত।
১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে মারাত্মক স্নায়বিক অসুস্থতায় আকস্মিকভাবে কবি নজরুলের সব সক্রিয়তার অবসান হয়। ১৯৭২ সালে সপরিবারে তাঁকে নিয়ে আসা হয় স্বাধীন বাংলাদেশে। ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট তৎকালীন পিজি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন বাংলাদেশের এই জাতীয় কবি। তাঁর লেখা গানÑ ‘মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিয়ো ভাই, যেন গোরের থেকে মুয়াজ্জিনের আযান শুনতে পাই’ কথাকে স্মরণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়।