ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ কোম্পানি লিমিটেড। ছবি: সংগৃহীত
স্বাধীনতার পর পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে সরকারের মালিকানায় যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সম্প্রতি অভিযোগ উঠেছে, জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে সেই মালিকানা নিজেদের হাতেই রেখে দেয় বহুজাতিক কোম্পানি ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ কোম্পানি লিমিটেড (বিএটিবিসি)। শুধু তা-ই নয়, এই মালিকানা জালিয়াতির মাধ্যমে গত ৫৫ বছরে দুই-তিন হাজার কোটি ডলার সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে পাচার করেছে তারা। চাঞ্চল্যকর এই অভিযোগের আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
অভিযোগটি খতিয়ে দেখতে ইতোমধ্যে বিএটিবিসি এবং যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরের (আরজেএসসি) কাছে কোম্পানিটির নিবন্ধন-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন নথি তলব করেছে দুদক। গত বৃহস্পতিবার পাঠানো এক চিঠিতে আগামী ১৫ জুনের মধ্যে এসব নথির সত্যয়িত অনুলিপি ও তথ্য দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তার কাছে জমা দিতে বলা হয়েছে। দুদকের উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, অভিযোগটি নিয়ে দুদক অনুসন্ধান শুরু করেছে। বেশকিছু নথিও তলব করা হয়েছে। তবে অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।
যেভাবে জালিয়াতির শুরু : দুদকে জমা পড়া অভিযোগ অনুযায়ী, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের করাচিতে প্রথম কারখানা স্থাপন করে পাকিস্তান আমেরিকান টোব্যাকো (পিএটি)। পরে ১৯৪৯ সালে চট্টগ্রামে এবং ১৯৬৫ সালে ঢাকায় আরও দুটি কারখানা স্থাপন করা হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই দুটি কারখানা ‘পরিত্যক্ত সম্পত্তি’ হিসেবে বাংলাদেশ সরকারের মালিকানায় যাওয়ার কথা ছিল। পিএটি তাদের ১৯৭২, ১৯৭৩ ও ১৯৭৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে কারখানা হারানোর কথা উল্লেখ করে পাকিস্তান সরকারের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ ও করছাড়ও নিয়েছিল।
কিন্তু দুদকের কাছে জমা পড়া অভিযোগে বলা হয়েছে, পিএটির তৎকালীন ফাইন্যান্স ম্যানেজার কয়েকজন মন্ত্রী, ব্যবসায়ী ও সরকারি কর্মকর্তার যোগসাজশে জাল কাগজপত্র তৈরি করেন। আরজেএসসি শুরুতে এসব নথি গ্রহণে আপত্তি জানালেও প্রভাবশালীদের চাপে তা নিতে বাধ্য হয়। ফলে পাকিস্তানে নিবন্ধিত কোম্পানির বদলে ‘বাংলাদেশ টোব্যাকো কোম্পানি’ (বিএটিসি) বা এখনকার বিএটিবিসিকে বাংলাদেশে নিবন্ধিত দেখানো হয়। এভাবেই ঢাকা ও চট্টগ্রামের কারখানাসহ মালিকানা ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর (বিএটি) হাতেই থেকে যায়।
বর্তমানে দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৫৪০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের এই কোম্পানির মোট শেয়ারের ৭১ দশমিক ৯১ শতাংশ উদ্যোক্তা পরিচালকদের এবং শূন্য দশমিক ৬৪ শতাংশ বাংলাদেশ সরকারের হাতে। বাকি শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের রয়েছে।
জালিয়াতি আড়াল করতে প্রভাবশালীদের ব্যবহার : জালিয়াতির এই কার্যক্রম নির্বিঘ্ন করতে এবং কর ও ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগ আড়াল করতে গত তিন দশকে সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও সচিবদের কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে নিয়োগ বা মনোনয়ন দিয়েছে বিএটিবিসি। পাশাপাশি রাজনীতিকদেরও লাভজনক এজেন্সি দিয়ে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগে এটিকে ‘বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দুর্নীতি ও মানি লন্ডারিংয়ের ঘটনা’ বলে দাবি করা হয়েছে। সত্যতা যাচাইয়ে ঢাকার আরজেএসসির নথির পাশাপাশি পাকিস্তানের করাচিতে পিটিসির ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন খতিয়ে দেখার অনুরোধ জানানো হয়েছে। এজন্য ইসলামাবাদে বাংলাদেশ দূতাবাস ও করাচিতে কনস্যুলেটের মাধ্যমে নথি সংগ্রহের পরামর্শ দিয়েছেন অভিযোগকারী।
দুদক যেসব নথি চেয়েছে : অনুসন্ধানের দায়িত্ব পাওয়ার পর দুদকের সহকারী পরিচালক সাজিদ-উর-রোমান সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বেশকিছু নথিপত্র চেয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে : বাংলাদেশ টোব্যাকো কোম্পানি লিমিটেড, পাকিস্তান টোব্যাকো কোম্পানি লিমিটেড ও ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ কোম্পানির নিবন্ধন-সংক্রান্ত সব রেকর্ড; অনুমোদিত মেমোরেন্ডাম অব অ্যাসোসিয়েশন ও আর্টিকেল অব অ্যাসোসিয়েশন; কোম্পানির মালিকানা, নিবন্ধিত কার্যালয় ও কারখানার তালিকা; সার্টিফিকেট অব ইনকরপোরেশনের নম্বর ও তারিখ; অনুমোদিত মূলধন, পরিশোধিত মূলধন ও শেয়ারের সংখ্যা এবং কোম্পানির পরিচালক, পরিচালকদের সম্মতিপত্র ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব রেকর্ডপত্রের সত্যয়িত অনুলিপি।