সংসদ ভবন। ফাইল ছবি
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে জনমুখী ও কল্যাণমূলক করতে জাতীয় সংসদের সদস্যদের মতামত নেবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। আগামী ২১ মে জাতীয় সংসদ ভবনে এমপিদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সুপারিশ ও মতামত নেওয়ার জন্য এক বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে। এর আগে শুধু নির্দিষ্ট কয়েকটি কমিটির সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করে তাদের মতামত নেওয়া হতো।
এই প্রথমবারের মতো সকল এমপিকেই বৈঠকে ডাকা হয়েছে। যাতে দেশের কোনো প্রান্তের কোনো ছোট ইস্যুও বাজেট থেকে বাদ না পড়ে। অর্থবছরের বাজেট ছাড়াও বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা (এডিপি) সংসদে উত্থাপন করা হয়। যাতে বিভিন্ন এলাকার উন্নয়ন পরিকল্পনার তালিকা থাকে।
আগামী ৭ জুন শুরু হবে ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম বাজেট অধিবেশন। গত অর্থবছরে সংসদ না থাকায় এক বছর পর জাতীয় সংসদে পেশ হচ্ছে অর্থবছরের বাজেট। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপির প্রথম বাজেট এটি। এ কারণে এবারের বাজেট অধিবেশন অন্য সময়ের চেয়ে একটু ব্যতিক্রম ও বিশেষও বটে। শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসন ও অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে একটি নির্বাচিত সরকারের বাজেটের প্রতি জনপ্রত্যাশার চাপ অনেক। একটি ভঙ্গুর অর্থনীতির সামনে দাঁড়িয়ে জনকল্যাণমূলক বাজেট প্রণয়নের মতো চ্যালেঞ্জিং কাজ রয়েছে সরকারের সামনে।
মোট বরাদ্দের মধ্যে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা (৬৩.৩৩ শতাংশ) সরকারি তহবিল থেকে অর্থায়ন করা হবে এবং বাকি ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা (৩৬.৬৭ শতাংশ) বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে আসবে। গত ১৮ মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (এনইসি) ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৩ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুমোদন করেছে। এটি বিগত অর্থবছরের মূল বরাদ্দের চেয়ে ৩০.৪৩ শতাংশ বেশি।
নতুন এই উন্নয়ন বাজেটটি চলতি অর্থবছরের সংশোধিত এডিপির তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি। নতুন উন্নয়ন বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এজন্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন, রেল ও নৌপথের সম্প্রসারণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করতে পরিবহন ও যোগাযোগ খাত ১৬.৭০ শতাংশ নিয়ে সামগ্রিকভাবে সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে।
বাজেটের ১৫.৮৬ শতাংশ বরাদ্দ নিয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে শিক্ষা খাত। এরপর স্বাস্থ্য খাতে ১১.৮৪ শতাংশ এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ১০.৯০ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। নিম্ন আয়ের এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষায় বাজেটে ১৭ হাজার কোটি টাকা (৫.৬৭ শতাংশ) বরাদ্দ করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের স্টাফদের সম্মানী।
ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে সরকার সুষম আঞ্চলিক উন্নয়নের ওপরও জোর দিয়েছে। এর অংশ হিসেবে উত্তরাঞ্চল, পার্বত্য অঞ্চল, হাওর এলাকা এবং উপকূলীয় অঞ্চলগুলোকে লক্ষ্য করে সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া নতুন এডিপিতে বিশেষ উন্নয়ন সহায়তার অধীনে ৩৮,০২৭.৪৮ কোটি টাকা এবং সামাজিক উন্নয়ন সহায়তার অধীনে ১৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ও করপোরেশনের নিজস্ব অর্থায়নের ৮,৯২৪.৮৬ কোটি টাকা যুক্ত করে মোট উন্নয়ন বাজেটের আকার দাঁড়িয়েছে ৩,০৮,৯২৪.৮৬ কোটি টাকা। চলতি বছরের শুরুর দিকে পাওয়া ২,২৬,২৭৮.৬২ কোটি টাকার প্রাথমিক চাহিদার পর অর্থ বিভাগ চূড়ান্ত এডিপি কাঠামো নির্ধারণ করে। অনুমোদিত এই প্যাকেজে ১,১৫০টি অর্থায়িত প্রকল্প রয়েছে এবং কোনো তাৎক্ষণিক বরাদ্দ ছাড়াই ১,২৭৭টি অননুমোদিত নতুন প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা বিএনপির রাষ্ট্র সংস্কার ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের নির্বাচনী ইশতেহারের পাঁচটি স্তম্ভের সাথে গভীরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আগামী ৭ জুন জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন শুরু হলেও বাজেট পেশ করা হবে ১১ জুন। ১২ জুন শুক্রবার প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেবেন অর্থমন্ত্রীসহ সিনিয়র মন্ত্রীরা। সূত্র অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার এক বিশাল জাতীয় বাজেট প্রণয়নের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এই খসড়া বাজেট তৈরি করা হচ্ছে। নতুন এই বাজেটের আকার চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা বেশি।
বিশাল ব্যয়ের এই বাজেট বাস্তবায়নে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) বড় লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের খসড়া অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৬ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রধান ভরসা হিসেবে ধরা হচ্ছে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট খাতকে, যেখান থেকে ৩ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া আয়কর থেকে ২ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হতে পারে।
অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি এবং যোগাযোগ খাতের চলমান মেগা প্রকল্পগুলো দ্রুত শেষ করতে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ইতোমধ্যে ৩ লাখ কোটি টাকা অনুমোদন করেছে এনইসি। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে এবং উৎপাদন খাত সচল রাখতে আগামী বাজেটে ভর্তুকি ও প্রণোদনা খাতে রেকর্ড ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। এর বড় অংশই ব্যয় হবে বিদ্যুৎ, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), সার, খোলাবাজারে খাদ্যপণ্য বিক্রি (ওএমএস) এবং ফ্যামিলি কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) এক প্রাক-বাজেট সংলাপে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্বের এই নতুন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ২৩ থেকে ৪২ শতাংশ বেশি। সিপিডির গবেষকরা বলেন, ‘বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাতের বর্তমান বাস্তবতায় এত বড় লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা প্রায় অসম্ভব। কর ফাঁকি রোধ এবং রাজস্ব আদায়ের দক্ষতা না বাড়ালে অর্থবছর শেষে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হতে পারে।’