তারেক রহমান। ছবি: বাসস
সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ। উপস্থিত সবাই যার যার গন্তব্যে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও বিদায় নিয়ে অনুষ্ঠানস্থল থেকে তার কার্যালয়ের দিকে যাচ্ছিলেন। একটু সামনে এগিয়েই হঠাৎ করে তিনি গতিপথ পরিবর্তন করে উঠে গেলেন তৃতীয়তলায়। ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই অবাক। জনাকীর্ণ তৃতীয়তলায় প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে একটু চুপচাপ যেন। এমন সময় প্রধানমন্ত্রী কাছে ডাকলেন জেলা থেকে আসা সব পুলিশ সুপারকে (এসপি)। প্রধানমন্ত্রীর ডাকে পিনপতন নীরবতা নেমে এলো মুহূর্তেই। অনেক এসপির প্রত্যাশা ছিলÑ এমন কিছু, তারা যদি প্রধানমন্ত্রীর সান্নিধ্য এভাবে পান! তাদের সেই স্বপ্ন পূরণ হয়ে গেল!
পর্যায়ক্রমে সকল এসপি প্রধানমন্ত্রীর সামনে এলেন, সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে সালাম দিলেন। সবার উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নÑ ‘কেমন আছেন?’ প্রধানমন্ত্রীও জানালেন তার স্বপ্নের কথা, দেশের জন্য, জনগণের জন্য চাওয়া-পাওয়ার কথা। এমন অভূতপূর্ণ ক্ষণটি এসপিরা পেয়েছিলেন ১১ মে সোমবার ঠিক দুপুরের আগ মুহূর্তে। এই ক্ষণটির দেখা মেলে প্রধানমন্ত্রীর তেজগাঁওয়ের কার্যালয়ের শাপলা হলে আয়োজিত পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনামূলক ভাষণের পরপরই।
এর আগে সকালে শাপলা হলে পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে, পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে দেশের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় নানা দিক নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। পরে কার্যালয়ের টাইগার গেটের সামনে পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ফটোসেশনে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী।
পুলিশ কর্মকর্তাদের বর্ণনায় সেই মাহেন্দ্রক্ষণ
প্রধানমন্ত্রীর সাথে এসপিসহ সমপদমর্যাদার পুলিশ কর্মকর্তাদের অনির্ধারিত সাক্ষাৎ প্রসঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা হয় একাধিক কর্মকর্তার মধ্যে একজন সহকারী মহাপুলিশ পরিদর্শক (এআইজি), যিনি পুলিশ সদর দপ্তরের একটি শাখার প্রধান। অপরজন হলেন, একটি জেলার পুলিশ সুপার (এসপি)। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দেন।
এআইজি পদমর্যাদার কর্মকর্তা জানান, পুলিশ সপ্তাহের দ্বিতীয় দিনের কর্মসূচির মধ্যে নির্ধারিত ছিল শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রীর দিক নির্দেশনামূলক ভাষণ। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা হলে ওইদিন সকালে আয়োজিত কর্মসূচি উপলক্ষে এসপিসহ সমপদমর্যাদার কর্মকর্তা থেকে শুরু করে আইজিপি পর্যন্ত উপস্থিত ছিলেন। শাপলা হলের নিচতলায় আইজিপিসহ সব এডিশনাল আইজিপি, দোতলায় ডিআইজি ও এডিশনাল ডিআইজি, তৃতীয় তলায় এসপিসহ সমপদমর্যাদার কর্মকর্তাদের বসার ব্যবস্থা ছিল। পুলিশ কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে ৬ জন বিভিন্ন পদবির কর্মকর্তার বক্তব্য শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বক্তব্য দেন। সবশেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উপস্থিত সবার উদ্দেশে ভাষণ প্রদান করেন। তার ভাষণ শেষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পক্ষ থেকে আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়Ñ পৃথকভাবে শাপলার প্রতিটি তলায়।
ওই কর্মকর্তা বলেন, যার যার মতো করে সব পুলিশ কর্মকর্তা নির্ধারিত নিজ নিজ আসন গ্রহণ করে খাবার খাওয়া শুরু করেন। তৃতীয় তলায় এসপিসহ সমপদমর্যাদার পুলিশ কর্মকর্তারা খাবার শেষ করেছেন কেউ, কারও খাবার শেষের পথে। এ সময় পরস্পরের মধ্যে কুশলাদি বিনিময়-টুকটাক কথাবার্তাও চলছিল। অনেকের সাথে অনেক দিন পর দেখাসাক্ষাৎ হওয়াতে অনেকেই কুশলাদি বিনিময় করছিলেন। এমন সময় হঠাৎ করে হেঁটে নিচতলা থেকে দোতলার সিঁড়ি ভেঙে তৃতীয় তলায় এসে হাজির হন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সাথে ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব ও আইজিপি। আচমকা প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে তৃতীয় তলার সরব খাবার রুমটি নীরব হয়ে পড়ে, উপস্থিত সবার মাঝেই পিনপতন নীরবতা বিরাজ করে। সবাই এ সময় বসার আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে যান। কারও মাথায় ক্যাপ না থাকার কারণে প্রধানমন্ত্রীকে স্যালুট না করে সবাই সালাম দেন। তার ভাষায়, হঠাৎ প্রধানমন্ত্রীকে দেখে কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় সবাই। এ সময় প্রধানমন্ত্রী রুমের মাঝ বরাবর দাঁড়িয়ে সবার উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা কেমন আছেন’? বসেন সবাই। সবাই প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নের উত্তর দেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা সবাই একটু আসেন, কথা আছে। এ কথা শোনার পর সব পুলিশ কর্মকর্তা নিজ নিজ আসন ছেড়ে প্রধানমন্ত্রীর সামনে এসে জড়ো হলে গোলাকার আকৃতির তৈরি হয়। সবাই গোল হয়ে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীর কথা শোনেন। শতাধিক পুলিশ কর্মকর্তা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা এখানে যারা আছেন, আমরা সবাই একই মতাদর্শের নাও হতে পারি, কিন্তু আপনারা যখন সরকারের সঙ্গে কাজ করবেন, সেই কাজের মধ্যে যেন নিজেদের ভিন্ন মতাদর্শ প্রতিফলিত না হয়। আমি খোলা মনে বলি, আমি মনে করি না যে, সবাই আমরা একই আদর্শে বিশ্বাসী, রাজনৈতিক বিশ্বাসেও ভিন্নমত থাকতে পারে। প্রত্যেকের ভিন্নমতের প্রতিফলন হবে কেবলমাত্র ভোটের বাক্সে, সরকারি কার্যক্রমে নয়। সরকারি কাজে তার প্রভাব ফেলা যাবে না। তার আগে আমরা সবাই এই দেশটাকে ভালোবাসব। দেশের স্বার্থে আমরা সবাই এক থাকব। ‘নিরাপদ বাংলাদেশ’গড়ে তোলা সম্ভব হলে দেশের সবাই ভালো থাকবে বলে প্রধানমন্ত্রী প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা নিজের স্ত্রী-সন্তানের জন্য, তাদের সুন্দর ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। আমরা যদি সবাই মিলে নিরাপদ বাংলাদেশ নিশ্চিত করতে পারি তাহলে সবার ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হয়, নিরাপদ হয়, নিরাপদ বাংলাদেশ হলে আমরা সবাই ভালো থাকব।’ তিনি বলেন, এই দেশ সবার। সবাই মিলে আমরা নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে চাই। যেখানে সবার ভবিষ্যৎ নিরাপদ থাকবে। আমাদের দলের এক নম্বর মূল এজেন্ডা ছিল দেশের আইনশৃঙ্খলাকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। কর্মসংস্থান সম্ভব হবে বিনিয়োগ আসলে। এই বিনিয়োগ আসবে আইনশৃঙ্খলা ঠিক থাকলে। তাই আসুন, সবাই মিলে একসাথে কাজ করি, দেশের আইনশৃঙ্খলা ঠিক রাখি।
প্রধানমন্ত্রীর এ আহ্বানে উপস্থিত পুলিশ কর্মকর্তারা সমস্বরে বলে ওঠেন, ইয়েস স্যার। আমরাও দেশের জন্য একসাথে কাজ করব স্যার। এরপর প্রধানমন্ত্রী পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে কুশল বিনিময় করেন, এক এক করে সবার সঙ্গে হাত মিলিয়ে বিদায় নেন।
প্রধানমন্ত্রীর সাথে পুলিশ কর্মকর্তাদের অনির্ধারিত ওই কর্মসূচিতে হাজির ছিলেন এমন একাধিক কর্মকর্তা এ প্রতিবেদককে জানান, রাষ্ট্র বা সরকার প্রধানের সাথে শীর্ষ পর্যায়ের সব পুলিশ কর্মকর্তার সরাসরি দেখাসাক্ষাৎ কিংবা সম্মেলনের তেমন একটা সুযোগ থাকে না। শুধুমাত্র বছরে একবার হয় পুলিশ সপ্তাহ। প্রতিবারই আনুষ্ঠানিকতা শেষে সবাই যার যার গন্তব্যে চলে যান। এবারই শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রী সব রেওয়াজ ও আনুষ্ঠানিকতার বাইরে এসে এসপিদের সাথে পৃথকভাবে কুশলাদি বিনিময় করলেন, হাত মেলালেন। সবার খোঁজখবরও নিলেন। এবারই ব্যতিক্রম ঘটল, প্রধানমন্ত্রী দলীয় কোনো আদর্শের কথা বলেননি, দেননি কোনো দলীয় নির্দেশনা। এতে করে মাঠ পর্যায়ে একটা ভালো মেসেজ গেছে যে, দল নয় দেশের জন্যই কাজ করতে হবে। তারা এটাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।