প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ
তারেক রহমান। ফাইল ছবি
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে বর্তমান সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এ খাতে বড় ধরনের সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে সরকার। জানা গেছে, এবারের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১৩ থেকে ১৪ হাজার কোটি টাকা বেশি।
রবিবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি নিয়ে এক বৈঠক হয়। এতে কর্মসূচির বিস্তৃতি, স্বচ্ছতা এবং নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বৈঠক সূত্র জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে যাতে এক টাকাও অপচয় না হয় সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে। এ ছাড়া উন্নত বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় লাইফ-সাইকেল কর্মসূচি চালুর কথা বলেন তিনি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এবারের বাজেটের মূল দর্শন হচ্ছেÑ ‘গর্ভাবস্থা থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা’।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে আগামী বাজেটে দুটি বড় ফ্ল্যাগশিপ কর্মসূচিÑ ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরে ৪১ লাখ নারীপ্রধান পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড এবং ৪২ লাখ ৫০ হাজার কৃষককে কৃষক কার্ড দেওয়া হবে। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা সহায়তা ও নগদ ভর্তুকি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে কৃষক কার্ডের আওতায় ভর্তুকি, কৃষিঋণ, কৃষি উপকরণ এবং সরাসরি সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে। এ ছাড়া খাল খনন ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। শুধু খাল খনন প্রকল্প থেকেই প্রায় ৩৪ লাখ মানুষের অস্থায়ী কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে বলে সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। সব মিলিয়ে নতুন করে প্রায় ১ কোটি ২১ লাখ মানুষকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানের খণ্ডিত সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে ধাপে ধাপে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘লাইফ-সাইকেলভিত্তিক’ সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলতে চায় সরকার। নতুন এই মডেলে গর্ভকালীন মাতৃত্ব সহায়তা দিয়ে রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা শুরু হবে। এরপর শিক্ষা উপবৃত্তি, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সহায়তা, বেকার ভাতা এবং বার্ধক্যকালীন আর্থিক নিরাপত্তাÑ সবকিছু একই কাঠামোর আওতায় আনা হবে।
এ জন্য আগামী অর্থবছর থেকেই ‘ওয়ান পার্সন, ওয়ান অ্যাকাউন্ট’ ভিত্তিক ‘ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি সিস্টেম’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে প্রকৃত উপকারভোগী শনাক্ত করা, একাধিক সুবিধা গ্রহণ রোধ এবং অনিয়ম কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করছে সরকার।
বর্তমানে দেশে মাতৃত্ব ভাতা, দুগ্ধদানকারী মায়ের ভাতা, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি ও মুক্তিযোদ্ধা ভাতাসহ বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু রয়েছে। তবে এসব কর্মসূচির মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে বলে দীর্ঘদিন ধরেই সমালোচনা আছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের একাধিক মূল্যায়নেও দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত দরিদ্রের পরিবর্তে অযোগ্য ব্যক্তিরা সুবিধা পাচ্ছেন। সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, নতুন ডিজিটাল নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু হলে এসব সমস্যা অনেকটাই কমে আসবে।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে বহু বছর ধরেই ‘লাইফ-সাইকেল’ ভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা চালু রয়েছে। যুক্তরাজ্য, সুইডেন, ডেনমার্ক, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, জার্মানি ও কানাডার মতো দেশগুলোতে নাগরিকরা জন্মের আগে মাতৃত্ব সেবা থেকে শুরু করে শিক্ষা, বেকার ভাতা, স্বাস্থ্যসেবা এবং বার্ধক্যকালীন পেনশন সুবিধা পান। বাংলাদেশেও ২০১৫ সালে জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল প্রণয়নের সময় এমন একটি মডেলের কথা ভাবা হয়েছিল। তবে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নানা কারণে সেই উদ্যোগ পরে আর এগোয়নি। বর্তমান সরকার আবারও সেই ধারণাকে সামনে এনে দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা করছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, মূল্যস্ফীতির চাপে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি। তবে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, এর কার্যকর বাস্তবায়ন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ হবে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩২ সালের মধ্যে ধাপে ধাপে দেশের সব নাগরিককে একটি সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। যদি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে বাংলাদেশে সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় এটি হতে পারে সবচেয়ে বড় কাঠামোগত পরিবর্তন।