করপোরেট সুশাসন নীতিমালায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। ছবি: বাসস
বৈশ্বিক বিনিয়োগের আধুনিক প্রেক্ষাপটে আজ শুধু আর্থিক মুনাফাই শেষ কথা নয়, বরং একটি প্রতিষ্ঠান পরিবেশ রক্ষা করছে কি না বা সামাজিকভাবে কতটা দায়িত্বশীল, তা-ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা ও দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে করপোরেট সুশাসন নীতিমালায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
এই সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রথমবারের মতো কোম্পানিগুলোর জন্য এনভায়রনমেন্টাল, সোশ্যাল অ্যান্ড গভর্ন্যান্স (ইএসজি) বা পরিবেশ, সমাজ ও সুশাসন সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে দেশের করপোরেট সংস্কৃতি প্রথাগত আর্থিক প্রতিবেদন ব্যবস্থার বাইরে বেরিয়ে বৈশ্বিক টেকসই রিপোর্টিং মানদণ্ডের যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে।
বিএসইসি সম্প্রতি ‘করপোরেট গভর্ন্যান্স রুলস ২০২৬’-এর খসড়া প্রণয়ন করেছে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে এই বিষয়ে জনমত চেয়েছে। কমিশন সূত্র জানিয়েছে, এই বিধিমালা কার্যকর হওয়ার পর প্রতিটি তালিকাভুক্ত কোম্পানিকে তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে ইএসজি সংক্রান্ত কার্যক্রমের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরতে হবে। আগে এই ধরনের তথ্য প্রকাশ অনেকটা ঐচ্ছিক বা অনানুষ্ঠানিক আলোচনার পর্যায়ে থাকলেও এখন থেকে এটি আইনি কাঠামোর আওতায় আসবে।
বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, অডিট কমিটিকে সরাসরি ইএসজি রিপোর্টিং তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে টেকসই উন্নয়ন ও সুশাসনের বিষয়টি মূলধারার করপোরেট কাঠামোর সঙ্গে একীভূত হয়।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বজুড়ে এখন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু মুনাফাকে প্রাধান্য দেওয়া হয় না, বরং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটি পরিবেশ রক্ষা করছে কি না বা সামাজিকভাবে কতটা দায়বদ্ধ তা খতিয়ে দেখা হয়। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা ইএসজি মেট্রিক্স ব্যবহার করে একটি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি মূল্য ও ঝুঁকি মূল্যায়ন করেন। ফলে বিএসইসির এই উদ্যোগ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করতে সহায়ক হবে।
অনেক বিদেশি ফান্ড এখন কেবল ইএসজি মানদণ্ড মেনে চলা কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে। তবে এই সংস্কারের সুফল শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে দেশের সামগ্রিক পুঁজিবাজারের সুশাসনের মান কতটা উন্নত হচ্ছে তার ওপর।
বিএসইসির নতুন নীতিমালায় কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের কাঠামোতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এখন থেকে প্রতিটি তালিকাভুক্ত কোম্পানির বোর্ডে পরিচালক সংখ্যা হতে হবে সর্বনিম্ন ৫ ও সর্বোচ্চ ২০ জন। নারী নেতৃত্বকে উৎসাহিত করতে বোর্ডে অন্তত একজন নারী পরিচালক থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ ছাড়া স্বতন্ত্র পরিচালকের সংখ্যাও বর্তমানের এক-পঞ্চমাংশ থেকে বাড়িয়ে বোর্ড সদস্যের এক-তৃতীয়াংশ অথবা ন্যূনতম ৩ জন করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই পদক্ষেপটি কোম্পানির অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি ও ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
স্বার্থের সংঘাত এড়াতে এবং প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে বিএসইসি পরিচালক ও উদ্যোক্তাদের শেয়ার ধারণের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করেছে। বিধিমালা অনুযায়ী, কোম্পানির উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে মোট শেয়ারের অন্তত ৩০ শতাংশ ধারণ করতে হবে। এ ছাড়া প্রতিটি স্বতন্ত্র পরিচালককে (অ-নির্বাহী) ব্যক্তিগতভাবে কমপক্ষে ২ শতাংশ শেয়ারের মালিক হতে হবে। ক্ষমতার কেন্দ্রীভূত হওয়া ঠেকাতে কোম্পানির চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পদে একই ব্যক্তি থাকতে পারবেন নাÑ এমন নিয়মও বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।
নতুন বিধিমালায় স্বতন্ত্র পরিচালকদের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এখন থেকে এই পদে দায়িত্ব পালনের জন্য অন্তত ১২ বছরের পেশাদার অভিজ্ঞতা প্রয়োজন হবে, তবে নারী প্রার্থীদের ক্ষেত্রে এই সময়কাল ৮ বছর। নিয়োগ প্রক্রিয়াটি বোর্ড কমিটি, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদনের মাধ্যমে কয়েক ধাপে সম্পন্ন হবে, যা পরিচালকদের স্বেচ্ছাচারী নিয়োগ প্রক্রিয়াকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনবে। একজন স্বতন্ত্র পরিচালক তিন বছরের জন্য নিয়োগ পাবেন এবং মাত্র একবার তা নবায়ন করা যাবে। এ ছাড়া কোনো আর্থিক কেলেঙ্কারি বা অপরাধমূলক রেকর্ড থাকলে কেউ এই পদের জন্য বিবেচিত হবেন না।
কোম্পানির ঝুঁকি মোকাবিলায় এবার অডিট কমিটির পাশাপাশি ‘রিস্ক ম্যানেজমেন্ট কমিট’ বা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটিকে আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে। এই কমিটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও ব্যবসায়িক ঝুঁকির পাশাপাশি পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়ন সংক্রান্ত উদীয়মান ঝুঁকিগুলোও তদারকি করবে। বিএসইসি মনে করে, একটি শক্তিশালী ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামো ছাড়া টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। অন্যদিকে নমিনেশন অ্যান্ড রেমুনারেশন কমিটি (এনআরসি) বোর্ডের বৈচিত্র্য এবং নির্বাহীদের বেতন কাঠামো নির্ধারণে কাজ করবে।
সুশাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে আর্থিক প্রতিবেদনে স্বচ্ছতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এখন থেকে ম্যানেজমেন্ট ডিসকাশন অ্যান্ড অ্যানালাইসিস (এমডিএ) প্রতিবেদনে কোম্পানির তারল্য, বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে হবে। পাশাপাশি কোম্পানির ঝুঁকিসমূহ গুরুত্বের ভিত্তিতে ক্রমানুসারে প্রকাশ করতে হবে। পরিচালকদের প্রতিবেদনে এখন থেকে রিলেটেড পার্টি ট্রানজেকশন, আইপিও ফান্ডের ব্যবহার, লভ্যাংশ নীতি এবং বহু বছরের আর্থিক পারফরম্যান্সের তুলনামূলক চিত্র স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে।
বিএসইসি সূত্র জানায়, করপোরেট সুশাসন পরিপালনের বিষয়টি এখন থেকে চার্টার্ড সেক্রেটারি ফার্ম দ্বারা নিরীক্ষিত হতে হবে, কারণ সুশাসন সংক্রান্ত জটিল বিষয়গুলো মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তাদের পেশাদার দক্ষতা সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে স্টক এক্সচেঞ্জগুলোকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে নিয়মিত এই পরিপালন পর্যবেক্ষণ করতে এবং কোনো বিচ্যুতি ঘটলে তা কমিশনকে দ্রুত অবহিত করতে।
একটি উল্লেখযোগ্য সামাজিক ও নৈতিক পরিবর্তন আনা হয়েছে করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর খাতের ব্যয়ের ক্ষেত্রে। অনেক কোম্পানি লভ্যাংশ না দিলেও সিএসআর খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে থাকে, যা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মাঝে অসন্তোষ রয়েছে। নতুন নিয়মে বলা হয়েছে, শেয়ারহোল্ডারদের অন্তত ১০ শতাংশ লভ্যাংশ প্রদান এবং নিয়মিত বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) সম্পন্ন করা ছাড়া কোনো কোম্পানি সিএসআর কার্যক্রমে অর্থ ব্যয় করতে পারবে না। এটি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।