সোলার প্যানেল। ছবি: বিবিসি
আমদানি-নির্ভর জ্বালানির সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো ও সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে আগামী পাঁচ বছরে সরকার শুধুমাত্র সোলার পাওয়ার দিয়ে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটা পরিকল্পনা নিয়েছে। গত ১৬ এপ্রিল বর্তমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা ২০২৫’ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ক প্রকল্পে বিনিয়োগ সহজীকরণ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারের প্রস্তাব মন্ত্রিসভা বৈঠকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন: প্রকট হতে পারে জ্বালানি সমস্যা |
বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যৎ সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে টেকসই উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। তবে অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও পর্যাপ্ত জমির বিষয়টি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিতে পারে। এজন্য অতীতের সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সঠিক রোডম্যাপ প্রণয়নে গুরুত্ব দিতে হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, চাহিদার দ্বিগুণ উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও আমদানি-নির্ভর জ্বালানি খাতের কারণে তা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ফলে সক্ষমতার অর্ধেক চাহিদা থাকার পরও জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বেড়েছে লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা। এই প্রেক্ষাপটে গত ১৬ এপ্রিল মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা ২০২৫’ এবং ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ক প্রকল্পে বিনিয়োগ সহজীকরণ’ ও ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারের প্রস্তাব’ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও ২০৩০ সালের মধ্যে শুধুমাত্র সৌরশক্তি দিয়ে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটা পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সরকারি যে সমস্ত জমি আছে সেগুলো ব্যবহার করা হবে। প্রাইভেট উদ্যোক্তারা যদি চান, তারাও যোগ দিতে পারেন। এর জন্য একটি কমিটির খসড়া করা হয়েছে। খসড়াটি চূড়ান্ত অনুমোদন করে শিগগিরই কমিটির কাজ শুরু করার কথা।
দেশে নবায়নযোগ্য শক্তির মোট স্থাপিত ক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ৩১৪ মেগাওয়াট, যার মধ্যে প্রায় ১ হাজার ২০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ। এ ছাড়া হাইড্রো (পানিবিদ্যুৎ) ও উইন্ডের (বায়ুবিদ্যুৎ) অবদান তুলনামূলক কম। তবে সামগ্রিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে সৌরের অংশ এখনও সীমিত। গত দুই দশকে দেশের মোট জ্বালানি সক্ষমতার মাত্র ৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ এসেছে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে।
সরকারের পরিকল্পনা সম্পর্কে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, দেশের বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সৌরবিদ্যুৎই সবচেয়ে কার্যকর ও টেকসই সমাধান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এজন্য আগামী পাঁচ বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। তিনি বলেন, অব্যবহৃত সরকারি জমি বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন সংস্থার অধীনে থাকা খালি জমি চিহ্নিত করে সেগুলোতে বড় আকারে সৌর প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। যমুনা নদীর তীরবর্তী ভাঙনে সৃষ্ট খাস জমিও এই পরিকল্পনার আওতায় আনা হচ্ছে। রেলওয়েসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিপুল পরিমাণ অব্যবহৃত জমি রয়েছে, যা বিনিয়োগের আওতায় এনে কাজে লাগানো হবে।
এদিকে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জেলা প্রশাসক সম্মেলনেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে আগামী তিন মাসের মধ্যে দেশের সব জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে সোলার প্যানেল স্থাপনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
জানতে চাইলে বিদ্যুৎ সচিব ফারজানা মমতাজ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে সরকার যে পরিকল্পনা নিয়েছে সেটা বাস্তবায়নের প্রথমিক ধাপ হিসেবেই ডিসিদের এমন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে সকল পরিকল্পনা করা আছে। তারা কাজ শুরু করলে আগামী তিন-চার মাসের মধ্যেই সম্পন্ন করা কঠিন হবে না বলেও জানান তিনি।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) এক মূল্যায়নে দেখা গেছে, ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৯৮০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। আগামী দশকে এ চাহিদা বেড়ে বছরে ১ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছতে পারে। লক্ষ্য অর্জনে এ বছরে ২৩৮ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ চার থেকে ছয়গুণ বাড়াতে হবে। শুধু সরকারি অর্থায়নের মাধ্যমে এই বিশাল চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়; বড় পরিসরে বেসরকারি বিনিয়োগ অপরিহার্য। কিন্তু পর্যাপ্ত সম্ভাব্য প্রকল্পের অভাব, যথাযথ সম্ভাব্যতা সমীক্ষার ঘাটতি এবং ভূমি বা ছাদ ব্যবহারের অনিষ্পন্ন সমস্যার কারণে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক সবুজ অর্থায়ন কর্মসূচি ১০ বিলিয়ন টাকায় উন্নীত করেছে, তবু ৩০০ মিলিয়ন টাকার ঋণসীমা ১০ মেগাওয়াটের মতো বড় সৌর প্রকল্পের জন্য যথেষ্ট নয়।
আইইইএফএ’র প্রধান জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শফিকুল আলম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, সরকার সৌরবিদ্যুৎ উদপাদনের যে আকাঙ্ক্ষা বাড়িয়েছে সেটা একটা পজিটিভ দিক। এখন আমরা কতটুকু অর্জন করতে পারব, নাকি পারব নাÑ এর পুরোটাই নির্ভর করবে রোডম্যাপ কীভাবে করছি তার ওপর। তবে এখানে কিছু প্রতিবন্ধকতা আছে। যেমন ডিসেন্ট্রালাইজড বা ডিস্ট্রিবিউটেড সিস্টেম। রুফটপ সোলারে উচ্চ আমদানি শুল্ক রয়েছে, এটা কীভাবে কমানো যায় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। আরেকটি বিষয় হচ্ছেÑ রোডম্যাপ করার পর আপনার যে ইনভেস্টমেন্ট লাগবে সে ইনভেস্টমেন্টের জন্য একটা অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা। রিনিউয়েবল এনার্জি মার্চেন্ট পাওয়ার পলিসির আন্ডারে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে। সেখানে ওপেন এক্সেস কস্ট একটু হাই, প্রায় তিন টাকার মতো দেখা যাচ্ছে। সেটাও বিবেচনায় আনতে হবে। আরেকটা হলোÑ পিপিপির আন্ডারে বাস্তবায়িত প্রজেক্টে সরকার জমি দেবে, সেটা ভালো। তবে এ ক্ষেত্রে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেটা ঠিকভাবে করা যাচ্ছে কি না বা সময়মতো করা যাচ্ছে কি নাÑ এসব বিষয়ে নজর দিতে হবে। কেননা অতীতে পিপিপি প্রজেক্ট করতে অনেক সময় লেগে গেছে। সরকার যদি পরবর্তী অ্যাকশন প্ল্যান ঠিকমতো ডিজাইন এবং বাস্তবায়ন করতে পারেÑ তাহলে হয়তো লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা খুব কঠিন হবে না।
বড় বিনিয়োগ ও জমির জোগান সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে মনে করেন কেউ কেউ। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে আমাদের দেশে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সীমিত হলেও এর সম্ভাবনা বিশাল। সঠিক নীতি, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে আগামী দুই দশকে এটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে। সৌরপার্ক, ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ, শিল্পকলকারখানায় ছাদবিদ্যুৎ, সৌরবিদ্যুতে কৃষি সেচ এবং সৌরবিদ্যুৎ ব্যাটারিতে সংরক্ষণÑ এসব খাতে বড় উন্নয়ন হবে। আর এতে অর্থনৈতিকভাবে জ্বালানি আমদানি কমবে, উৎপাদন খরচ কমবে এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। পরিবেশগতভাবে কার্বন নিঃসরণ কমবে, বায়ুদূষণ কমবে এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা সহজ হবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, ‘আমরা যদি ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ গ্রিডে যোগ করতে পারি, তবে এটি কয়েক হাজার কোটি ডলারের এলএনজি বা কয়লা আমদানির বোঝা কমিয়ে দেবে।’ তার মতে, সৌরবিদ্যুৎ এখন আর বিকল্প নয়, বরং এটিই হবে দেশের জ্বালানি খাতের মূল চালিকাশক্তি। তিনি বিশেষভাবে জোর দেন ব্যাটারি স্টোরেজ সিস্টেমের (বিইএসএস) ওপর, যাতে দিনের বাড়তি বিদ্যুৎ রাতেও ব্যবহার করা যায় এবং গ্রিড স্থিতিশীল থাকে।