পিবিআইয়ের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
আহমেদ তোফায়েল ও তানভীর হাসান
প্রকাশ : ১৪ মে ২০২৬ ১০:২৭ এএম
আপডেট : ১৪ মে ২০২৬ ১৬:০০ পিএম
আইনি প্রতিকার পাওয়ার পরিবর্তে ভুক্তভোগী ও তার পরিবার মানসিক যন্ত্রণার এক নতুন বৃত্তে বন্দি হয়ে পড়ছেন। প্রতীকী ছবি
একটি আধুনিক ও সভ্য সমাজে যেকোনো অপরাধের বিচার হওয়া আইনি এবং নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ধর্ষণের মতো ভয়াবহ অপরাধের শিকার হওয়া নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে এই বিচারের পথটি কণ্টকাকীর্ণ। অসংখ্য ঘটনা ঘটে চললেও সামাজিক প্রতিকূলতা, আইনি দীর্ঘসূত্রতা এবং পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে ভুক্তভোগীদের একটি বিশাল অংশ থানা বা আদালতের দ্বারস্থ হন না। যারা সাহস করে মামলা করেন, তারাও পদে পদে শিকার হন হয়রানির। ফলে আইনি প্রতিকার পাওয়ার পরিবর্তে ভুক্তভোগী ও তার পরিবার মানসিক যন্ত্রণার এক নতুন বৃত্তে বন্দি হয়ে পড়ছেন। এ কারণে মামলায় অনীহা বাড়ছে ভুক্তভোগীদের। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) এক পর্যবেক্ষণে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মামলা না হওয়ার নেপথ্যে সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ। ধর্ষণের ঘটনার পর ভুক্তভোগী এবং তার পরিবার প্রথম যে সংকটে পড়ে, তা হলো তীব্র মানসিক হতাশা। লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকাকেই তারা শ্রেয় মনে করেন। সমাজ কী বলবে, এই ভীতি থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেওয়ার প্রবণতা তাদের আইনি লড়াইয়ের শক্তি কেড়ে নেয়। একদিকে পুলিশের জেরা, অন্যদিকে আইনজীবীর অবমাননাকর প্রশ্নÑ সব মিলিয়ে বিচার প্রক্রিয়াটিই যেন ভুক্তভোগীর জন্য দ্বিতীয়বার লাঞ্ছনার নামান্তর হয়ে দাঁড়ায়।
সমাজের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি এখানে বড় একটি নেতিবাচক ভূমিকা পালন করে। সহমর্মিতার বদলে অনেক ক্ষেত্রেই সামাজিক ধিক্কারের শিকার হতে হয় ভুক্তভোগী পরিবারকে। প্রচার মাধ্যমের মাত্রাতিরিক্ত কৌতূহল এবং প্রচলিত বিচারব্যবস্থার ওপর অনাস্থাও মামলা না করার অন্যতম কারণ । ভুক্তভোগীরা মনে করেন, মামলা করা মানে অতিরিক্ত হয়রানিকে আমন্ত্রণ জানানো, যেখানে ন্যায়বিচারের সম্ভাবনা খুব ক্ষীণ।
পিবিআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নারীবান্ধব ব্যবস্থার ঘাটতি ও পদ্ধতিগত বিড়ম্বনা থানা পর্যায়ে নারীবান্ধব পরিবেশের অভাব বিচারপ্রার্থীদের নিরুৎসাহিত করার অন্যতম প্রধান কারণ। দেশের অধিকাংশ থানায় ধর্ষণের শিকার নারীদের পুরুষ ডিউটি অফিসারের মুখোমুখি হতে হয়। একজন পুরুষ কর্মকর্তার কাছে নিজের সাথে ঘটে যাওয়া নৃশংসতার বর্ণনা দেওয়া যেকোনো নারীর জন্য চরম বিব্রতকর। যদিও নারী পুলিশের উপস্থিতির কথা বলা হয়, কিন্তু বাস্তবে এর পর্যাপ্ততা নেই।
প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বর্তমানে প্রচলিত ডাক্তারি পরীক্ষায় আপত্তিকর স্থানের ছবি তোলা এবং পরীক্ষার প্রক্রিয়াটি ভুক্তভোগীর জন্য মোটেও নারীবান্ধব নয়। এই বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়াতে অনেক পরিবার আইনি লড়াই থেকে পিছিয়ে যায়। পাশাপাশি ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি) বা জাতীয় হেল্পলাইন ১০৯ সম্পর্কে যথাযথ সচেতনতা না থাকায় অনেক সময় প্রাথমিক আইনি সহায়তা পাওয়া সম্ভব হয় না। প্রভাবশালী আসামিদের পক্ষ থেকে আসা লাগাতার হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ফলে অনেক পরিবার মামলা করার সাহস হারিয়ে ফেলে।
পিবিআইর পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, প্রথমত, ধর্ষণের মামলার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো আলামত। সচেতনতার অভাবে অনেক ভুক্তভোগী আলামত নষ্ট করে ফেলেন অথবা মামলা করতে দেরি করেন। জব্দ তালিকায় আলামত সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ না হওয়া বা এজাহারের তথ্যের সাথে সামঞ্জস্য না থাকা আসামিদের আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়।
দ্বিতীয়ত, সব স্থানে ডাক্তারি পরীক্ষার সুব্যবস্থা নেই। প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের অভাবে অনেক সময় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার মতো জোরালো মেডিকেল রিপোর্ট পাওয়া যায় না। কখনও কখনও ভুক্তভোগীর পরিবারও ডাক্তারি পরীক্ষার অস্বস্তিকর প্রক্রিয়ার কারণে এতে অনীহা দেখায়, যা মামলাকে দুর্বল করে দেয়। সাক্ষীর অনুপস্থিতি ও বিচারকার্যের দীর্ঘসূত্রতা ধর্ষণের মামলার অন্যতম প্রধান বাধা। অনেক সময় মামলার বাদী বা খোদ এজাহারকারীও আদালতে উপস্থিত হন না। আসামিরা অনেক ক্ষেত্রে পূর্ব পরিচিত হওয়ায় পরবর্তীতে প্রভাব বা চাপের মুখে বাদীপক্ষ মামলা চালানোর ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। এ ছাড়া আসামিদের ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দি গ্রহণের প্রক্রিয়াতেও ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৪ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত মোট ১০ বছরে দেশে ধর্ষণ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অভিযোগে মোট ৭৩ হাজার ৬৫২টি মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ধর্ষণের মামলাই (ধারা ৯-১) ৫০ হাজার ৫৮৬টি। এ ছাড়া একই সময়ে গণধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৩ হাজার ৬১১টি এবং ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ১৯ হাজার ২৩৪টি ঘটনায়। এই বিপুল সংখ্যক মামলার বিপরীতে ১ লাখ ১৭ হাজারেরও বেশি আসামিকে অভিযুক্ত করা হয়েছে এবং গ্রেপ্তার হয়েছে প্রায় ৬৭ হাজার ৩৯৭ জন। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৯ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত মামলার সংখ্যায় একটি ঊর্ধ্বগতি ছিল, তবে পরবর্তী বছরগুলোতে তা কিছুটা স্তিমিত হয়ে এসেছে।
তদন্ত সংস্থা পিবিআই-এর ৪৭টি জেলা ইউনিটের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সংস্থাটি ১ হাজার ৪৭টি জিআর মামলার তদন্ত পরিচালনা করেছে। এর মধ্যে তদন্ত শেষে ৫৭৫টি মামলায় চার্জশিট বা অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে, যেখানে আসামি ছিলেন ১ হাজার ৬ জন। অন্যদিকে, ৪১২টি মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন বা ‘ফাইনাল রিপোর্ট’ দাখিল করা হয়েছে। অর্থাৎ পিবিআইর অধীনে জিআর মামলাগুলোর মাত্র ৫৮ শতাংশ অভিযোগই প্রাথমিকভাবে সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে।
অন্যদিকে, পিবিআই একই সময়ে ১০ হাজার ৫৮১টি ‘সিআর’ বা আদালত থেকে পাঠানো মামলার তদন্ত সম্পন্ন করেছে। এই মামলাগুলোর ৫৩ শতাংশ বা ৫ হাজার ৪৭৪টি অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু ৪ হাজার ২৪৮টি মামলা তদন্তে অপ্রমাণিত হিসেবে গণ্য হয়েছে। এ ছাড়া ৬৬৭টি মামলা বাদী কর্তৃক অভিযোগ প্রত্যাহার বা অন্যান্য উপায়ে নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এই পরিসংখ্যানগুলো বলছে, ধর্ষণ মামলার একটি বড় অংশই শেষ পর্যন্ত আইনগতভাবে প্রমাণিত হয় না।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১০ বছরে ধর্ষণের কারণে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ৩২১টি। এর মধ্যে ২০২০ সালে সর্বোচ্চ ৪৬টি মৃত্যুর ঘটনা লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। ২০১৪ সালে যেখানে ধর্ষণের মামলা ছিল ৩ হাজার ৬৭৬টি, সেখানে ২০২৩ সালে তা বেড়ে ৫ হাজার ৩৮৩টিতে দাঁড়িয়েছে। তবে ২০১৯ সালে এই সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৯২৬টি। গণধর্ষণের ক্ষেত্রে দেখা যায়, গত এক দশকে প্রতিবছর গড়ে ৩০০ থেকে ৪০০টি মামলা রুজু হয়েছে।
গত এক দশকে মোট নিষ্পত্তিকৃত মামলার সংখ্যা ৭২ হাজার ৭২৪টি হলেও এখনও ৯২৮টি মামলা তদন্তের অপেক্ষায় রয়েছে। পিবিআইর তথ্যানুযায়ী, অনেক সময় বাদীর অসহযোগিতা বা সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে প্রকৃত দোষীরাও পার পেয়ে যেতে পারে, আবার নিরপরাধ ব্যক্তিও দীর্ঘ আইনি হয়রানির শিকার হতে পারে।