শুভেন্দুর কাঁটাতার
বাংলাদেশ-ভারত পতাকা। ছবি: গেটি ইমেজেস
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গেই সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া সংবাদের শিরোনামে চলে এসেছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে নতুন সরকার সীমান্তে কাঁটাতারের অসম্পূর্ণ বেড়া নির্মাণে তোড়জোড় শুরু করেছে। এ বিষেয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখছে ঢাকা। প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেছেন, বাংলাদেশ সরকার কাঁটাতারের বেড়াকে ভয় পায় না। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়; তবে সীমান্তে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। এদিকে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বিশেষজ্ঞরা সীমান্তে নজরদারির পরামর্শ দিয়েছেন।
দুজন সাবেক কূটনীতিক বলেছেন, ভারত নিজ ভূখণ্ডে আন্তর্জাতিক আইন মেনে বেড়া দিলে বাংলাদেশের চিন্তার কিছু নেই; তবে অতীতের মতো শূন্যরেখার ১৫০ গজের ভেতরে ‘অননুমোদিত’ কোনো স্থাপনা যেন দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে টানাপড়েন সৃষ্টি না করে, সে বিষয়ে সার্বক্ষণিক নজরদারি দরকার। প্রয়োজন যেকোনো ধরনের ব্যত্যয় ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবহিত করারও পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসকে বিধানসভা নির্বাচনে বিপুল ভাটে হারিয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রথম সরকার গঠন করেছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। শনিবার শুভেন্দু মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। গতকাল সোমবার তার মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠক ছিল। এ বৈঠকেই সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে (বিএসএফ) ৪৫ দিনের মধ্যে জমি বুঝিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু। টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশ মেনে রাজ্যের ৯টি জেলায় অরক্ষিত সীমান্তে এই বেড়া নির্মাণ করা হবে। ওই আদালত মমতা সরকারকে ৩১ মার্চের মধ্যে এই বেড়া নির্মাণের জন্য জমি হস্তান্তরের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের চার হাজার ৯৬ কিলোমিটার স্থলসীমান্ত রয়েছে। এনডিটিভির এক প্রতিবেদন বলছে, ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের সঙ্গে ৩ হাজার ২৩৯ কিলোমিটার বেড়া দিয়েছে নয়াদিল্লি। শুধু পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গেই বাংলাদেশের দুই হাজার ২১৬ কিলোমিটারের সীমান্ত রয়েছে। এর মধ্যে, ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরোর কলাকাতা শাখার তথ্য মতে, গত আগস্ট পর্যন্ত ৫৬৯ কিলোমিটার সীমান্তে বেড়া দেওয়া হয়নি। এখন ‘অনুপ্রবেশ ঠেকাতে’ এই অসমাপ্ত বেড়া নির্মাণে তোড়জোড় শুরু করেছে রাজ্যের নতুন সরকার।
বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট ও সাবেক কূটনীতিক এম হুমায়ুন কবির মনে করেন, নতুন এই উদ্যোগে আন্তর্জাতিক আইনের যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে কি না, তা সতর্কভাবে দেখা উচিত। তিনি গতকাল এই প্রতিবেদককে বলেন, “সীমান্তে উত্তেজনা তৈরি হলে এর নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতিতেই পড়বে। সমতা ও সম্মানের ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে হলে রাজনৈতিক উত্তেজনাকর বক্তব্যের বদলে সহযোগিতামূলক আচরণের কোনো বিকল্প নেই। প্রতিবেশী হিসেবে আমরা প্রত্যাশা করি, তাদের মধ্যে এই শুভ বুদ্ধির উদয় হবে”।
এদিকে চীনে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) সাবেক চেয়ারম্যান মুন্সি ফয়েজ আহমেদও কড়া নজরদারির তাগিদ দিয়েছেন। তিনি গতকাল এই প্রতিবেদককে বলেন, “আমাদের নজরদারি বাড়াতে হবে। আন্তর্জাতিক আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটলে প্রথমেই ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকে অবহিত করতে হবে। প্রয়োজনে বিষয়টি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনেও তুলে ধরতে হবে। তবে আমরা যে সহজে ছাড় দেব না, আমাদের সেই শক্ত অবস্থানটি বজায় রাখতে হবে”।
অন্যদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেছেন, “সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছ থেকে মাঠপর্যায়ের বিস্তারিত তথ্য পাওয়ার পরই এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হবে”।
সীমোন্তে বেড়া নির্মাণে শুভেন্দুর পদক্ষেপ ঘোষণার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, “বাংলাদেশ সরকার কাঁটাতারের বেড়াকে ভয় পায় না”।
অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গতকাল সচিবালয়ে লবণচাষিদের জীবনমান উন্নয়ন সংক্রান্ত এক সভা শেষে সাংবাদিকদের বলেন, “সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন হয়েছে। সেখানে রাজনৈতিক দলের পরিবর্তন হয়েছে। নতুন একটি রাজনৈতিক সরকার গঠিত হয়েছে সেখানে। ভারতের কোনো অঙ্গরাজ্যে সরকার পরিবর্তন বা অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত (যেমন কাঁটাতার নির্মাণ) তাদের নিজস্ব বিষয়”।
মন্ত্রী স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখে। কোনো নির্দিষ্ট অঙ্গরাজ্যের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি বা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলে না।
১৯৭২ সালের ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী চুক্তির আলোকে ১৯৭৫ সালে প্রণীত সীমান্ত নীতিমালা অনুযায়ী শূন্যরেখার ১৫০ গজের ভেতরে কোনো দেশই প্রতিরক্ষামূলক স্থাপনা বা বেড়া নির্মাণ করতে পারবে না। এই সীমানার ভেতর কোনো উন্নয়নমূলক কাজ করতে হলেও উভয় পক্ষের সম্মতি প্রয়োজন। কিন্তু অতীতে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়াকে কেন্দ্র করেই দুই দেশের মধ্যে একাধিকবার উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। যেমন চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিনোদপুর, নওগাঁর ধামইরহাট, লালমনিরহাটের দহগ্রাম ও মহেশপুরের মাটিলা সীমান্তের শূন্যরেখায় বিএসএফের অননুমোদিত বেড়া নির্মাণকে কেন্দ্র করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সঙ্গে উত্তেজনা দেখা দেয়। সে সময় অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলমও আন্তর্জাতিক নিয়মের বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন। এখন পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকারের উদ্যোগে তাই সতর্ক প্রতিক্রিয়া জানাল কূটনৈতিক মহল।
‘ডরাই না কাঁটাতার’
প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেছেন, “কাঁটাতার দিয়ে বাংলাদেশের মতো দেশকে এখন ডর দেখানোর কোনো জায়গা নেই। বাংলাদেশের মানুষ কাঁটাতার ভয় পায় না। সরকারও কাঁটাতার ভয় পায় না। যেখানে আমাদের কথা বলা দরকার, আমরা কথা বলব”। পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বাংলাদেশ লাগোয়া সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া স্থাপনের সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে এ প্রতিক্রিয়া জানান তিনি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সোমবার সাংবাদিকদের হুমায়ুন কবির বলেন, “কিছু চ্যালেঞ্জের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চাইলে দুদেশের নেতৃত্বের অবশ্যই ইতিবাচক মনোভাব দরকার। অবশ্যই দুদেশের সম্পর্কে চ্যালেঞ্জ রয়েছে, কিছু রয়েছে কঠিন। তবে যতক্ষণ আলোচনার দরজা খোলা রয়েছে, ততক্ষণ তা সমাধানের সুযোগ রয়েছে। কিছু ইস্যু রয়েছে তা দ্রুত সমাধান হতে পারে, আর কিছু ইস্যু সময় লাগতে পারে”।
তিনি আরও বলেন, “পশ্চিমবঙ্গে যে সরকার গঠন হয়েছে, তারা নির্বাচনের আগে উগ্র ও অশোভনীয় ভাষায় বক্তৃতা করেছে। অনেক সময় নির্বাচনে জয়ের জন্য এ ধরনের ভাষা ব্যবহার করা হয়। তবে একটি সরকার পরিচালনা করা ভিন্ন বিষয়। দেখি, তাদের একটু সময় দিই, নির্বাচনের বক্তৃতা ও সরকার পরিচালনা একই ধরনের হয় কি না। বাংলাদেশের সম্পর্ক ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে। তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ঢাকা হস্তক্ষেপ করবে না”।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, “প্রতিবেশী দেশগুলোকে অবশ্যই আঞ্চলিক শান্তি বজায় রাখতে হবে। আমরা আন্তরিক পরিবেশে থাকতে চাই। সম্পর্কে চ্যালেঞ্জ অবশ্যই থাকবে। দেড় হাজার মানুষকে হত্যা করে পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনা এখন ভারতে। মনে রাখতে হবে ভারতে থেকে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল না করাই ভালো। তাকে (শেখ হাসিনা) যাতে সে সুযোগ না দেওয়া হয়। আশা করি এবং ভারতের সরকার আশ্বস্ত করেছে, শেখ হাসিনাকে এ সুযোগ তারা দেবে না”।
তিস্তায় ভারত ও চীন নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান জানতে চাইলে হুমায়ুন কবির বলেন, “ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গঠন করেছে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার সব সময় বলে আসত পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের কারণে তিস্তা পানিচুক্তি সই করা যায়নি। এখন তৃণমূল কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় নেই। আর কেন্দ্রে ও রাজ্যে বিজেপি সরকার। আমরা আশা করছি, এখন এ বিষয়ে আলোচনা এগিয়ে নিতে কম প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হওয়ার কথা”।