জাতীয় সংসদের অধিবেশন। ছবি: ইউএনবি
জাতীয় সংসদের আসন্ন বাজেট অধিবেশনেই গঠিত হতে যাচ্ছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো। সংসদের কয়েকটি ওভারসাইট কমিটিসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ মিলে ৫০টি সংসদীয় কমিটির মধ্যে ইতোমধ্যেই ৫টি কমিটি গঠিত হয়েছে। তবে সংসদ সদস্যদের মধ্যে অনেকেই জোর তদবির চালাচ্ছেন আলোচিত বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ পেতে।
সাধারণত সরকারের মন্ত্রিসভা থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদের গুরুত্বপূর্ণ পদে যাদের দায়িত্ব দেওয়া সম্ভব হয় না, তাদের সংসদীয় কমিটির সভাপতি করে মর্যাদা দেওয়া হয়ে থাকে। সংসদীয় কমিটির সভাপতিদের নির্বাহী ক্ষমতা নেই। তবে জাতীয় সংসদের নানা সুযোগ-সুবিধা ছাড়াও মন্ত্রণালয়ের কাজের ওপর খবরদারি করার সুযোগ রয়েছে। রাজধানী ঢাকাতে প্রতিমন্ত্রী-উপমন্ত্রীদের পতাকা ব্যবহারের অনুমোদন না থাকলেও সংসদীয় কমিটির সভাপতিদের গাড়িতে গানম্যান ও জাতীয় সংসদের পতাকা থাকে।
এ ছাড়াও সংসদীয় কমিটির সভাপতিরা জাতীয় সংসদ ভবনে একটি পূর্ণাঙ্গ অফিস সেটআপ পেয়ে থাকেন। একান্ত সচিব হিসেবে একজন প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাকে পাওয়ার পাশাপাশি ব্যক্তিগত কর্মকর্তা-কর্মচারীও পান তারা। সাচিবিক সহায়তার জন্য এই সভাপতি জাতীয় সংসদের কমপক্ষে উপ-সচিব পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা ছাড়াও প্রথম শ্রেণির কমিটি অফিসার পেয়ে থাকেন। সংসদীয় কমিটির সভাপতি যে বৈঠকে সভাপতিত্ব করে থাকেন, সে বৈঠকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সদস্য হিসেবে অংশগ্রহণ করেন এবং তার কাজের জবাবদিহি করে থাকেন। কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী সংসদীয় কমিটি প্রয়োজনে কোনো ব্যক্তিকে তলব করা ছাড়াও আওতাধীন মন্ত্রণালয়ের যেকোনো ফাইল তলব করতে পারে। এ কারণেই সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদে সিনিয়র সংসদ সদস্যদের মনোনয়ন দেওয়া হয়ে থাকে।
সংসদ সচিবালয় সূত্র জানিয়েছে, সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন সম্পন্ন এবং সংসদ সদস্যরা শপথ নেওয়ায় বর্তমান সংসদের সদস্য সংখ্যা ১৪৮ এ উন্নীত হয়েছে। দুটি আসনের বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে সংসদের বাজেট অধিবেশনেই সবগুলো সংসদীয় কমিটি গঠন করার লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনিসহ সংসদের দায়িত্বপ্রাপ্তরা। তারা একটি খসড়া তালিকা তৈরি করে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নেবেন। এর পর তালিকাটি সংসদে পাস করা হবে।
স্থায়ী কমিটিতে স্থান পেতে তদবির
একটি সূত্র জানিয়েছে, সংসদীয় কমিটির সভাপতি ছাড়াও অনেক সংসদ সদস্য তাদের কাঙ্ক্ষিত মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে স্থান পেতে তদবির করছেন। গত কয়েক দিন ধরে বেশ কয়েকজন নারী সংসদ সদস্যও কাঙ্ক্ষিত কমিটির সদস্য হওয়ার জন্য চেষ্টা চালাচ্ছেন। তবে তদবির করতে আসা সংসদ সদস্যদের জানানো হয়েছে, সংসদ নেতা প্রতিটি নাম নির্বাচন করে দেবেন। সে অনুযায়ী কমিটিগুলো গঠন করা হবে। এ ক্ষেত্রে কমিটি গঠনের কাজে দায়িত্বপ্রাপ্তদের কিছু করার নেই। তারা শুধুমাত্র দাপ্তরিক কাজ করছেন।
এদিকে নির্দেশনা অনুযায়ী সংসদীয় কমিটির সভাপতিদের একটি খসড়া তালিকা ইতোমধ্যেই তৈরি করা হয়েছে। যাতে প্রাথমিকভাবে ৪০টি নাম রয়েছে। এদের মধ্য থেকে কয়েকজনকে মন্ত্রিসভায় নেওয়ার সম্ভাবনা থাকায় বিএনপির প্রাপ্য ৩৫টি কমিটির সভাপতির জায়গায় ৪০ জনের নাম রাখা হয়েছে। এদের মধ্যে অনেকে সংসদীয় কমিটির সভাপতি হতে অনাগ্রহীও হতে পারেন, এমন ধারণা থেকেও সংসদ সদস্যদের নামের তালিকা বড় করা হয়েছে। সংসদীয় কমিটির সম্ভাব্য সভাপতির তালিকায় অনেক সাবেক মন্ত্রীর নামও রয়েছে।
সভাপতি হিসেবে যাদের নাম শোনা যাচ্ছে
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলেছে, সাবেক মন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরী, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সেলিমা রহমান, লুৎফুজ্জামান বাবর, আমান উল্লাহ আমান, জাতীয় সংসদের সাবেক হুইপ মজিবর রহমান সরওয়ার, সাবেক বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক, প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় সাবেক উপদেষ্টা বরকত উল্লাহ বুলু, প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল ওয়াদুদ ভুঁইয়ার নাম রয়েছে সম্ভাব্য সভাপতির তালিকায়।
এ ছাড়াও নাম রয়েছে মো. জাহিদুর রহমান, কাজী রফিকুল ইসলাম, গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ, মোহাম্মদ শফিকুল হক মিলন, এ কে এম সেলিম রেজা হাবিব, শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা, বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম, আলী আসগর লবি, হাফিজ ইব্রাহিম, অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন, ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো, আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী, মো. মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল, মো. ফজলুর রহমান, মঈনুল ইসলাম খান শান্ত, ডা. দেওয়ান মো. সালাউদ্দিন, এ কে এম ফজলুল হক মিলন, শফিকুর রহমান কিরণ, এম নাসের রহমান, মুশফিকুর রহমান, মনিরুল হক চৌধুরী, শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক, জয়নাল আবেদীন (ভিপি জয়নাল), মাহবুব উদ্দিন খোকন, আবুল খায়ের ভূঁইয়া, মোস্তফা কামাল পাশা, সরওয়ার জামাল নিজাম, আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ, লুতফর রহমান কাজল ও সাচিং প্রু জেরীর। সংরক্ষিত নারী আসন থেকেও কয়েকজন এমপিকে ভাবা হচ্ছে।
জামায়াত-এনসিপি জোটের প্রস্তুতি
জাতীয় সংসদের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদে আনুপাতিকহারে ১৪টি কমিটির সভাপতি পাবে জামায়াত-এনসিপি জোট। আর স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা জোট করলে একটি কমিটির সভাপতি পেতে পারেন। জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যদের মধ্যে এটিএম আজহারুল ইসলাম, শাহজাহান চৌধুরী, ওবায়দুল্লাহ সালাফী, মো. মোস্তাফিজুর রহমান, আবু কাওসার মো. নজরুল ইসলাম, মো. সাইফুল ইসলাম খান মিলন, জিএম নজরুল ইসলাম, মো. রফিকুল ইসলাম খান, মো. নাজিবুর রহমান, মাসুদ সাঈদী, মাহাবুবুর রহমান বেলাল প্রমুখের নাম সভাপতি হিসেবে আলোচিত হচ্ছে। তবে এই জোটও এখনও এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যদের মতো এনসিপিকে প্রাপ্ত সংখ্যার চেয়ে বেশি পদ দিলে আকতার হোসেন ও আবুল হাসনাতকে সংসদীয় কমিটির সভাপতি হিসেবে দেখা যেতে পারে।
স্বতন্ত্র জোট
স্বতন্ত্র জোটের সদস্যরা ঐক্যবদ্ধ হলে তারাও সংসদীয় কমিটিতে সভাপতির একটি পদ পেতে পারেন। সে ক্ষেত্রে লুৎফুর রহমান খান আজাদ অথবা ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার মধ্যে একজনকে সংসদীয় কমিটির সভাপতি হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে সংসদীয় কমিটি গঠন বিষয়ে এখনও তাদের সঙ্গে আলোচনা শুরু না হওয়ায় বলা যাচ্ছে না, তারা বিএনপি জোটকে সমর্থন জোগাবেন নাকি স্বতন্ত্র জোট থেকে একটি সভাপতির পদ নেবেন।