মাসুদুল হাসান
প্রকাশ : ১১ মে ২০২৬ ২৩:০৬ পিএম
আপডেট : ১১ মে ২০২৬ ২৩:০৯ পিএম
রাস্তায় পরিবেশ দূষণ। ফাইল ফটো
সাভারের একটি এলাকা ফুলদানি তৈরিতে রাসায়নিকের ব্যবহারের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মাহিদুল (ছদ্মনাম) গত ৫ মে এসেছেন পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) এর কার্যালয়ে। আবাসিক এলাকায় রাসায়নিকের ব্যবহারকারী অভিযুক্ত ব্যক্তিকে তিন দফা নোটিশ পাঠিয়ে পরিচালক (মনিটরিং ও এনফোর্সমেন্ট) এর কার্যালয়ে শুনানিতে উপস্থিত করা যায়নি। পরিচালক সৈয়দ ফরহাদ হোসেনের কক্ষ থেকে বের হয়ে এই প্রতিবেদককে ভুক্তভোগী নিজেই এসব কথা জানান। দপ্তর সূত্রে জানা যায় অভিযুক্তদের অনেকেই উপস্থিত হন না।
এ দপ্তরের একজন কর্মকর্তা বলেন, অভিযুক্তদের এ অনুপস্থিতি সমস্যাকে জিইয়ে রাখছে, অভিযুক্তদের অনুপস্থিতি নিয়মিত ঘটনা।
বিভিন্ন রকম পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা যায়, দেশের প্রধান শহরগুলো থেকে শুরু করে মেগাসিটি ঢাকা দূষণের থাবায় আক্রান্ত। দেশের পরিবেশ দূষণ রোধে বিদ্যমান আইনের উপযুক্ত প্রয়োগ – খুব বড় চ্যালেঞ্জ বলে অনেকে মনে করছেন। পাশাপাশি পুরোনো আইনের সংশোধন একান্ত জরুরি। পরিবেশ নিয়ে কাজ করা সকল পক্ষ মনে করেন, আইন প্রয়োগকারী সরকারি কর্তৃপক্ষের সাথে নীতি নির্ধারী পর্যায়ের সমন্বয়হীনতাকেও প্রতিবন্ধকতা মনে করছেন অনেকে।
ইটভাটার কালো ধোয়া নির্গমনে অভিযুক্ত জয়নাল আবেদীন মুন্সীগঞ্জ থেকে এসেছেন পরিবেশ অধিদপ্তরের শুনানিতে। অধিদপ্তরের আদালত কক্ষের উন্মুক্ত পরিসরে কথা হয় তার সাথে। সরকারের ইটভাটা বন্ধে যে আইন তৈরি করেছে, তা ভাটার মালিকসহ সবাইকে নিয়ে মতামত নিয়ে করা হয়নি বলে জানান তিনি। বাংলাদেশ ইটভাটা মালিক সমিতির এই সহ-সভাপতি বলেন, ভাটার মালিকদের ইটের পরিবর্তে যে ব্লক তৈরি করতে বলা হচ্ছে, এর উপকরণ অপেক্ষাকৃত কয়েকগুণ দামি। সরকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিজেও ব্লক ব্যবহার করছে না বরং ইট ব্যবহার করছে বলে তিনি জানান। তার প্রশ্ন- তাহলে এই আইন করা হলো কীসের ভিত্তিতে এবং এ আইনের বাস্তব ভিত্তি কি?
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সারাদেশে পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ অনুমোদিত লোকবল ১১৩৩ জন। ১৮ কোটি মানুষের মধ্য, এক লক্ষ ৬০ হাজার জনের জন্য একজন পরিবেশ কর্মী রয়েছেন। জেলা পর্যায়ে দপ্তরগুলোতে ১৮ জনের অনুমোদন থাকলেও কোন কোন অফিসে ৮-১০ জন এমনকি ৩ জন লোকও রয়েছে। এ কারণে বিদ্যমান আইন প্রয়োগের বিষয়টিতে শিথিলতা চলে আসে। জানা যায়, পরিবেশ সংরক্ষণ পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে, ভুক্তভোগীদের সরাসরি মামলার সুযোগের অভাব একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। পরিবেশ আদালত আইন, ২০১০ অনুযায়ী, একজন সাধারণ নাগরিক সরাসরি আদালতে মামলা করতে পারেন না। মামলা করতে হলে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শকের লিখিত রিপোর্ট বাধ্যতামূলক, যা বিচার প্রক্রিয়ায় আমলাতান্ত্রিক বাধা সৃষ্টি করে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (আইন) খালেদ হোসেইন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ভুক্তভোগীদের সরাসরি মামলা করার বিষয়ের আইনের সংশোধনের একটি প্রস্তাব অধিদপ্তরকে পাঠানো হয়েছে, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সরাসরি মামলা করতে পারবে কিংবা ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী স্থানীয় থানায় এজহার দায়ের করতে পারবে। এ দপ্তর থেকে আরও জানা যায়, খসড়া ‘পরিবেশ আদালত আইন, ২০১০ (সংশোধন ২০২৪)’ মোট ২৪ টি ধারা রয়েছে।
২০২৪ সালে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ হতে খসড়া বিল মন্ত্রিসভা-বৈঠকে উপস্থাপনের জন্য পাঠানো হয়। তার মধ্যে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১১৯৫ (সংশোধিত ২০১০) এবং পরিবেশ আদালত আইন ২০১০ মধ্যে সাংঘর্ষিক বিষয়সমূহ সংশোধন, বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১১৯৫ (সংশোধিত ২০১০) এর ১৭ ধারা অনুযায়ী মহাপরিচালকের অনুমতি ছাড়া সরাসরি সংশ্লিষ্ট আদালতে মামলা করতে পারে না- এবিষয়টি সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে। পরিবেশ আদালতের মামলা পরিচালনার জন্য আলাদা আইনজীবী নিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে মিথ্যা মামলা করলে শাস্তির বিধানের কথাও প্রস্তাবে রাখা হয়েছে।
২০১৭ সালের ২৮ মে এ মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটির সভায় পরিবেশ আইনের সাংঘর্ষিক বিষয়গুলো চিহ্নিত করে তা প্রয়োজনীয় সংশোধনের ওপর আলোচনা শুরু হয় এবং কিছু নির্দেশনাও দেওয়া হয়। এরপর একটা সাব কমিটি গঠন হয়, ২০১৮ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর পরিবেশে বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়। এর ওপর ভিত্তি করে পরিবেশ আদালতের খসড়া তৈরি করা হয়। পরের বছরের ১৩ মে এটি আবার মন্ত্রণালয় পাঠানো হয়। ২০২০ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি খসড়ার ওপর আন্ত্র:মন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়।
পরিবেশে আদালত আইন,২০১০(সংশোধনী) এর খসড়া ৬ জুন অধিদপ্তর থেকে মন্ত্রণালয় পাঠানো হয়। ২০২২ সালের ৬ ডিসেম্বর খসড়া চূড়ান্ত করার জন্য আহ্বায়ক কমিটি করা হয়। পরের বছর নভেম্বরে সংশোধিত খসড়াটি মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ১৯ মে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে বিলের খসড়া মন্ত্রিসভা-বৈঠকে উপস্থাপনের জন্য চিঠি প্রেরণ করা হয়। অধিদপ্তরের একজন উপপরিচালক পদমর্যাদার কর্মকর্তা জানান, ২০২৪ সালের ১৩ জুন খসড়া প্রস্তাবটি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মিটিংয়ে তোলা হলেও এ পর্যন্ত বিলটি আলোর মুখ দেখেনি। তিনি বলেন, ২০১৭ সালে পরিবেশ আদালত আইন,২০১০ এর সংশোধনের প্রক্রিয়া শুরু হলেও ২০২৬ পর্যন্ত এসে ঝুলে আছে এটি।
জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশ আদালতে নাগরিকদের মামলা দায়েরের সুযোগ ও পরিবেশ সংরক্ষণ আইন সংশোধনের দাবি জানিয়েছে একাধিক সংগঠন ও বিশিষ্টজনরা। তারা বলছেন, ১৭ কোটি মানুষের দেশে মাত্র দুটি পরিবেশ আদালত এবং সেই আদালতে নাগরিকদের সরাসরি মামলা করার সুযোগ না থাকায় পরিবেশ সুরক্ষা কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
পরিবেশ অধিদপ্তরের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে প্রতিদিনের বাংলাদেশেকে বলেন, প্রত্যেকটি জেলায় পরিবেশ আদালত না থাকার কারণে ক্ষতিগ্রস্তরা পরিবেশ দূষণ-সংক্রান্ত মামলা দায়ের করতে পারছেন না। এছাড়াও পরিবেশ আদালত আইনের আওতায় সাধারণ মানুষ দূষণ সৃষ্টিকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সরাসরি মামলা করতে পারেন না। তারা শুধু ক্ষতিপূরণের মামলা করতে পারেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে পরিবেশ আদালতগুলোয় বছরে গড়ে মাত্র ৮০টির মতো মামলা দায়ের করা হয়! তিনি বলেন, চারপাশে পরিবেশ দূষণ, অবক্ষয় ও বিপর্যয়ের কথা শোনা গেলেও মানুষ পরিবেশ আদালতের দ্বারস্থ হয় না। এই জটিলতার ভাঁজ খুলতে হবে।
সুপ্রিম কোর্টে পরিবেশসংক্রান্ত বিষয়ে একাধিক রিটকারী জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, পরিবেশ আইনের সঠিক প্রয়োগ নেই। তাছাড়া পরিবেশ আদালত থেকে অভিযুক্তরা সহজেই জামিন পেয়ে যায়। মামলার ধীরগতি, পর্যাপ্ত সাক্ষ্য প্রমাণের অভিযোগ প্রমাণ হয়না। পরিবেশের মামলা কার্যক্রম পরিচালনায় ভারতে গ্রীন কোর্ট করা হয়েছে উল্লেখ করে এই আইনজীবী বলেন, পরিবেশ আইনের বিচারের জন্য উচ্চ আদালতকে ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পরিবেশগত অধিকার সুরক্ষায় পরিবেশ আইন সংশোধন করে পরিবেশ আদালতে সব ধরনের মামলা করার এখতিয়ার ও সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে। তারা মনে করেন, অতিমাত্রায় দূষণরোধে পরিবেশ আইনের ‘কাগুজে বাঘ’ থেকে বাস্তব রক্ত মাংসের বাঘ রুপে ফিরতে হবে।