সাক্ষাৎকারে ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম
হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ১১ মে ২০২৬ ১২:৫৮ পিএম
আপডেট : ১১ মে ২০২৬ ১৩:০০ পিএম
ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালির ওপারে আটকা পড়া এমভি বাংলার জয়যাত্রার ক্যাপ্টেনসহ অন্যান্য নাবিক ও ক্রু। ছবি: সংগৃহীত
চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় প্রবেশ করেছিল বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের মালিকানাধীন বাণিজ্যিক জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’। পরে জাহাজটি কাতারের মেসাইয়িদ বন্দর থেকে ৩৯ হাজার টন স্টিল কয়েল নিয়ে ২৭ ফেব্রুয়ারি জেবেল আলী বন্দরে যায়। সেখানে পণ্য খালাস করার পর জাহাজটি কুয়েত বন্দরে গিয়ে সালফার লোড করে সেখান থেকে ভারতে যাওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর জাহাজটি পারস্য উপসাগরে আটকে যায়। দীর্ঘ আড়াই মাস পার হলেও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জাহাজটি হরমুজ প্রণালি পার হতে পারেনি। এতে নানা শঙ্কার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন জাহাজটিতে থাকা ৩১ জন নাবিক।
জাহাজে থাকা নাবিকরা কেমন আছেন? আটকা পড়া অবস্থায় কোন পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন তারা তা নিয়ে কথা হয় ‘বাংলার জয়যাত্রা’র ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলামের সঙ্গে। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘হরমুজ ছাড়া পারস্য উপসাগর থেকে বের হওয়ার বিকল্প কোনো পথই নেই। তাই হরমুজে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল বা তাদেরকে অনুমোদন না দেওয়া পর্যন্ত যেখানে তারা আটকা পড়েছেন। ওখান থেকে বের হতে পারবেন না।’
শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘যখন যুদ্ধ শুরু হয় তখন আমরা একটা কার্গো ডিসচার্জ করছিলাম। তখন শিডিউল ছিল আমরা মুম্বাই যাব। হরমুজ দিয়ে বের হয়ে যাব, কিন্তু আমরা বের হতে পারলাম না। এরপর কুয়েত যাওয়ার কথা ছিল, সেখানে যাইনি। পরে একটা চার্টার ছিল কাতার থেকে জেবল আলী বন্দর। কিন্তু সেটিও হয়নি। আমরা কাতার যাওয়ার আগেই কাতারে হামলা হয়। এরপর আরেকটি শিডিউল ছিল আল-রুয়াইস বন্দর থেকে কোল্লাম যাওয়া। সেটিও হলো না। পরে রুয়াইস বন্দর থেকে কেপটাউন হয়ে তিউনিসিয়া। সেটিও হলো না। পরে একটা কার্গো হলো সৌদি আরবের রাস আল খাইর বন্দর থেকে সাউথ আফ্রিকা। তখন হরমুজ খুলেছিল। আমরা রাস আল খাইর বন্দরে গিয়ে ওই কার্গোটা লোড করি। দুবার চেষ্টা করেও আমরা হরমুজ পার হতে পারিনি।’
জয়যাত্রার ক্যাপ্টেন বলেন, রাস আল খাইর বন্দরে কার্গো লোড করে এসে হরমুজ পার হতে গিয়েছি। কিন্তু সেখানে গিয়ে যখন পারমিশন চেয়েছি, তারা বলল পারমিশন ডিনাইড। তখন আমরা এসে রাস আল খাইর বন্দরের কাছাকাছি মিনাসাকাতে অবস্থান করি। ১০/১১ এপ্রিল আমরা আবার খবর পাই হরমুজ প্রণালী খুলছে। আবার হরমুজ প্রণালী পার হওয়ার জন্য যাই। তখন তারা বলে অলটার ইওর কোর্স। তখন আমরা আবার রিটার্ন চলে আসি। এরপর আমরা মিনাসাকায় অবস্থান করি। ওখানে থাকা অবস্থায় আমাদের পানি শেষ হয়ে যায়। পরে আমরা শারজা গিয়ে পানি নিয়েছি। পানি নেওয়ার পর শুনি হরমুজে আবার গোলাগুলি শুরু হয়েছে। আইআরজিসি বলেছে, রাস আল খাইর এবং মিনাসাকাতে যেসব জাহাজ আছে তারা যেন সরে যায়। তখন আমরা একটা নিরাপদ জায়গায় এসে নোঙর করেছি। বর্তমানে আমরা শারজা থেকে ২০ মাইল সিওয়ার্ড এবং হরমুজ থেকে ৭০ মাইল সাউথওয়ার্ডে অবস্থান করছি।
যুদ্ধে আটকা পড়ার পর কেমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে যে বেঁচে আছি এটাই তো আল্লাহর অনেক বড় অনুগ্রহ। জেবল আলী বন্দরে আমার জাহাজের ওপর দিয়ে গিয়ে পাশের জাহাজে মিসাইল অ্যাটাক হয়েছে। ওই আগুন ২০ ঘণ্টার মতো জ্বলছে। ছয়টা টাগ দিয়ে ওই আগুন নেভাতে পারেনি। পরে ফোম দিয়ে আগুন নেভাতে হয়েছে। প্রতি মুহূর্তে মুহূর্তে দেখছি আকাশে মিসাইল, প্রতি মুহূর্তে মুহূর্তে দেখছি ড্রোন এসে পড়ছে। প্রতি মুহূর্তে মুহূর্তে দেখছি অ্যান্টি মিসাইল উৎক্ষেপণ হচ্ছে। আমাদের থেকে সামান্য দূরে জাহাজে ড্রোন হামলা হচ্ছে। জাহাজ ডুবে যাচ্ছে। এর মধ্যে হরমুজে যে তিনবার গিয়েছি। সেখানে গেলে বুকের ভেতর এমনিতে কাঁপুনি শুরু হয়ে যায়। এরপর যখন বলা হয়, অল্টারিং কোর্স। তখন গলা শুকিয়ে যায়। তখন এক সেকেন্ড দেরি করলে মনে হয় মিসাইল মেরে দেবে।
বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের প্রশংসা করে শফিকুল ইসলাম বলেন, বিএসসি আমাদের টাকা দিতে কার্পণ্য করেনি। আমরা এক লিটার পানি ১০০ টাকা দিয়ে কিনেছি। ৫৫ নটিক্যাল মাইল জাহাজ চালিয়ে গিয়ে প্রতি টন পানি ৪২ হাজার ডলার দিয়ে কিনেছি। অনেক বড় বড় শিপিং কোম্পানিও এত টাকা খরচ করে পানি কেনেনি। এটি সম্ভব হয়েছে বিএসসির বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেকের জন্য। যুদ্ধে আটকা পড়ার পর থেকে তিনি সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি অনবোর্ড নাবিকরা যাতে অকওয়ার্ড পরিস্থিতিতে পড়তে না হয়। সেজন্য তিনি খাবার, পানি, নিরাপত্তার বিষয়গুলো সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন।
জাহাজে খাওয়ার, পানি, তেল মজুদ কেমন আছে জানতে চাইলে ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম বলেন, এগুলো নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। জাহাজে এখনও দুই মাসের খাবার আছে, দেড় মাসের পানি আছে। দুই মাসের তেল আছে। আবার চাইলে উপকূলে গিয়ে এগুলো নেওয়ার সুযোগও আছে। তাই খাবার, পানি এসব নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। এখন চিন্তার বিষয় হচ্ছে হরমুজ প্রণালী আমরা কখন পার হতে পারব।
চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় কয়েকজন নাবিক জাহাজ থেকে নেমে যেতে আবেদন করেছেন এই বিষয়ে জানতে চাইলে ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম বলেন, ১২ জন নাবিক আবেদন করেছেন। তাদের প্রায় প্রত্যেকেরই চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে। জাহাজটি যেই ৩১ জন নাবিক আছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন জাহাজে উঠেছেন গত বছরের আগস্ট মাসে। তারা নয় মাসের চুক্তিতে জাহাজে উঠেছেন। এরপর ছয় মাসের চুক্তিতে অক্টোবর মাসে উঠেছেন কয়েকজন। তাদেরও চুক্তির মেয়াদ শেষ। বাকি কয়েকজন উঠেছেন ডিসেম্বর মাসে।
শফিকুল ইসলাম বলেন, আমরা যারা জাহাজে কাজ করি, তারা জাহাজে একসঙ্গে সর্বোচ্চ এক বছর পর্যন্ত কাজ করতে পারেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ছয় মাস অথবা নয় মাসের চুক্তি হয়। অনেকে আবার চার মাসের চুক্তিতে নাবিক নিয়োগ দেন। বিশেষ করে অয়েল ট্যাংকারের ক্ষেত্রে চার মাসের চুক্তিই বেশি হয়। কারণ এর চেয়ে বেশি সময় একজন নাবিক জাহাজে কর্মরত থাকলে তার কর্মক্ষমতা হ্রাস পায়। অ্যান্টিবডি কমে যায়। স্থলে তো একজন ব্যক্তি সপ্তাহে ৫ দিন অফিস করে দুদিন ছুটি পান। কিন্তু জাহাজের ক্ষেত্রে সেটি সম্ভব না। আর এখন আমরা ওয়ার ট্র্যাজেডির মধ্যে আছি। তাই জাহাজে থাকা প্রত্যেক নাবিকের মানসিক অবস্থা দুর্বল। এমভি আব্দুল্লাহ, জাহান মনির ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি কিডনাপিং পরিস্থিতিতে ছাড়া পাওয়ার পর জাহাজের নাবিকদের পুরো সেট তারা চেঞ্জ করে দিয়েছেন।