× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পুলিশ পদক নিয়ে বারবার বিতর্ক

কবির হোসেন

প্রকাশ : ১১ মে ২০২৬ ০৯:১৯ এএম

আপডেট : ১১ মে ২০২৬ ০৯:২১ এএম

প্রতিবছরই পুলিশ পদক নিয়ে বিতর্ক দেখা দিচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবছরই পুলিশ পদক নিয়ে বিতর্ক দেখা দিচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবছরই বিতর্ক দেখা দিচ্ছে পুলিশ পদক নিয়ে। এ যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। বিতর্ক দেখা দিলেও বিগত সরকারের শাসনামলে তা উপেক্ষা করেই প্রদান করা হয়েছে পুলিশ পদক। কিন্তু বর্তমান সরকার তার যাত্রা শুরুর প্রথম বছরই এই পদক নিয়ে বিতর্ক দেখা দেওয়ায় পুলিশ সপ্তাহ শুরুর আগের দিন শনিবার পদক প্রদান স্থগিত করা হয়। নতুন করে যাচাই-বাছাইয়ের পর সুবিধাজনক সময়ে নাম ঘোষণার পর যোগ্যদের হাতে তুলে দেওয়া হবে এ পদক।

অভিযোগ রয়েছে, পদক নিয়ে অসন্তুষ্টির কারণে গত শনিবার রাতে পুলিশ সদর দপ্তরে বাগ্‌বিতণ্ডতায় জড়িয়ে পড়েন কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। ঘটনাটি সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায়ে জানাজানি হলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় পদক প্রদান স্থগিত করার। 

উল্লেখ্য, এর আগে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও পুলিশ পদক নিয়ে বিতর্কে শেষ মুহূর্তে একজনের পদক স্থগিত করা হয়। এছাড়া সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পুলিশ পদক প্রদানের জন্য নির্বাচিত ৪০ কর্মকর্তার পদক বাতিল করে অন্তর্বর্তী সরকার। এবারও একই বিষয়ে বিতর্ক ওঠার পর পদক প্রদানে কঠোর নীতিমালা গঠনের দাবি জানিয়েছেন মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা।

অভিযোগ রয়েছে, ২০১৮ সাল ও ২০২৪-এর ভোট ডাকাতির নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় ঢালাওভাবে পুলিশ পদক দেওয়া হয়। এর মধ্যে ২০২৪ সালেই ৪০০ জনের বেশি পুলিশ সদস্যকে পদক দেওয়া হয়। তারা সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারকে রাতের ভোটে সহযোগিতার পাশাপাশি ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রেও সহযোগী ছিলেন। পুলিশের এই কর্মকর্তারা বর্তমানে পালিয়ে আছেন। পলাতক পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ, উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) সৈয়দ নুরুল ইসলাম, অতিরিক্ত ডিআইজি বিপ্লব কুমার সরকারসহ বিভিন্ন পদমর্যাদার ৪০ জন কর্মকর্তার বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম) ও রাষ্ট্রপতি পুলিশ (পিপিএম) পদক প্রত্যাহার করা হয়েছে।

সম্প্রতি বিএনপি সরকার গঠনের ৩ মাসের মাথায় ফের পুলিশ পদক নিয়ে বিতর্ক দেখা দিল। ‘পুলিশ সপ্তাহ’ শুরু হওয়ার আগের রাতে গত শনিবার ২০২৬ সালের পদক তালিকায় বিতর্কিত ও ‘ফ্যাসিস্ট আমলের’ ১১ কর্মকর্তার নাম থাকায় শেষ মুহূর্তে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার মুখে এই পদক প্রদান অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে পদক প্রদান স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। 

অভিযোগ উঠেছে, পুলিশের একটি অংশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গিয়ে পদক তালিকা নিয়ে তদবির করেছে। তবে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে পদক তালিকা, পদক কমিটি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে একাধিক ভিন্ন বক্তব্য সামনে আসার পর। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাঠানো তালিকায় অস্বচ্ছতা এবং বিতর্কিত পুলিশ সদস্যদের নাম থাকায় পদক প্রদান কার্যক্রম স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে স্থগিত করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, গত ১৮ বছরে পুলিশ বাহিনীর প্রধান থেকে শুরু করে শীর্ষ কর্মকর্তারা পদক নিয়ে আসছেন; যা নিয়ে বাহিনীর মধ্যেও ক্ষোভ রয়েছে। এ বছর পদকের জন্য মনোনীত ১০৯ জনের মধ্যে ১১ জনই আওয়ামী লীগের শাসনামলে পদক পেয়েছেন। এদের মধ্যে একজন বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে দুবার পদক পেয়েছেন। জঙ্গি দমনে সফলতার স্বীকৃতি হিসেবে পদক পাওয়া একজনও আছেন এবারের পদকপ্রাপ্তির তালিকায়। প্রভাবশালী এক অতিরিক্ত আইজিপির ‘ভাগনে কোটায়’ পদক পাচ্ছেন তিনি।

অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক বিবেচনায় ও প্রভাবশালী বলয়ে থাকায় পদক পাচ্ছেন বেশ কয়েকজন। গত সংসদ নির্বাচনের আগ মুহূর্তে জামায়াতে ইসলামীর আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট ‘হ্যাক’কাণ্ডে বিতর্কিত ভূমিকা রেখেছিলেনÑ এমন এক ডিআইজিকেও পদক দেওয়া হচ্ছে। যাকে নিয়ে পদক কমিটির বৈঠকেও তীব্র মতভেদ তৈরি হয় বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে। স্বভাবতই পদকের দাবিদার যোগ্য ও দক্ষ অনেক কর্মকর্তা এবারও বঞ্চিত হয়েছেন।

পুলিশে সাহসিকতা, কর্মদক্ষতা এবং সেবামূলক কাজের স্বীকৃতি হিসেবে সাধারণত ‘পুলিশ পদক’ দেওয়া হয়। কাজের স্বীকৃতি ও কর্মস্পৃহা বাড়াতেই এই পদক দেওয়া হয়। প্রতিবছর পুলিশ সপ্তাহের বার্ষিক পুলিশ প্যারেডে প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের এ পদক পরিয়ে দেন। যারা পদকে ভূষিত হন, তাদের নামের শেষে বিপিএম অথবা পিপিএম উপাধি যুক্ত হয়। যারা একাধিকবার এই পদকে ভূষিত হন, তাদের নামের শেষে বিপিএম (বার) কিংবা পিপিএম (বার) উপাধি যুক্ত হয়। পদকে ভূষিত কর্মকর্তারা প্রতি মাসে ভাতা হিসেবে ৩ হাজার টাকা এবং বীরত্বের জন্য ৬ হাজার টাকা পান। অভিযোগ রয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পুলিশ পদকের মূল মানদণ্ড হয়ে উঠেছিল ‘দলীয় আনুগত্য’। ফলে অনেক যোগ্য চৌকস ও পেশাদার কর্মকর্তা পদক থেকে বঞ্চিত হয়েছেন এবং অপূর্ণতা নিয়েই অবসরে চলে গেছেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশ বাহিনীর নেতৃত্বে আমূল পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু পুলিশ পদকের সেই পুরনো বিতর্ক যেন পিছু ছাড়ছে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানাচ্ছে, পদকের জন্য এবার যে তালিকা চূড়ান্ত হয়েছে, তাতে একদিকে এই বিতর্কিত ১১ জন কর্মকর্তার নাম যুক্ত হয়েছে, অন্যদিকে ঝুঁকি নিয়ে রাত-দিন ২৪ ঘণ্টা মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী নিচের স্তরের সদস্যদের কাজের মূল্যায়নই করা হয়নি। তবে সরকার পুলিশ পদক নিয়ে এবার আওয়ামী লীগ সরকারের মতো বিতর্কিত কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চাইছে না বলে জানা গেছে। 

এ প্রসঙ্গে পুলিশের সাবেক আইজি আব্দুল কাইয়ুম বলেন, ‘আওয়ামী লীগের শাসনামলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে কাজকর্ম না করেই অনেকে পদক পেয়েছেন। কিন্তু ভালো ভূমিকা রেখেও অনেকে তা পাননি। অথচ পদকটি সঠিক ব্যক্তির কাছেই যাওয়া উচিত। আমি মনে করি, বর্তমান সময়ে পলিটিক্যাল (রাজনৈতিক) বিবেচনায় পদক দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’ 

এ প্রসঙ্গে পদক প্রদান কমিটির সভাপতি অতিরিক্ত আইজিপি (অপরাধ ও অপস) খন্দকার রফিকুল ই বলেন, ‘বিতর্ক যে কেউ যে কাউকে নিয়ে হতে পারে, বিতর্কের ঊর্ধ্বে কেউ নন। তবে আমরা সর্বোচ্চ নিরপেক্ষতা বজায় রাখার চেষ্টা করেছি। যারা আগের আমলে পদকবঞ্চিত হয়েছেন, তাদের আমরা অগ্রাধিকার দিয়েছি। তবে একেবারেই গতানুগতিক কিছু সদস্য আছেন, যারা তাদের সাব-ইন্সপেক্টররা (এসআই) যে কৃতিত্ব দাবি করছেন, সেটাকেই সিনিয়র কর্মকর্তা হিসেবে নিজের দাবি করে তার ওপর পদক প্রত্যাশা করছেন। কিন্তু একেবারেই পারফরম্যান্স যার নেই, তাকে আগের আমলে বঞ্চিত হওয়ার ভিত্তিতে তো পদক দিতে পারি না।’

এদিকে পুলিশ পদক অনুষ্ঠান স্থগিত রেখেই গতকাল রবিবার থেকে ‘আমার পুলিশ, আমার দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্য নিয়ে শুরু হয়েছে পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬।

মাঠপর্যায়ে ক্ষোভ ও হতাশা : অভিযোগ রয়েছে, মাঠপর্যায়ে যারা বছরজুড়ে ভালো কাজ করেছেন, তাদের অনেকেই পদকপ্রাপ্তদের তালিকায় নেই। এতে মাঠপর্যায়ের পুলিশের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে। মাঠপর্যায়ের একাধিক সদস্য অভিযোগ করেছেন, পদকপ্রাপ্তদের অনেকে আগেও কয়েকবার পদক পেয়েছেন। অথচ অনেকের ভাগ্যে একবারও পদক জোটেনি। তালিকায় এমন কর্মকর্তার নামও আছে, যার উল্লেখযোগ্য কোনো সাফল্য নেই। সরকারি দলের কিছু নেতা তাদের পছন্দের পুলিশ কর্মকর্তার জন্য পদকের সুপারিশ করেছিলেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়াও পুলিশের কর্তাব্যক্তিদের আস্থাভাজনদের নামও আছে তালিকায়।

পুলিশ সদর দপ্তরের বক্তব্য

পুলিশের সদর দপ্তর জানিয়েছে, সম্প্রতি পুলিশ পদকের প্রজ্ঞাপন জারি সংক্রান্ত বিষয়ে বাংলাদেশ পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে ‘রাষ্ট্রপতি বিদেশ যাওয়ায় পুলিশ পদকের জিও করা সম্ভব হয়নি’ মর্মে কয়েকটি গণমাধ্যমে যে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে তা সঠিক নয়। বাংলাদেশ পুলিশের কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এ ধরনের বক্তব্য দেননি। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে প্রকাশিত বক্তব্য ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর। প্রকৃতপক্ষে পুলিশ পদকের প্রজ্ঞাপন জারি-সংক্রান্ত বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও প্রক্রিয়াগত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এ সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা প্রজ্ঞাপন জারির পূর্বে কোনো কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে এ ধরনের অনুমাননির্ভর সংবাদ প্রচার ও প্রকাশ জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে যথাযথ তথ্য যাচাই করে সংবাদ প্রকাশের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

বিশেষজ্ঞ অভিমত

এ প্রসঙ্গে অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘পুলিশের কাজের মর্যাদা দেওয়া হয় পদকের মাধ্যমে। এ প্রক্রিয়াতে যদি যথাযথভাবে নীতি-নৈতিকতা চাকরির বিধান বা স্বচ্ছতার সঙ্গে পদক প্রদান করা হতো, তাহলে পদক নিয়ে কোনো প্রশ্ন উঠত নাÑ পদকের সংখ্যা যতই হোক না কেন। বিগত সময়ে কাজের অবদানের চেয়ে বেশি ছিল রাজনৈতিক বিবেচনা। ফলে এ নিয়ে সমালোচনা সৃষ্টি হয়। কিন্তু সরকার পরিবর্তন হওয়া একজন পুলিশ কর্মকর্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় না। কারণ তিনি কাজ করছেন রাষ্ট্র ও জনগণের জন্য। তাই পদক স্থগিতের বিষয়টিকে আমরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছি এই অর্থে, সংশোধিত যে পদক তালিকা আসবে, সেটা যেন যথাযথ হয়। সাধারণ মানুষ এবং রাষ্ট্র যেন মনে করে তার পদক পাওয়া প্রয়োজন ছিল।’

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা