তানভীর হাসান
প্রকাশ : ১০ মে ২০২৬ ১৪:৫৮ পিএম
আপডেট : ১০ মে ২০২৬ ১৫:০১ পিএম
পুলিশের লোগো। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
পুলিশ পদক নিয়ে এবার সৃষ্টি হয়েছে নজিরবিহীন বিতর্ক। পদক তালিকায় বিতর্কিত ও ‘ফ্যাসিস্ট আমলের’ ১১ কর্মকর্তার নাম ওঠায় শেষ মুহূর্তে স্থগিত করা হয়েছে এবারের পুলিশ সপ্তাহের পদক প্রদান অনুষ্ঠান। নিয়ম অনুযায়ী প্রতি বছর পদকপ্রাপ্তদের সরকারি আদেশ জারির পর গেজেট প্রকাশ করা হয়। কিন্তু গতকাল রাত পর্যন্ত সেই গেজেট প্রকাশ না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত বাদ দেওয়া হয় পদক প্রদানের পুরো কর্মসূচি। এ ঘটনায় গতকাল রাত থেকেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ সদর দপ্তর ও প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে শুরু হয় অস্থিরতা।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে পদক প্রদান স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অভিযোগ উঠেছে, পুলিশের একটি অংশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গিয়ে পদক তালিকা নিয়ে তদবির করেছে। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন পদক তালিকা, পদক কমিটি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে একাধিক ভিন্ন বক্তব্য সামনে আসে।
পদক তালিকায় নাম থাকা এক কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘তিনি পদক গ্রহণের জন্য কার্ডও পেয়েছিলেন। কিন্তু গতকাল (শনিবার) রাত ১০টার দিকে হঠাৎ ফোন করে তাকে জানানো হয়, অনুষ্ঠানে যেতে হবে না।’ পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) একজন পুলিশ সুপার পদমর্যাদার কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘টানাপড়েন ও বিতর্কের কারণেই প্রধানমন্ত্রী নিজে পদক প্রদান স্থগিত করেছেন।’
একটি সূত্রের দাবি, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকিরও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গিয়ে পদক তালিকায় নিজের নাম না থাকা নিয়ে আলোচনা করেছেন। বিষয়টি নিয়েও প্রশাসনিক মহলে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো পদক তালিকা বিশ্লেষণে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। তালিকাভুক্ত ১০৯ জন কর্মকর্তা ও সদস্যের মধ্যে অন্তত ১১ জন কর্মকর্তা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও পদকপ্রাপ্ত ছিলেন। বিষয়টি সামনে আসতেই প্রশাসনের ভেতর-বাইরে শুরু হয় তীব্র সমালোচনা, যা শেষ পর্যন্ত পদক প্রদান স্থগিতের সিদ্ধান্তে গড়ায়।
তালিকায় থাকা ১১ জন কর্মকর্তার মধ্যে রয়েছেন, বিপিএম-সেবা পদকপ্রাপ্ত ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার, পিপিএম-সেবা ও বিপিএম-সেবা পদকপ্রাপ্ত ডিএমপির ডিবিপ্রধান মো. শফিকুল ইসলাম, পিপিএম পদকপ্রাপ্ত সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী, পিপিএম পদকপ্রাপ্ত ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (এস্টেট, ডেভেলপমেন্ট ও আইসিটি) মোহাম্মদ ওসমান গণি, পিপিএম পদকপ্রাপ্ত র্যাব-১২-এর অ্যাডিশনাল ডিআইজি মো. আতিকুর রহমান মিয়া, পিপিএম-সেবা পদকপ্রাপ্ত ডিএমপির উপপুলিশ কমিশনার মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন হাছান, পিপিএম-সেবা পদকপ্রাপ্ত পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এলআইসি) মো. আতিকুজ্জামান, বিপিএম পদকপ্রাপ্ত ডিএমপির গোয়েন্দা-গুলশান বিভাগের পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) মো. জেহাদ হোসেন, বিপিএম পদকপ্রাপ্ত ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের এসআই গোলাম মূর্তজা, বিপিএম-সেবা পদকপ্রাপ্ত নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা মডেল থানার এসআই মো. রফিক এবং পিপিএম পদকপ্রাপ্ত ডিএমপির রমনা বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার কার্যালয়ের কনস্টেবল মো. রিমন হোসেন।
সূত্র বলছে, বিগত সরকারের সময় ‘গুডবুকে থাকা’ এসব কর্মকর্তাকে বিভিন্ন কাজের স্বীকৃতি হিসেবে আগেও পদক দেওয়া হয়েছিল। এমনকি তালিকাভুক্তদের একজনের আগে দুবার পদক পাওয়ার নজিরও রয়েছে।
সূত্রের দাবি, পুলিশ পদক সাধারণত সাহসিকতা, কর্মদক্ষতা ও সেবার স্বীকৃতি হিসেবে দেওয়া হলেও বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এর মূল মানদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছিল ‘দলীয় আনুগত্য’। ফলে অনেক যোগ্য কর্মকর্তা বছরের পর বছর পদক থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। কেউ কেউ পদক ছাড়াই অবসরে গেছেন।
সাবেক পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ওই সময়ের পদক প্রক্রিয়া ছিল নজিরবিহীনভাবে বিতর্কিত। এখনও যদি সেই ধারা বহাল থাকে, তবে তা পুরো পুলিশ বাহিনীর জন্যই ক্ষতিকর হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, পদক স্থগিত হওয়া পুরো বাহিনীর জন্যই ‘অসম্মানের’। তাদের অভিযোগ, পদক কমিটির নেতৃত্বে এমন একজন কর্মকর্তাকে রাখা হয়েছে, যার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে। এতে পুরো বাহিনী বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে সরকারের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।