বিশ্ব মা দিবস আজ
হাসনাত শাহীন
প্রকাশ : ১০ মে ২০২৬ ০৮:৪৪ এএম
আপডেট : ১০ মে ২০২৬ ১১:১৫ এএম
জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষের সবশেষ আশ্রয়স্থল মা নামের মমতাময়ী নারীর আঁচল। অলংকরণ: জয়ন্ত সরকার
‘মা কথাটি ছোট্ট অতি,/ কিন্তু জেনো ভাই,/ ইহার চেয়ে নামটি মধুর/ তিন ভূবনে নাই।…’Ñকবি কাজী কাদের নেওয়াজের ‘মা’ কবিতা শুধু নয়, বাস্তব জীবনও সাক্ষ্য দেয়Ñ সন্তানের কাছে ত্রিভূবনে মায়ের মতো আর কেউ নেই। ‘মা’ পৃথিবীর সবচেয়ে মধুরতম শব্দ। ছোট্ট এ শব্দের অতলে লুকানো থাকে গভীর নির্ভরতা, ভালোবাসা ও মমতার আকুল প্রত্যাশা আর পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ স্থানে থাকার বিশ্বাস। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষের সবশেষ আশ্রয়স্থল মা নামের মমতাময়ী নারীর আঁচল। তাকে সামনে রেখে প্রতি বছর মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার পালন করা হয় ‘বিশ্ব মা দিবস’। আজ সেই রবিবার।
বিশ্ব মা দিবসের সূত্রপাত ১৯০৮ সালের ৮ মে। দিনটি মাতৃত্ব ও মাতৃসত্তার গুরুত্ব এবং তাৎপর্য স্মরণ করিয়ে দেয়। যদিও কারও কারও মতে, মাকে ভালোবাসার জন্য বিশেষ কোনো দিবসের প্রয়োজন নেই। কারণ প্রতিটি দিনই মাকে ভালোবাসার দিন। তবে এও আবার অস্বীকার করার উপায় নেই যে, প্রতিদিনের ভালোবাসাকে বিশেষভাবে মনে করতে একটি দিন নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ।
সংসারে মা থাকুন আর না থাকুন, সন্তানের সঙ্গে তিনি সব সময়ই থাকেনÑ এমন অনুভূতিতে আবেগান্বিত কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার কবিতায় লিখেছেন, ‘মাকে আমার পড়ে না মনে।/শুধু কখন খেলতে গিয়ে/ হঠাৎ অকারণে/ একটা কী সুর গুনগুনিয়ে/ কানে আমার বাজে,/ মায়ের কথা মিলায় যেন/ আমার খেলার মাঝে।/ মা বুঝি গান গাইত, আমার/ দোলনা ঠেলে ঠেলে;/ মা গিয়েছে, যেতে যেতে/ গানটি গেছে ফেলে।’ মাকে নিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন, ‘হেরিলে মায়ের মুখ/ দূরে যায় সব দুখ,/ মায়ের কোলেতে শুয়ে জুড়ায় পরান,/ মায়ের শীতল কোলে/ সকল যাতনা ভোলে/ কত না সোহাগে মাতা বুকটি ভরান।’
ধারণা করা হয়, মা দিবসের সূচনা প্রাচীন গ্রিসের মাতৃরূপী দেবী সিবেলের এবং প্রাচীন রোমান দেবী জুনোর আরাধনা থেকে। এ ছাড়া ইউরোপ ও যুক্তরাজ্য অনেক আগে থেকেই মা ও মাতৃত্বকে সম্মান জানানোর জন্য একটি নির্দিষ্ট রবিবারকে বেছে নিয়েছিল। ষোড়শ শতকে এটি ইংল্যান্ডে ‘মাদারিং সানডে’ বলে পরিচিতি পায়। তবে অনেক ইতিহাসবিদের মতে, গত শতাব্দীর শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ার স্কুলশিক্ষিকা অ্যানা জারভিস সেখানকার পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা দেখে মর্মাহত হয়ে মায়ের জন্য বিশেষ দিন পালনের মাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টি করার কথা ভাবেন। তবে তা বাস্তবায়নের আগেই ১৯০৫ সালের ৯ মে তার মৃত্যু ঘটে।
আনা জারভিসের মেয়ে ‘আনা মারিয়া রিভস জারভিস’ মায়ের কাজকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য তার সান ডে স্কুলে প্রথম এদিনটি মাতৃদিবস হিসেবে পালন করেন। ১৯০৭ সালের এক রবিবার আনা মারিয়া স্কুলের বক্তব্যে মায়ের জন্য একটি দিবসের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেন। এরপর ১৯১২ সালে এই দিবসটিকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য ব্যাপক প্রচার শুরু হয়। পরে ১৯১৪ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারকে মা দিবস ও জাতীয় ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করেন। এভাবেই বর্তমানে প্রচলিত বিশ্ব মা দিবসের সূচনা হয়। আজ সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও নানা আয়োজনে মাকে বিশেষভাবে ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধা জানাবে সন্তানরা। সামাজিক মাধ্যমগুলো ভরে উঠবে মায়ের সঙ্গে সন্তানদের ছবি ও স্মৃতিলেখায়। অনেকেই ফুল নিয়ে দেখা করবেন, অন্তরঙ্গ সময় কাটাবেন মায়ের সঙ্গে।
‘মা’ শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘মম’। মজার ব্যাপার হলোÑ পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই ‘মা’ অর্থে ব্যবহৃত শব্দগুলোর উচ্চারণ প্রায় কাছাকাছি; সবগুলো শব্দের শুরুতেই ব্যবহৃত হয়েছে ‘এম’ অথবা ‘ম’ বর্ণটি। যেমনÑ জার্মান ভাষায় ‘মাট্টার’, ওলন্দাজ ভাষায় ‘ময়েদার’, ইতালিয়ান ভাষায় ‘মাদর’, চীনা ভাষায় ‘মামা’, হিন্দি ভাষায় ‘মা’, প্রাচীন মিসরীয় ভাষায় ‘মাত’, সোয়াহিলি ভাষায় ‘মামা’ এবং আফ্রিকান ও বাংলা ভাষায় ‘মা’।