দেশে চিকিৎসা ব্যয় মানুষের জীবনে ক্রমেই বড় বোঝা হয়ে উঠছে। দরিদ্র পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে এই ব্যয় অনেক বেশি। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
দেশে চিকিৎসা ব্যয় মানুষের জীবনে ক্রমেই বড় বোঝা হয়ে উঠছে। স্বাস্থ্যসেবায় নানা উন্নয়ন ও সাফল্যের কথা বলা হলেও বাস্তবে চিকিৎসা নিতে গিয়ে বিপুল অর্থ ব্যয়ের চাপ সামলাতে পারছে না সাধারণ মানুষ।
গবেষণা বলছে, দেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭৯ শতাংশই মানুষকে নিজের পকেট থেকে দিতে হচ্ছে। ফলে চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে অনেক পরিবার সঞ্চয় হারাচ্ছে, ঋণগ্রস্ত হচ্ছে এমনকি নতুন করে দারিদ্র্যের জাঁতাকলে পড়ছে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণায় দেখা গেছে, একটি পরিবারকে গড়ে প্রতি মাসে ৩ হাজার ৪৫৪ টাকা স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করতে হয়। এটি তাদের মোট ব্যয়ের প্রায় ১০ শতাংশ।
তবে দরিদ্র পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে এই ব্যয় অনেক বেশি। তাদের আয়ের প্রায় ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত চলে যাচ্ছে চিকিৎসায়।
এ কারণে প্রায় ১৮ শতাংশ পরিবার বিপর্যয়কর স্বাস্থ্য ব্যয়ের মুখে পড়ছে। একই সঙ্গে বছরে প্রায় ৬১ লাখ মানুষ চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে।
গত বুধবার ঢাকার আগারগাঁওয়ে বিআইডিএস সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে ‘বাংলাদেশে অপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা চাহিদা ও ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ব্যয়ের পরিবর্তিত বাস্তবতা পুনর্বিবেচনা’ শীর্ষক এই গবেষণা উপস্থাপন করা হয়।
গবেষণাটি ২০২২ সালের খানা আয় ও ব্যয় জরিপের তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়েছে, যেখানে ১৪ হাজার ৪০০ পরিবার এবং ৬২ হাজার ৩৮৭ জন ব্যক্তির তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষণায় স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা ও প্রাপ্তির মধ্যে বড় ফারাক লক্ষ করা গেছে। দেশে গত এক মাসে প্রতি পাঁচজনের একজনের বেশি মানুষ চিকিৎসার প্রয়োজন অনুভব করেছে। মোট জনসংখ্যার ২২ দশমিক ৩২ শতাংশ মানুষ চিকিৎসার প্রয়োজনের কথা জানিয়েছে।কিন্তু তাদের একটি বড় অংশ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পায়নি। প্রায় ১৫ শতাংশ মানুষ চিকিৎসা না পাওয়া বা অসম্পূর্ণ চিকিৎসার মধ্যে রয়েছে। অর্থাৎ যাদের চিকিৎসা প্রয়োজন, তাদের বড় অংশই কার্যত সেবা থেকে বঞ্চিত থাকছে।
চিকিৎসাসেবায় গ্রাম ও শহরের মধ্যে বৈষম্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গ্রামীণ এলাকায় অপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবার হার ৬৫ শতাংশের বেশি, শহরে তা প্রায় ৫৯ শতাংশ।
স্বাস্থ্য অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, চিকিৎসকের ঘাটতি এবং অর্থনৈতিক দুর্বলতাকে এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
জেলা পর্যায়ের চিত্র আরও বৈচিত্র্যময়। নড়াইলে ৮১ শতাংশ এবং হবিগঞ্জে ৮০ শতাংশ মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পায়নি। অন্যদিকে ফেনীতে এই হার মাত্র ১৮ শতাংশ।
চিকিৎসা না পাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে উচ্চ ব্যয়।
পাশাপাশি স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতার অভাব, রোগ সম্পর্কে ভয় এবং চিকিৎসাকেন্দ্রে যাওয়ার মতো সহায়তার অভাবও গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
অনেক ক্ষেত্রে মানুষ বাধ্য হয়ে ফার্মেসি বা অযোগ্য চিকিৎসকের ওপর নির্ভর করছে। এতে রোগ জটিল হয়ে পরে আরও বেশি ব্যয়ের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য ব্যয়ের বড় অংশ যাচ্ছে ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায়। বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে একটি পরিবারকে গড়ে ২ হাজার ৩৪২ টাকা ব্যয় করতে হয়। ডায়াগনস্টিক পরীক্ষায় গড়ে ২ হাজার ৮১৪ টাকা এবং ওষুধে প্রায় ১ হাজার ২৮০ টাকা খরচ হয়। পরিবহন, চিকিৎসক ফি ও অন্যান্য ব্যয় যুক্ত হলে মোট খরচ আরও বাড়ে।
হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিতে গেলে ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। গড়ে ৪২ হাজার ৪৮৩ টাকা খরচ হয়।
এর মধ্যে অস্ত্রোপচারে প্রায় ২৬ হাজার টাকা, ওষুধে ১১ হাজার টাকার বেশি এবং পরীক্ষায় সাড়ে ৮ হাজার টাকার বেশি ব্যয় হয়।
কিছু রোগের ক্ষেত্রে চিকিৎসা ব্যয় আরও বেশি। ক্যানসার চিকিৎসায় একটি পরিবারের সর্বোচ্চ ব্যয় প্রায় ৮ লাখ ৪৮ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়েছে। হৃদরোগে গড়ে প্রায় ১ লাখ টাকা এবং কিডনি রোগে গড়ে ৬৩ হাজার টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে।
এমনকি নিউমোনিয়া, টাইফয়েড বা দুর্ঘটনার মতো রোগের চিকিৎসায়ও কয়েক হাজার থেকে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে।
দেশে প্রায় ২২ শতাংশ মানুষ গত এক মাসে অসুস্থ হয়েছে এবং বছরে প্রায় ৩ শতাংশ মানুষকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে।
সেমিনারে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ বলেন, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ব্যয় যত বাড়বে, বৈষম্যও তত বাড়বে। কারণ দরিদ্র মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিত্সা থেকেও বঞ্চিত হয়।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, সরকার বৈষম্যহীন আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও মানবিক কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।
তিনি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির পাশাপাশি বৈষম্যও বেড়েছে। সামাজিক সূচকে উন্নয়ন হলেও কর-জিডিপি অনুপাত, আয়বৈষম্য ও দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলো গভীরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বর্তমান সরকার এসব বিষয়কে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে দেখছে এবং এটিকে একটি জাতীয় আকাঙ্ক্ষায় রূপ দিতে কাজ করছে।