× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

কাটাছেঁড়া সংসদের মূল নকশায়

আসাদুজ্জামান সম্রাট

প্রকাশ : ০৮ মে ২০২৬ ১২:৩৭ পিএম

সংসদে হেডফোন পড়া অবস্থায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। ছবি: ভিডিও থেকে

সংসদে হেডফোন পড়া অবস্থায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। ছবি: ভিডিও থেকে

সংসদে সাউন্ড সিস্টেমের বিপর্যয়ের কারণে ‘মাথাব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলার’ মতোই সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ। মার্কিন স্থপতি লুই আই কানের নকশায় জাতীয় সংসদের প্লেনারি হলে কোথাও অ্যাকুইস্টিক সিস্টেম না থাকলেও এই প্রথমবারের মতো ‘অ্যাকুইস্টিক’ বসানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। যেটা জাতীয় সংসদ ভবনের ৪৫ বছরের ইতিহাসে বিরল। একই সঙ্গে এটি মার্কিন স্থপতি লুই আই কানের নকশা বহির্ভূত একটি নির্মাণকাজ।

গত ৫ আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময়ে একদল লোক জাতীয় সংসদ ভবনে ঢুকে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট করে যা থেকে রক্ষা পায়নি সংসদের মূল প্লেনারি হলের সাউন্ড সিস্টেমও। জাতীয় সংসদের রক্ষণাবেক্ষণ কাজে নিয়োজিত গণপূর্ত অধিদপ্তর পুরো সাউন্ড সিস্টেম ব্যবস্থাকে নতুন করে বসানোর প্রস্তাব দিলেও টাকার সংস্থান না হওয়ায় তা সংস্কার করা হয়।

সংসদ ভবনের এই সাউন্ড সিস্টেম বসানোর জন্য সাড়ে ২২ কোটি টাকার বাজেট ধরা হলেও পরে তা মাত্র সাড়ে চার কোটি টাকায় সংস্কার করা হয়। ফলে এতে কিছু ত্রুটি রয়েই যায়। আর এ কারণেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনই সাউন্ড সিস্টেমে সমস্যা ধরা পড়ে। পরে আরও কয়েক দফা সমস্যা হলে গণপূর্ত অধিদপ্তর তা সংস্কার করে এবং জাতীয় সংসদ অধিবেশনের শেষ দিকে আর কোনো সমস্যা হয়নি।

সংসদের সাউন্ড সিস্টেম বিপর্যয় কোনো নাশকতা কি না তা তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়েছিল এবং কমিটি ইতোমধ্যে রিপোর্ট জমা দিয়েছে। তবে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের পক্ষ থেকে কমিটির রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়নি। গণপূর্ত অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের প্রধান অধ্যাপক নাজমুল ইমামকে কয়েক দফায় আনা হলে তিনি নতুন সাউন্ড সিস্টেম বসানো এবং শব্দের প্রতিধ্বনি ঠেকাতে অ্যাকুইস্টিক সিস্টেম বসানোর সুপারিশ করেন। জাতীয় সংসদ সচিবালয়ও সেই পথে হাঁটতে যাচ্ছে।

গত বুধবার সংসদ ভবনে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলামের অফিসে গণপূর্ত অধিদপ্তরের পক্ষ একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। যাতে তিনটি কোম্পানির সাউন্ড সিস্টেম নিয়ে একটি প্রেজেন্টেশন দেওয়া হয়। এ ছাড়া অ্যাকুইস্টিক করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও গণপূর্ত অধিদপ্তরের সিভিল বিভাগ এটি কীভাবে বাস্তবায়ন করবে, সে সম্পর্কে কোনো প্রেজেন্টেশন প্রস্তুত করতে পারেনি। পরবর্তী বৈঠকে এ বিষয়ে গণপূর্ত শেরেবাংলা নগর-১ থেকে প্রেজেন্টেশন দেওয়া হবে।

ওই বৈঠকে চিফ হুইপ ছাড়াও জাতীয় সংসদের হুইপ মিয়া নূর উদ্দিন অপু, গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) খালেকুজ্জামান চৌধুরী, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশ্রাফুল হক আশরাফ, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহাবুবুল হক চৌধুরী, নির্বাহী প্রকৌশলী রিসালাত বারীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে সাউন্ড সিস্টেমের বিষয়টি স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রমকে অবহিত করা এবং তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে কথা বলে তার মতামত নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে সিদ্ধান্ত হয়।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে প্লেনারি হলে শব্দের প্রতিধ্বনি ঠেকাতে অ্যাকুইস্টিক করা ছাড়া কোনো উপায় নেই বলা হলেও সংসদ ভবনের ইতিহাসে এটি একটি নতুন সংযোজন হতে যাচ্ছে যা সংসদের মূল স্থপতি লুই আই কানের নকশার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। গত ৪৫ বছর অ্যাকুইস্টিক ছাড়াই প্রতিধ্বনিবিহীন অধিবেশন পরিচালনা হয়ে আসছিল। জাতীয় সংসদ ভবনের প্লেনারি হলের আসবাবপত্র ধরন, সাউন্ড সিস্টেম স্থাপনের নিয়ম এবং ব্যবহৃত চেয়ার ও কাঠের আসবাবপত্রের বার্নিশও একটি নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে করা হয়ে থাকে। ৫ আগস্টের পরে এখানে যে নির্মাণ, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ হয়েছে তাতে এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হয়েছে।

জাতীয় সংসদে গত ত্রিশ বছরেরও বেশি কর্মরত কয়েকজন জানিয়েছেন, প্লেনারি হলের মেঝেতে মোটা কার্পেট বসানো ছিল যা শব্দকে শুষে নিতে সহায়ক। কাঠের টেবিলগুলোতে অনুজ্জ্বল বার্নিশ করার নিয়ম রয়েছে যাতে শব্দ শুষে নেয়। বর্তমানে টেবিলগুলো এমনভাবে বার্নিশ করা হয়েছে যাতে শব্দকে শুষে নেওয়ার পরিবর্তে রিফ্লেক্ট করে। প্লেনারি হলেও ভেতরের গ্যালারি ও লবিগুলোতে মোটা পর্দা লাগানো হতো, যা স্বাভাবিকের তুলনায় ঘন। এগুলো শব্দকে শুষে নিতে সাহায্য করত। বর্তমানে সেখানে ভার্টিক্যাল ব্লাইন্ড বসানো হয়েছে যা মোটেই শব্দকে শুষে নিতে সক্ষম নয়। এ ছাড়া সংসদ সদস্যদের প্রতিটি সিটের সাউন্ড সিস্টেম এমনভাবে বসানো হতো যেন নিজের দিকে নির্দেশ করে। বর্তমানে সাউন্ড সিস্টেমগুলো ঊর্ধ্বমুখী এবং শব্দকে প্লেনারি হলের শক্ত সারফেসে ধাক্কা খায় এবং প্রতিধ্বনি তৈরি করে। সংসদ ভবনের একজন প্রকৌশলী জানিয়েছেন, পূর্বের প্রতিটি ব্যবস্থাই ছিল অ্যাকুইস্টিকের অংশ যা এখন সংসদ ভবনে অনুপস্থিত।

প্রসঙ্গত, ১৯৬১ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) প্রাদেশিক আইনসভার জন্য জাতীয় সংসদ ভবনের নির্মাণ শুরু করে। ১৯৮২ সালের ২৮ জানুয়ারি নির্মাণকাজ সম্পন্ন হওয়ার পর একই বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের দ্বিতীয় সংসদের অষ্টম অধিবেশনে প্রথম সংসদ ভবন ব্যবহৃত হয়। এই স্থাপনার স্থাপত্য দর্শনের মূলে ছিল স্থানের সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং স্থাপত্যশৈলীর মাধ্যমে বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে ফুটিয়ে তোলা। প্রকৃতির বিভিন্ন প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রামকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে স্থাপত্যশৈলী দ্বারা। এটি পৃথিবীর অন্যতম শিল্পকলাগুলোর মধ্যে একটি।

মূল প্লাজার মূল অংশটি হচ্ছে সংসদ অধিবেশন কক্ষ। এখানে একই সময়ে ৩৫৪ জন সদস্যের সংস্থান রাখা হয়েছে। ভিআইপিদের জন্য দুটি পোডিয়াম এবং দুটি গ্যালারি রয়েছে। পরাবৃত্তাকার ছাদসম্পন্ন অধিবেশন কক্ষটির উচ্চতা ১১৭ ফুট। ছাদটি স্বচ্ছভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে দিনের আলো এতে প্রবেশ করতে পারে। সূর্যের আলো চারদিকের ঘেরা দেয়াল ও অষ্টভুজকৃতির ড্রামে প্রতিফলিত হয়ে অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করে। আলোর নান্দনিকতা ও সর্বোচ্চ ব্যবহার লুই কানের স্থাপত্য ক্ষমতার এক অনন্য নিদর্শন। সংসদ ভবন ব্যবহারের সাড়ে চার দশক পর এখানে অ্যাকুইস্টিক স্থাপনের মাধ্যমে মূল নকশাকে কাটাছেঁড়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা