× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন

নামেই সচল কাজে অচল

তোফাজ্জল হোসাইন কামাল

প্রকাশ : ০৭ মে ২০২৬ ০৯:১৪ এএম

আপডেট : ০৭ মে ২০২৬ ০৯:১৫ এএম

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। ছবি: সংগৃহীত

সচল মনে করা হলেও কার্যত অচল হয়ে পড়েছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (এনএইচআরসি)। টানা ১৮ মাস ধরে এই কমিশন থেকে কোনো আইনি সহায়তা পাচ্ছেন না কোনো ভুক্তভোগী। ফলে অভিযোগের স্তূপ জমে উঠেছে। মাঝখানে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হাইকোর্টের সাবেক বিচারক মইনুল ইসলাম চৌধুরীকে চেয়ারম্যান করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠন করে। কিন্তু তারপরও কাজে কোনো অগ্রগতি ঘটেনি; বরং দুই মাসের মাথায় গত এপ্রিল মাসে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন রহিতকরণ ও পুনর্গঠন বিল ২০২৬’ পাসের মাধ্যমে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ের অধ্যাদেশ বাতিল করায় কমিশন অচল হয়ে পড়েছে। সব মিলিয়ে গত ১৮ মাস ধরে কমিশনে দৈনন্দিন কাজ ছাড়া ছোটবড় কোনো অভিযোগেরই সুরাহা করা সম্ভব হচ্ছে না।

জানতে চাইলে মানবাধিকার কমিশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা ইউশা রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এখন মূলত রুটিন কাজ চলছে। অভিযোগ জমা পড়লে তা সংরক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে। তবে কমিশন না থাকায় কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’ তিনি বলেন, ‘জমা হওয়া অভিযোগ নিষ্পত্তির এখতিয়ার শুধুমাত্র কমিশনের। তাই আমরা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা অভিযোগগুলো ফাইলবন্দি করে রাখছি।’ নতুন কমিশন এলে এসব অভিযোগের নিষ্পত্তি হবে বলে আশা করেন তিনি। 

মানবাধিকার কমিশনের আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বা সংস্থার হাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ স্বতঃপ্রণোদিতভাবে বা অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধান ও তদন্ত করতে পারে প্রতিষ্ঠানটি। মধ্যস্থতা ও সমঝোতার মাধ্যমে অভিযোগ নিষ্পত্তি, ক্ষতিগ্রস্তকে আইনি সহায়তা দেওয়া, নারী ও শিশু অধিকারসহ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা, কারাগার ও আটককেন্দ্র পরিদর্শন করে তা উন্নয়নের জন্য সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করাসহ মানবাধিকার বিষয়ক বিভিন্ন বিষয়ে কমিশনকে ক্ষমতা দেওয়া আছে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন প্রথম গঠিত হয় ২০০৮ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জারি করা এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে। ২০০৯ সালে সেটি আইনে রূপান্তরিত হয়। যা নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে। ২০২৪ সালের ৭ নভেম্বর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার কমিশনটি বিলুপ্ত করে। পরে ২০২৫ সালের নভেম্বরে কমিশন পুনর্গঠন ও এর ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নতুন অধ্যাদেশ জারি করা হয়। যেটি পরবর্তী মাস ডিসেম্বরে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫-এ সংশোধিত গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। এতে নতুনভাবে জাতীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা বিভাগ গঠন, স্বাধীন বাজেট, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং স্বাধীনতাবঞ্চিত ব্যক্তিদের সুরক্ষায় বিস্তৃত ক্ষমতা যুক্ত করা হয়। নতুন অধ্যাদেশে রাজনৈতিক বা অন্যান্য যেকোনো বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত করার ক্ষমতাও দেওয়া হয় কমিশনকে। তবে অভিযোগ রয়েছে, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সংশোধিত অধ্যাদেশে কমিশনের কাজ ও ক্ষমতা বাড়লেও তা কাগজপত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল, বাস্তবে নয়।

গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের তিন মাস পর নভেম্বরে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন আহমেদসহ পাঁচজন সদস্য পদত্যাগ করেন। গত বছর ডিসেম্বরে জারি হয় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ-২০২৫। সেই অধ্যাদেশের আলোকেই চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের শেস সময়ে এসে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠন করা হয়। চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পান হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী। কমিশনের অপর সদস্যরা ছিলেনÑ মানবাধিকারকর্মী নূর খান, ড. নাবিলা ইদ্রিস, শরীফুল ইসলাম ও ইলিরা দেওয়ান।

কিন্তু গত ৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ ও পুনঃপ্রচলন) বিল কণ্ঠভোটে পাস হয়। বিরোধী দলের আপত্তি নাকচ করে জাতীয় মানবাধিকার আইন অধ্যাদেশ বাতিল এবং ২০০৯ সালে করা ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন’ আবার চালু করতে বিল পাস করে জাতীয় সংসদ। অধ্যাদেশটি বাতিল হওয়ায় স্বয়ংক্রিয়ভাবেই আগের কমিশন আর থাকার সুযোগ নেই। গত ১৩ এপ্রিল কোনো নোটিস কিংবা পদত্যাগ ছাড়াই কমিশনের সকল সদস্য একটি খোলা চিঠি লিখে কমিশনের কারওয়ান বাজারের কার্যালয় ছেড়ে চলে যান। এই কমিশন কার্যকর ছিল দুই মাস। আসা আর যাওয়া ছাড়া কমিশনের সদস্যরা কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেননি। ফলে আগের ১৪ মাস ছিল কমিশনশূন্য, পুনর্গঠনের পর কমিশন সচল হলেও দুই মাসই ছিল কার্যক্রমবিহীন। এরপর সেটি আবার অচল হয়ে পড়েছে। সব মিলে ১৮ মাস ধরে অচলাবস্থায় রয়েছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কমিশনের একজন নারী উপ-পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘যখন অধ্যাদেশ সংসদে বাতিল হয়েছে, তখনই ২০০৯ সালের আইনটি পুনর্বহাল হয়েছে। সে ক্ষেত্রে ২০২৫ সালের অধ্যাদেশটি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন কমিশনের নিয়োগ ছিল জাতীয় মানবাধিকার আইন-২০২৫-এর অধীনে। অধ্যাদেশ যেহেতু বিলুপ্ত হয়ে গেছে, তাই ওই কমিশনের নিয়োগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে অকার্যকর ও বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তাই পদত্যাগের প্রশ্নই আসে না।’ কমিশন সদস্যদের জনগণের উদ্দেশে লেখা খোলা চিঠি সম্পর্কে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘তারা হয়তো বিষয়টি দেশবাসীকে জানানোর জন্য খোলা চিঠি লিখেছেন।’ কমিশনের অপর একটি সূত্র জানায়, অধ্যাদেশ বাতিল হলেও পুনর্গঠিত না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। 

সূত্রমতে, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে কোনো অভিযোগ এলে প্রথমে তা যাচাই-বাছাই করা হয়। কমিশনের তিনটি বেঞ্চে অভিযোগগুলো উত্থাপিত হয়। একটি চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে ১ নম্বর বেঞ্চ এবং দ্বিতীয়টি সার্বক্ষণিক সদস্যের নেতৃত্বে ২ নম্বর বেঞ্চ। আরেকটি আছে আপস বেঞ্চÑ যেখানে বাদী ও বিবাদী উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা করা হয়। সেটিও একজন সদস্যের নেতৃত্বে। কমিশনের চেয়ারম্যান, সার্বক্ষণিক সদস্য ও সদস্যরা না থাকায় একটি বেঞ্চও কার্যকর নেই এখন।

সূত্র জানায়, গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত কমিশনের কাছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ৪৭১টি নানা ধরনের অভিযোগ জমা পড়ে। কমিশনের অভাবে এসব অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য ফাইলবন্দি করে রাখা হয়েছে। গত ১৩ এপ্রিল সর্বশেষ বিদায়ী কমিশন থাকাবস্থায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কাছে সর্বমোট এক হাজার ২১৯টি অভিযোগ জমা পড়ে। এর মধ্যে আগের চলমান অভিযোগের সংখ্যা ছিল ৫৩৮টি। বাকি ৬৮১টি অভিযোগই নতুন। এর মধ্যে ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগ থেকে আসা অভিযোগ ৫২৪টি। এ ছাড়া চট্টগ্রাম ও সিলেট থেকে ১৯৮টি, খুলনা ও বরিশাল থেকে ২২৯টি এবং রংপুর ও রাজশাহী থেকে ২৫৭টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এই অভিযোগগুলো কমিশনের গঠিত দুটো বেঞ্চের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হবে বলে জানা গেছে। ১১টি অভিযোগ রয়েছে আপস বেঞ্চের মাধ্যমে নিষ্পত্তির অপেক্ষায়।

সূত্র জানায়, কমিশনের হাতে থাকা অভিযোগের মধ্যে সবচে বেশি অভিযোগ জমিজমা-সম্পত্তি দখল নিয়ে। এরপর রয়েছে চাকরি, বেতনভাতা, ইউনিয়ন, কাজের পরিবেশ সংক্রান্ত, মিথ্যা মামলা ও পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা