প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৬ মে ২০২৬ ১৫:০০ পিএম
আপডেট : ০৬ মে ২০২৬ ১৫:০২ পিএম
হাওরাঞ্চলে ক্ষেত থেকে ডুবে যাওয়া ধান আংশিক কেটে আনা সম্ভব হলেও এর বড় অংশই পচে গেছে। মঙ্গলবার হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জে। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
হবিগঞ্জের হাওরজুড়ে এখন শুধু পানির ঢেউ আর ভাঙা স্বপ্নের গল্প। পচা ধানের গন্ধ যেন বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে প্রকৃতির কাছে কতটা অসহায় হাওরাঞ্চলের মানুষ। কৃষকরা যে ধান কেটে স্বপ্নের মতো করে স্তূপ করে রেখেছিলেন জমিতে, সেই ধান এখন বৃষ্টির পানিতে ভিজে পচে যাচ্ছে। পানির নিচে ডুবে থাকা পাকা ধান থেকে বের হচ্ছে পচা গন্ধ, আর সেই গন্ধের সঙ্গে মিশে আছে কৃষকের দীর্ঘশ্বাস আর কান্না।
বিভিন্ন হাওর ঘুরে দেখা গেছে, কয়েকদিন আগেও যেখানে সোনালি ধানের সমারোহ ছিল, এখন সেখানে শুধু অথই পানি। পানির নিচে পচে নষ্ট হয়ে গেছে কৃষকের বছরের একমাত্র ফসল। অনেক কৃষক চোখের সামনে নিজের ঘাম ঝরানো ফসল ডুবে যেতে দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন।
বানিয়াচং উপজেলার বিজয়পুর গ্রামের কৃষক মাইন উদ্দিন বলেন, এই ধানটাই ছিল আমাদের বাঁচার ভরসা। ঋণ নিয়ে চাষ করেছি। কীভাবে ঋণ শোধ করব, পরিবার চালাব, কিছুই বুঝতে পারছি না।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক দীপক কুমার পাল জানান, হবিগঞ্জে পানিতে তলিয়ে গেছে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার হেক্টর জমির পাকা ধান। প্রায় ৬০ শতাংশ জমির ধান কাটা সম্ভব হয়েছে। বাকি জমির ধান কাটার আগেই পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকরা। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ২০ হাজার কৃষক।
কিশোরগঞ্জের নদ-নদীতে পানি বৃদ্ধি, রোদ হাসলেও কাটেনি উদ্বেগ
কিশোরগঞ্জে বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢলে নদ-নদীর পানি বাড়ার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে রোদ ওঠলেও গত ২৪ ঘণ্টায় নদ-নদীর পানি আরও বাড়ায় নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে কৃষকদের মধ্যে। অতিবৃষ্টিতে জেলার সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে জেলার ইটনা উপজেলার হাওরগুলোতে। এখনও এই উপজেলার অনেক হাওরের নিচু জমির বড় অংশই এখন পানির নিচে তলিয়ে রয়েছে। তবে আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী কয়েক দিনে অন্তত খলার ধান উদ্ধার করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন স্থানীয় কৃষকরা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান জানান, গত শনিবার বিকাল পর্যন্ত মাঠপর্যায়ের তথ্যমতে সাড়ে ১২ হাজার হেক্টর জমি পানিতে তলিয়ে ৪৯ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে ইটনা ও অষ্টগ্রাম উপজেলায়। বর্তমানে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের চূড়ান্ত তালিকা তৈরির কাজ করছেন।
এদিকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সাইদুর রহমান খান জানিয়েছেন, হাওরাঞ্চলের কৃষকদের ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নিতে তিন মাস মেয়াদি বিশেষ মানবিক সহায়তা কর্মসূচি শুরু করেছে সরকার। সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বিবেচনায় কৃষকদের তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করে সহায়তা দেওয়া হবে। পাশাপাশি প্রত্যেক কৃষককে মাসে ২০ কেজি করে চাল দেওয়া হবে।
স্বপ্নভাঙার শঙ্কায় গোমস্তাপুরের কৃষকরা
চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলায় উজান থেকে নেমে আসা ঢল আর টানা অতিবৃষ্টিতে কয়েক হাজার হেক্টর জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে কৃষকদের মুখে নেমে এসেছে হতাশার ছায়া। যেই বিল কুজইন মাঠে থাকার কথা ছিল পাকা বোরো ধানের সোনালি ঢেউ, সেই মাঠ আজ পরিণত হয়েছে নিঃশব্দ জলরাশিতে।
কৃষি বিভাগের হিসাবে, উপজেলার এই বিলাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জমির বোরো ধান হঠাৎ বেড়ে যাওয়া পানিতে তলিয়ে গেছে। কাটার উপক্রম হওয়া ধান ঘরে তোলার আগেই এমন বিপর্যয় কৃষকদের জন্য হয়ে উঠেছে এক নির্মম আঘাত।
গোমস্তাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাকলাইন হোসেন জানান, ‘পানি দ্রুত নেমে গেলে কিছু ধান হয়তো রক্ষা করা সম্ভব। তবে দীর্ঘদিন পানি স্থায়ী হলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।’
কুমিল্লায় ভারী বর্ষণে ডুবছে কৃষকের স্বপ্ন
কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ায় ভারী বর্ষণে উপজেলার বেশকিছু নিম্নাঞ্চলের পাকা ও আধাপাকা ধানক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। এ ছাড়া কুমিল্লা জেলার বরুড়া, হোমনা, দেবিদ্বারসহ আরও কয়েকটি উপজেলায় অপেক্ষাকৃত ঢালু ফসলি জমিতে পানি আটকিয়ে যাওয়ায় এ মৌসুমে ফসলের ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে।
ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল মতিন বলেন, আমরা মাঠপর্যায়ের কৃষকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। পানি দ্রুত নেমে গেলে ক্ষতির পরিমাণ কম হবে। এমন দুর্যোগে আমরা কৃষকদের পাশে থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি।
পোরশায় উজানের ঢলে তলিয়ে গেছে বোরো ধান
নওগাঁর পোরশায় বৃষ্টি ও উজানের ঢলে নিতপুর এলাকার বিভিন্ন বিলের পানি আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে কয়েকশ হেক্টর বোরো ধানের জমি তলিয়ে গেছে। পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় কোথাও কোমর পানিতে নেমে ধান কাটতে হচ্ছে কৃষকদের। আবার যেসব ধান কাটা হচ্ছে সেসব ধান রোদের অভাবে শুকাতে না পেরে নষ্ট হওয়ার উপক্রম। এমন অবস্থায় বড় ধরনের ক্ষতির শঙ্কায় দিন কাটছে কৃষকদের।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মামুনূর রশিদ বলেন, বোরো জমিতে পানি প্রবেশ করে ৫ হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে। আর ৩০ হেক্টর জমির ধান আংশিক তলিয়ে গেছে। উজানের ঢল বেড়ে যাওয়ায় পুনর্ভবা নদীর পানি বেড়ে যায়। এতে নতুন করে আরও ধানি জমি তলিয়ে যায়। তবে ৬০-৭০ ভাগ ধান পেকে যাওয়ায় লক্ষ্যমাত্রার কোনো হেরফের হবে না বলে তিনি জানান