ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ০৫ মে ২০২৬ ০৯:৫৩ এএম
পুলিশের লোগো। ছবি: সংগৃহীত
কাজী জিয়া উদ্দীন। বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের ১৮তম ব্যাচের কর্মকর্তা। ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। পেশাগত জীবনে মেধাবী ও নিরপেক্ষ কর্মকর্তা হিসেবে সুপরিচিত। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি কখনও জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) কিংবা রেঞ্জের ডিআইজি হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সুযোগই পাননি। পদোন্নতিও পাননি সময়মতো। পুলিশ অধিদপ্তরে ডিআইজি পদে থেকে নীরবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন। বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ সভায় যোগ দিয়েছেন। অবশেষে তাকে পাঠানো হয়েছে বাধ্যতামূলক অবসরে। একই পরিণতির শিকার হয়েছেন আরও ১৬ জন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা।
অবসর প্রদানের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪৫ ধারার বিধান অনুযায়ী জনস্বার্থে এই কর্মকর্তাদের অবসর দেওয়া হয়েছে। তারা বিধি অনুযায়ী অবসরজনিত সব সুবিধাই পাবেন। এর আগে গত ২২ এপ্রিল পুলিশের ১১ জন ডিআইজি ও ২ জন অতিরিক্ত ডিআইজিকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায় সরকার।
এসব ঘটনা পুলিশ প্রশাসনের ভেতর তৈরি করেছে চাপা অসন্তোষ। দৃশ্যমান না হলেও ভেতরে ভেতরে বাড়ছে উদ্বেগ, অনিশ্চয়তা আর হতাশা। বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতিবঞ্চিত কিংবা নিজেদের ‘নিরপেক্ষ’ কর্মকর্তা হিসেবে ভাবতেনÑ তাদের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি অস্বস্তি কাজ করছে।
আকস্মিক নয়, এটি পরিকল্পিত
গত রবিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে বাংলাদেশ পুলিশে কর্মরত বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের ১৭ জন ডিআইজি (উপ-মহাপরিদর্শক) ও অতিরিক্ত ডিআইজি পদমর্যাদার কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন, যদিও এদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি পাননি।
পুলিশ অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, এই প্রক্রিয়াটি আকস্মিক ছিল না। বরং বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার গঠনের পর থেকেই একটি তালিকা তৈরির কাজ চলছিল। সেই তালিকায় নির্দিষ্ট কিছু কর্মকর্তাকে ‘বাছাই’ করা হয়। যাদের অনেকের ক্ষেত্রেই অভিযোগ, তাদের মূল্যায়ন হয়েছে ‘ট্যাগ’ দিয়ে, তথ্য-প্রমাণ দিয়ে নয়। এটা কোনো স্বাভাবিক প্রশাসনিক রদবদল না।
আবারও ‘ট্যাগিং’ আতঙ্ক
বর্তমানে প্রশাসনের ভেতরে সবচেয়ে আলোচিত শব্দ ‘ট্যাগিং’Ñ যার শুরু অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে। তবে এর ধারাবাহিকতায় এখন নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। অবশ্য ‘ট্যাগিং’ হলেও অন্তর্বর্তী সরকার এসব কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায়নি। কিন্তু নতুন সরকার গঠনের পরপরই অতিউৎসাহী কতিপয় পুলিশ কর্মকর্তা এদের অবসরে পাঠাতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। কর্মকর্তাদের অতীত কর্মজীবন বা পোস্টিং, কিংবা কোনো নির্দিষ্ট সরকারের আমলে দায়িত্ব পালনের ভিত্তিতে তাদের ওপর গোপনে সরকারবিরোধী ট্যাগ বসানো হয়। এভাবে অনেককেই অবসরে পাঠানোর পথ তৈরি করা হয়েছে বলে পুলিশ প্রশাসনের অন্দরমহলে জোর আলোচনা রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অতিরিক্ত ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা বলেন, ‘যারা পেশাদারি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কাজ করেছেন, কোনো রাজনৈতিক পক্ষ নেননিÑ তারাও এখন নিরাপদ নন। কে কখন কোথায় ছিল, কোন সরকারের সময়ে কোন কাজ করেছেÑ এসব দিয়েই এখন বিচার করা হচ্ছে। যদিও সরকারি চাকরিতে কর্মরত কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালন করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প থাকে না।’
এখনও সক্রিয় অদৃশ্য সিন্ডিকেট
সিভিল বা পুলিশ প্রশাসনে গ্রুপিং নতুন কিছু নয়। কিন্তু এখন এটি অনেক বেশি সংগঠিত রূপ নিয়েছে।
সূত্র মতে, এই প্রক্রিয়ায় ব্যক্তিগত সম্পর্ক, লবিং ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বড় ভূমিকা রাখছে। অনেক ক্ষেত্রেই কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ বা তদন্ত ছাড়াই কর্মকর্তাদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করা হচ্ছে।
একজন পুলিশ সুপার পদমর্যাদার কর্মকর্তা বলেন, ‘ভালো কাজ করেও যদি নিরাপত্তা না থাকে, তাহলে কাজের আগ্রহ থাকে কীভাবে? সব সময় মনে হয়, আজ না হোক, কাল হয়তো তার নামও চলে আসবে।’
বিশেষজ্ঞ অভিমত
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘বাধ্যতামূলক অবসর একটি বৈধ প্রশাসনিক ব্যবস্থা হলেও এর প্রয়োগ যদি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ না হয়, তাহলে তা ক্ষতিকর হয়ে ওঠে।’
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, ‘কর্মকর্তারা যখন নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চিত থাকেন, তখন তারা দায়িত্ব পালনে সতর্ক, কখনও অতিসতর্ক হয়ে পড়েন। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায়।’ তার মতে, ‘ট্যাগিং সংস্কৃতি’ প্রশাসনের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। এটি পেশাদারত্ব নষ্ট করে এবং একটি ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে। বড় সংখ্যায় অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের সরিয়ে দিলে ধারাবাহিকতা ভেঙে যায়। নতুন কর্মকর্তারা দায়িত্ব নিলেও অভিজ্ঞতার ঘাটতি সহজে পূরণ হয় না।’
আইন বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট ড. গাজী সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘বাধ্যতামূলক অবসর সাধারণত ‘জনস্বার্থে’ দেওয়া হয়। কিন্তু এই ‘জনস্বার্থ’ কীভাবে নির্ধারণ করা হচ্ছেÑ এটাই এখন বড় প্রশ্ন। যদি কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকে, তাহলে তা তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণ করা উচিত। কিন্তু কোনো প্রমাণ ছাড়া শুধু ধারণার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিলে তা আইনের শাসনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।’
পুরনো সমস্যা, নতুন মাত্রা : বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাব নতুন নয়। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কিছু রদবদল হয়Ñ এটাই বাস্তবতা। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই প্রভাব অনেক বেশি দৃশ্যমান। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে তারা কয়েকটি সুপারিশ করেছেন। বলছেন, বাধ্যতামূলক অবসরের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা দরকার। নিরপেক্ষ ও স্বাধীন মূল্যায়ন কমিটি গঠন করতে হবে। অভিযোগ থাকলে তা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা দরকার। তাদের মতে, এসব পদক্ষেপ না নিলে প্রশাসনের ভেতরে আস্থাহীনতা আরও বাড়বে।
সূত্র জানায়, বর্তমান পরিস্থিতি হয়তো বাইরে থেকে খুব বেশি দৃশ্যমান নয়। কিন্তু ভেতরে ভেতরে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
যা বললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী : পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাÑ ডিআইজি পদমর্যাদার ১৬ জনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে প্রশাসনজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। এ বিষয়ে সোমবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি কিংবা শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থাÑ এসবই মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ এবং এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া।’ মন্ত্রী জানান, ‘এসব সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই; বরং প্রয়োজন ও পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রতিনিয়ত এ ধরনের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকে।’
বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কোনো অভিযোগ বা প্রমাণ রয়েছে কি নাÑ এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এসব মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ বিষয়। যথাযথ প্রক্রিয়ায় যাচাই-বাছাই করেই তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি যাতে কারও প্রতি কোনো ধরনের অবিচার না হয়।’