ফসলডুবি
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০১ মে ২০২৬ ১০:০৪ এএম
আপডেট : ০১ মে ২০২৬ ১০:০৫ এএম
বৃষ্টি ও ঢলের পানিতে ডুবে যাওয়া ফসল কেটে কোনোমতে ডাঙায় তোলার চেষ্টা। বৃহস্পতিবার সুনামগঞ্জের দেখার হাওরে। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে গেছে হাওরাঞ্চলের হাজার হাজার হেক্টর জমির পাকা-আধাপাকা বোরো ধান। কষ্টের ফসল হারিয়ে চোখে অন্ধকার দেখছেন লাখো কৃষক। কণ্ঠে তাদের করুণ আর্তনাদ।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের একজন নেত্রকোণার কুন্ডুলী গ্রামের নজরুল ইসলাম। দিনমজুরি করে সংসার চালান। তিনি উগারিয়া হাওরে ৩০ শতাংশ জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন। তার সব ধান এখন পানির নিচে। নজরুল ইসলাম বলেন, ধান কেটে ঘরে তোলার কোনো সুযোগ নাই। আর কান্না ছাড়া আমাদের কিছু করারও নেই।
একই এলাকার আরেক কৃষক সঞ্জু মিয়া, ঋণ করে এক একর জমিতে চাষ করে এক ছটাক ধানও ঘরে তুলতে পারেননি। কষ্টের সব ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। এখন ঋণ কীভাবে পরিশোধ করবে ও সংসারই কীভাবে চালাবেন সেই চিন্তায় অস্থির।
শুধু নজরুল ও সঞ্জু নয়Ñ সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার লাখো কৃষকের এমন করুণ অবস্থা। তারা না পারছেন ক্ষেতের ধান কাটতে। আবার কাটা ধানও ঘরে তুলতে পারছে না পানির কারণে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) ২৯ এপ্রিলের তথ্য অনুযায়ী, হাওরে এখন পর্যন্ত ২৮ হাজার ২০১ হেক্টর জমি পানিতে ডুবে আছে। ৪ লাখ ৫৫ হাজার ১৫৩ জমিতে এবারে বোরোর আবাদ হয়েছিল। তবে সরকারি এ পরিসংখ্যানের সঙ্গে দ্বিমত করছেন কৃষকরা। তারা বলছেন, পানিতে নিমজ্জিত জমির পরিমাণ আরও বেশি হবে।
কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, হাওরে দেশের ২০ শতাংশ ধান উৎপাদন হয়। ধানগুলো তলিয়ে যাওয়ায় আগামীতে খাদ্য সংকট দেখা দেওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
কিশোরগঞ্জের কৃষকের চোখে অন্ধকার
জেলার ইটনা, অষ্টগ্রাম, মিঠামইন ও নিকলী উপজেলার হাওরাঞ্চল আবারও প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত। আকস্মিক ঢল ও টানা বৃষ্টিতে বোরো ধানের বিস্তীর্ণ ক্ষেত পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় কয়েক হাজার কৃষক বছরের একমাত্র ফসল হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।
ইটনা উপজেলার কৃষক সাইফুল ইসলাম বলেন, ধান কাটার ১০-১৫ দিন বাকি ছিল। হঠাৎ পানি এসে সব শেষ করে দিল। এখন ঋণ শোধ করব কীভাবে, পরিবার চালাব কী দিয়েÑ কিছুই বুঝতে পারছি না।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. মোহাম্মদ সাদিকুর রহমান জানান, ইতোমধ্যে ৬ হাজার ৫০০ হেক্টর জমির বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে স্থানীয়দের আশঙ্কা, শেষ পর্যন্ত এই সংখ্যা ১০ হাজার হেক্টর অতিক্রম করবে। জেলার প্রধান নদ-নদীগুলোর পানি বাড়ায় আগাম বন্যার পূর্বাভাস রয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন।
নেত্রকোণায় ফসল হারানোর কান্না থামছে না
দুদিন আগেও হাওরজুড়ে ছিল পাকা ও আধাপাকা বোরো ধান। কিন্তু হঠাৎ ভারী বর্ষণে এসব ধান তলিয়ে গেছে। তাই হাওরের তীরজুড়ে এখন ফসল হারানো কৃষকদের ভিড়। তারা নির্বাক হয়ে অপলক দৃষ্টিতে কেবল তাকিয়ে আছেন তলিয়ে যাওয়া ধানের দিকে। কেউ করছেন হাহাকার। আর কেউ করছেন চাপা কান্না। বিশেষ করে ঋণের টাকায় বর্গাচাষ করা কৃষকদের কান্না যেন থামছেই না।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, কংস নদের পানি বিপদসীমার ১০০ সেন্টিমিটার এবং উবদাখালী নদীর পানি বিপদসীমার ৭৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে তলিয়ে যাচ্ছে ফসল
হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ে খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে হাওরে ডুকছে পানি। এতে তলিয়ে যাচ্ছে কৃষকের সোনালি ফসল। কৃষক রণধীর চক্রবর্তী বলেন, চোখের সামনে কষ্টার্জিত ফসল তলিয়ে যাচ্ছে তা সহ্য হচ্ছে না। আমাদের একমাত্র সম্বল হচ্ছে কৃষি। সেই ফসল হারিয়ে সারা বছর কেমনে চলবÑ এ নিয়ে ভাবছি।
গৌরীপুরে ডুবছে ফসল, কাঁদছে কৃষক
জেলার গৌরীপুরে প্রায় ২০০ হেক্টর জমির বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন কৃষকরা। স্থানীয় ইউপি সদস্য মোনায়েম খাঁ জানান, জলাবদ্ধতার জন্য অবৈধ বাঁধ ও অপরিকল্পিত পুকুরই প্রধান দায়ী। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য দ্রুত সরকারি সহায়তার দাবি করেন।
ডুমুরিয়ায় বৃষ্টি ও ত্রিমুখী সংকটে বোরো চাষিরা দিশেহারা
খুলনার ডুমুরিয়াসহ উপকূলীয় অঞ্চলে চলতি মৌসুমে বোরো ধানের বাম্পার ফলন হলেও কৃষকের মুখে হাসি নেই। ধান কাটার ভরা মৌসুমে চরম শ্রমিক সংকট, ধানের দরপতন এবং আকস্মিক বৃষ্টিতে ক্ষেত তলিয়ে যাওয়ায়Ñ ত্রিমুখী সংকটে দিশেহারা হাজারো কৃষক।
উপজেলার থুকড়া ও ঘোনা গ্রামের কৃষকরা জানান, নারী শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করালেও তাদের মজুরি দিতে হচ্ছে ১ হাজার টাকা। অনেক কৃষক পরিবার নিজেরাই ধান কাটার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে।
সুনামগঞ্জে জলাবদ্ধতায় ১৩ হাজার হেক্টরের ধান
টানা কয়েক দিনের অব্যাহত বৃষ্টিপাত আর উজানের পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জের হাওরের পাকা ধান নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষক। ইতোমধ্যে জলাবদ্ধতায় জেলার বিভিন্ন হাওরে প্রায় ১৩ হাজার হেক্টর জমির ধান আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে চূড়ান্তভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২ হাজার ৪৭ হেক্টর জমির ধান।
পাখিমারা হাওরের কৃষক লোকমান মিয়া বলেন, আজকে রোদ ওঠায় মনটা ভালো লাগছে। খলায় (মাঠ) কিছু ধান শুকিয়েছি। এখনও অনেক ধান শুকানোর বাকি আছে। এভাবে রোদ থাকলে দ্রুত সময়ের মধ্যে হাওরের ধান কাটা শেষ হবে।
দেখার হাওরের কৃষক পলাশ মিয়া বলেন, রোদের অভাবে অনেক ধান নষ্ট হইছে, জলাবদ্ধতায়ও অনেক ধান তলিয়ে গেছে। মানুষ খুবই বিপদে আছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক জানান, হাওরের অর্ধেক ধান কাটা হয়েছে। তবে বৈরী আবহাওয়ায় ধান শুকাতে না পেরে নতুন করে কৃষকেরা ধান কাটছেন না। আবহাওয়া কিছুটা অনুকূলে থাকায় বৃহস্পতিবার সকাল থেকে পুরোদমে ধান কাটা শুরু হয়েছে।
(প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য সহায়তা করেছেন খুলনা, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোণা, হবিগঞ্জের বানিয়াচং, ময়মনসিংহের গৌরিপুর এবং সুনামগঞ্জ প্রতিবেদক)