রূপপুরে জ্বালানি লোডিং
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৮ এপ্রিল ২০২৬ ১৬:৪৬ পিএম
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) লোডিং কার্যক্রম মঙ্গলবার বিকালে উদ্বোধন করা হয়। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) লোডিং কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দেশের জ্বালানি খাতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো।
লোডিং কার্যক্রম মঙ্গলবার বিকালে উদ্বোধন করেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। এসময় সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি, আন্তর্জাতিক অংশীদার এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর ডাক ও টেলিযোগাযোগ উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, “রূপপুর প্রকল্প শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার একটি বাস্তব উদাহরণ, যা বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।” তার ভাষায়, এই প্রকল্প দেশের জন্য জ্ঞানভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গঠনের পথে দৃঢ় ভিত্তি তৈরি করছে।
তিনি উল্লেখ করেন, রাশিয়ার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা, অর্থায়ন এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার সমন্বয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের ফলে প্রকল্পটি নিরাপত্তা ও গ্রহণযোগ্যতার দিক থেকে শক্ত অবস্থান অর্জন করেছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধান, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন-এর প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ-এর কঠোর নিয়ন্ত্রক ভূমিকার বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়। নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও সেফটির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে একটি শক্তিশালী নিরাপত্তা সংস্কৃতি গড়ে তোলার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে রোসাটম-এর মহাপরিচালক এলেক্সি লিখাচভ বলেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারে একটি স্বীকৃত অবস্থান অর্জন করছে। তিনি জানান, মহামারি, বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ নানা চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও নির্মাণকাজ একদিনের জন্যও বন্ধ হয়নি এবং এখন প্রকল্পটি সমাপ্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, “দ্বিতীয় ইউনিটে বর্তমানে পাইপলাইন ও পাম্পিং সরঞ্জাম স্থাপনের কাজ চলছে এবং আগামী বছর সেখানে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে।” প্রকল্প বাস্তবায়নে রাশিয়া ও বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সমন্বিত কাজ আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান নিশ্চিত করতে সহায়তা করেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রসঙ্গে লিখাচভ জানান, গত কয়েক বছরে রাশিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রোসাটমের কোটা অনুযায়ী ৯০০-এর বেশি বাংলাদেশি শিক্ষার্থী উচ্চতর পারমাণবিক শিক্ষা লাভ করেছে। তাদের অনেকেই ইতোমধ্যে এই প্রকল্পে যুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি ১১০০-এর বেশি বিশেষজ্ঞ তৈরি করার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি, যারা বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব আনোয়ার হোসেন বলেন, “২০১৭ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্প এখন পূর্ণাঙ্গ রূপ পাচ্ছে। এক বছরের মধ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি স্থাপনের মাধ্যমে কাজ দ্রুত এগিয়েছে।” তিনি জানান, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, বরং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার দিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, “রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র জাতীয় গ্রিডে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ যোগ করবে, যা শিল্পায়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে এটি পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি দীর্ঘমেয়াদি উৎস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যার সম্ভাব্য আয়ুষ্কাল প্রায় এক শতাব্দী।”
জ্বালানি লোডিং কার্যক্রমের মাধ্যমে রূপপুর প্রকল্প এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত প্রস্তুতির দিকে এগিয়ে গেল, যা বাংলাদেশের জ্বালানি ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।