প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৫ এপ্রিল ২০২৬ ১৫:৫৬ পিএম
প্রতিদিনের বাংলাদেশের নিজস্ব কার্যালয়ে শনিবার আয়োজিত প্রতিনিধি সভায় বক্তব্য দেন পত্রিকার সম্পাদক মারুফ কামাল খান। ছবি: এস এম আরিফুল আমিন
“সাংবাদিকরা মানবিক পয়গম্বর। তারা জনগণের বার্তাবাহক। কেননা সাংবাদিকরা মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন-প্রত্যাশা, সমস্যা-সংকট, ঘটনা-রটনা, কালি-কলম-সেলফোন-ল্যাপটপ-ক্যামেরার মাধ্যমে তুলে ধরেন। এ কাজে প্রতিটি অঞ্চলে আপনারাই (প্রতিনিধি) আমাদের দূত বা মেসেঞ্জার।”
প্রতিদিনের বাংলাদেশের প্রতিনিধি সভায় শনিবার সকালে সভাপতির বক্তব্যে এসব কথা বলেন প্রতিদিনের বাংলাদেশের সম্পাদক মারুফ কামাল খান।
এর আগে শনিবার বেলা সাড়ে ১১টায় রাজধানীর কুড়িল বিশ্বরোডস্থ প্রতিদিনের বাংলাদেশের নিজস্ব কার্যালয়ে সভা শুরু হয়।
সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন, রংধনু গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রতিদিনের বাংলাদেশ পত্রিকার প্রকাশক কাউসার আহমেদ অপু। উপস্থিত ছিলেন, রংধনু গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান মেহেদী হাসান দিপু, শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন পত্রিকার ব্যবস্থাপনা সম্পাদক মোরছালীন বাবলা, রংধনু গ্রুপের হেড অব ব্র্যান্ড মিডিয়া সাইফুল ইসলাম প্রমুখ।
প্রতিনিধিদের উদ্দেশে মারুফ কামাল খান বলেন, মেসেঞ্জার শব্দটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে আমার অন্তর দুলে উঠলো। মূলত আল্লাহ্র নবীদের মেসেঞ্জার বলা হয়। তারা মেসেঞ্জার অব গড, ঈশ্বরের দূত। নবুয়তের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আখেরি যামানায় আর কারও নবী হওয়ার সুযোগ নেই। ফার্সি ভাষায় নবীকে পয়গাম্বর বলা হয়। পয়গাম মানে বার্তা, আর পয়গাম্বর মানে বার্তাবাহক, ইংরেজিতে মেসেঞ্জার। সাংবাদিকেরা আল্লাহ্র বার্তাবাহক নন কিন্তু মানুষের বার্তাবাহক, মানবিক পয়গাম্বর। কথাটা মনে রাখবেন। নিজেকে ছোট ভাববেন না। আপনারা এক পরম পবিত্র দায়িত্ব পালন করছেন। এ দায়িত্বকে আমি ইবাদতের শামিল মনে করি। নিষ্ঠার সঙ্গে, আন্তরিকতা, সততা, দক্ষতা, যোগ্যতা ও নৈপুণ্যের সঙ্গে এ পূণ্য কর্তব্য পালন করলে যে অশেষ সওয়াব হাসিল হবে, তাতে আমার কোনও সন্দেহ ও সংশয় নেই।
তিনি বলেন, আপনারা দেশকে, দেশের মানুষকে ভালোবাসবেন। এর চেয়ে খাঁটি ইবাদত আর কী হতে পারে? পিছিয়ে পড়াদের কথা তুলে ধরবেন, যে অঞ্চল পশ্চাদপদ সে অঞ্চলকে পাদপ্রদীপের আলোয় আনবেন।
সবাইকে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, আমার যে সহকর্মীরা রাজধানীর বাইরে থেকে এসেছেন তাদের সকলকে স্বাগত জানাচ্ছি। সুস্বাগতম। আপনাদের প্রত্যেকের প্রতি অফুরন্ত শুভেচ্ছা।
সকলের মিলনকে বসন্তের সঙ্গে তুলনা করে সম্পাদক বলেন, অনেক আগেই আমি যৌবনের সিংহদরজা পেরিয়ে জীবনের সায়াহ্নকালে পৌঁছেছি। অনেক বসন্ত পেরিয়ে আসা মানুষ আমি। আমাদের প্রকৃতিও এখন নিদাঘ গ্রীষ্মের খরতাপে পুড়ছে। বসন্তকাল বিদায় নিয়েছে বেশ আগেই। তবুও আজ আপনাদের সবাইকে নিয়ে এই অনুষ্ঠানে মিলিত হয়ে আমার মনে হচ্ছে, এ যেন এক বসন্তের জলসা। আমাদের এই গৃহে আজ যেন সত্যিকারের বসন্ত উৎসবের দিন। আমি তাই কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের জনপ্রিয় কবিতার একটি পংক্তি ধার করে তার স্বরে বলব: এই দাবদাহে ইট, সিমেন্ট, কংক্রিট আর লোহা- লক্কড়ে তৈরি এ ভবনে ফুল ফুটুক আর না ফুটুক আজ বসন্ত।
জীবনের এই পড়ন্ত বেলায়ও আমার ভেতরে সঞ্চারিত হয় তারুণ্য উল্লেখ করে মারুফ কামাল খান বলেন, ধানের দেশ, গানের দেশ, কবিতা-ছড়া-ছন্দের দেশ, আলপনার দেশ, শিল্পসুষমামণ্ডিত আমার বাংলাদেশের মানুষেরা কিন্তু জাতশিল্পী। তারা ধান কাটে, ধান ভানে, দাঁড় টানে সুরে-ছন্দে-গানে। এই দেশে কান্নারও একটা বেদনামথিত সুর আছে। প্রতিটি কাজ এদেশের মানুষ আনন্দের মধ্য দিয়ে করে এবং কাজের মধ্য দিয়েই তারা আনন্দ উপভোগ করে। এ ভূমির সন্তান হিসেবে আমার অন্তর্লীন বিশ্বাস হচ্ছে, আনন্দের মধ্য দিয়ে কাজ এবং কাজের মধ্যে আনন্দ অনুভব করা। তাই কর্মক্ষেত্রকেও আমি এক পবিত্র আনন্দের স্থল বলে মনে করি। কর্মোপলক্ষে তাই সম্মিলন ও উৎসবের আয়োজনে আমি দারুণ রকম প্রাণবন্ত ও উদ্দীপ্ত হয়ে উঠি। জীবনের এই পড়ন্ত বেলায়ও আমার ভেতরে সঞ্চারিত হয় তারুণ্য।
তিনি বলেন, আজকের এই আয়োজনে আমি উদ্ভাসিত হচ্ছি প্রমত্ত আনন্দে। এমন একটি বড় আয়োজন আমার কল্পনায় ছিল। কিন্তু ছা-পোষা হতদরিদ্র মানুষদের তো সাধ থাকলেও তা পূরণের সাধ্য থাকে না। সে সামর্থ্য এই প্রতিষ্ঠানের যিনি উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারী তার আছে। তিনি রুংধনু গ্রুপের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মো. রফিকুল ইসলাম। বিপুল ব্যয়ের এ আয়োজন তার বদান্যতায় সম্ভব হয়েছে। এজন্য আমি মুক্তচিত্তে তাকে অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জানাই। তিনি এখানে থাকলে ভালো হতো। আমরা তার উপস্থিতিতে আরও উজ্জীবিত হতে পারতাম। যা-হোক আসুন, আমরা সবাই মিলে করতালির মাধ্যমে এই অনুষ্ঠানজুড়ে আনন্দধ্বনি সৃষ্টি করে তাকে মোবারকবাদ জানাই। এই প্রতিষ্ঠানের যিনি উদ্যোক্তা, তার সারথী হচ্ছেন তার দুই সুপুত্র- একজন পত্রিকার প্রকাশক ও রংধনু গ্রুপের এমডি কাউসার আহমেদ অপু এবং আরেকজন গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান মেহেদি হাসান দিপু। এই সুযোগে আমি তাদেরকেও ধন্যবাদ দিই। তাদের দুজনের জন্যও হয়ে যাক একদফা বিপুল করতালি। বাকি আমরা যারা এখানে আছি এবং যারা নানা কারণে শারিরীকভাবে উপস্থিত থাকতে পারেননি - আমাদের সকল সহকর্মীর জন্য আরেকবার করতালি।
পত্রিকা কেমন হবে সে সিদ্ধান্ত নিতে হবে মালিককেই বলে মন্তব্য করে মারুফ কামাল খান বলেন, আমি বিশ্বাস করি কোনও সাংবাদিক বা মিডিয়াকর্মী কিন্তু একটা পত্রিকা ভালো করার ক্ষমতা রাখে না। পত্রিকা ভালো বা মন্দ হয় মালিক ও ম্যানেজমেন্টের কারণে। মালিককেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়, তিনি একটা ভালো পত্রিকা করবেন। এরজন্য তিনি পরিকল্পনা করবেন, অর্থায়ন করবেন, উপযুক্ত সম্পাদক, সাংবাদিক ও বিভিন্ন বিভাগের কর্মী নিয়োগ করবেন। সেখানে ভুল হলে দ্রুত শোধরাবেন। সকলকে সাক্ষী রেখে আজ আমি এই পত্রিকার মালিকপক্ষকে বলতে চাই, যদি একটা ভালো পত্রিকা করতে চান তাহলে পরিকল্পনা করে ফেলুন। সম্পাদক ও অন্যান্য পদে উপযুক্ত লোক না থাকলে, বদলে ফেলুন ও দ্রুত উপযুক্ত লোক আনুন। কাউকে মার্সি কিংবা ফেভার করে ভালো পত্রিকা করা যাবে না। যাকে যেখানে দরকার তাকে সেখানেই দায়িত্ব দিন।
সাংবাদিক পরিচয়েই মৃত্যুবরণ করার প্রত্যাশা করে তিনি বলেন, পরিচিত জনেরা আমাকে নানান পরিচয়ে চেনেন। তবে আমি আমাকে চিনি কেবল একজন সাংবাদিক হিসেবেই। লেখালেখি ও সাংবাদিকতা ছাড়া জীবিকা অর্জনের জন্য অন্য কোনও কৃৎকৌশল আমি শিখিনি। মাঝখানে সাংবাদিকতা-ঘনিষ্ঠ অন্যকিছু দায়িত্ব আমাকে পালন করতে হলেও আমার প্রতীতি হচ্ছে, আমি সাংবাদিক পরিচয়েই মৃত্যুবরণ করতে চাই। তাই সাময়িক বিরতির পর আমি আপন ভুবনে অর্থাৎ সাংবাদিকতার পেশায় ফিরেছি, এই পত্রিকার দায়িত্ব নিয়েছি। আপনাদেরকে সহকর্মী হিসেবে পেয়েছি। এ আমার এক মহার্ঘ জীবন-অভিজ্ঞতা। এ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে না পারলে আমি এক মুহূর্তও এখানে বসে থাকব না। কর্তৃপক্ষকেও বলব, আমার কাজের ধারা পছন্দ না হলে পত্র পাঠ গুড বাই জানিয়ে দেবেন। আমাকে এবং কাউকেই অহেতুক লালন-পালন করার প্রয়োজন নেই।
এক কঠিন সময়ে মিলিত হয়েছি আমরা উল্লেখ করে প্রতিদিনের বাংলাদেশের সম্পাদক বলেন, আমরা এখানে মিলিত হয়েছি এক কঠিন সময়ে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের যুদ্ধ, হানাহানি, সন্ত্রাস, রক্তপাত ও অস্থিরতা আমাদের ভূগোলককে অশান্ত করে রেখেছে। আমরা তা থেকে মুক্ত নই। দারিদ্র, মহামারি, মড়ক, রোগ-শোক, পরিবেশ বিপর্যয়সহ অজস্র সমস্যা-সংকট আমাদেরকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। এরমধ্যে অপশাসনের জঞ্জালের স্তুপ নিয়ে গণতন্ত্রের নবযাত্রা শুরু হয়েছে। কিন্তু পথ কুসুমাস্তীর্ণ নয়, বরং কণ্টকাকীর্ণ। তরুণ-জনতার রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের বিজয় ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পর দেশের মানুষের প্রত্যাশা এখন আকাশছোঁয়া। কিন্তু নিরেট বাস্তব খুবই কঠিন। এ সময় আপনারা সারাদেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন-প্রত্যাশা, সমস্যা-সংকট, ঘটনা-রটনা বাঙ্ময় করে তুলে ধরবেন কালি-কলম-সেলফোন-ল্যাপটপ-ক্যামেরার সহায়তায়। এ কাজে প্রতিটি অঞ্চলে আপনারাই আমাদের দূত বা মেসেঞ্জার।
সাংবাদিকতা এক পরম পবিত্র দায়িত্ব উল্লেখ করে তিনি বলেন, সমস্যা, সংকট, সম্ভাবনা, জীবন-সংগ্রাম, সংস্কৃতি, অন্যায়, অনাচার, অবিচার, দুর্নীতি, প্রতিবাদ সবকিছু আপনাদের লেখায়-রেখায়-ছবিতে-কণ্ঠে ও ভিডিও চিত্রায়নে কলকণ্ঠে কথা কয়ে উঠবে। সমাজের অর্ধেক যে নারীসমাজ তাদের প্রাপ্য হিস্যা থাকতে হবে আপনাদের সংবাদে। মানুষের পাশাপাশি তাদের পরিবেশ-প্রতিবেশ, প্রকৃতি-নিসর্গ, তাদের জীবনযাপন, জীবনাচরণ, তাদের জীবিকা, সম্পদ, গবাদিপশু, পালিত পশুপাখি সব কিছুই হতে পারে সংবাদের তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়বস্তু।
সময়ের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে না জানলে হারিয়ে যাব উল্লেখ করে সম্পাদক বলেন, মনে রাখবেন, যুগ বদলেছে। এখন আর কেবল ছাপা কাগজ পাঠকের সংবাদ-তৃষ্ণা মেটাতে পারে না। এখনকার সংবাদপত্র কেবল ছাপা কাগজ নয়, এটি একটি মাল্টিমিডিয়া। তাকে ইলেকট্রনিক ও সোশ্যাল মিডিয়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হয়। তাই ছাপা ছাড়াও আমাদের কাগজের অনলাইন এডিশন আছে, আছে ই-ভার্সন। প্রতিদিনের বাংলাদেশ ফেসবুক, ইউটিউব, ইন্সটাগ্রাম, টিকটকসহ প্রায় সকল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হাজির আছে। ছাপা কাগজে সংবাদ পাঠানোর পাশাপাশি এইসব ডিজিটাল প্লাটফরমের জন্যও আপনাদেরকে কন্টেন্ট পাঠাতে হবে। একালে মোজো বা মোবাইল জার্নালিজম নামে স্পট রিপোর্টিংয়ের ক্ষেত্রে সাংবাদিকতার নতুন যে চ্যালেঞ্জিং ধারার সূত্রপাত ঘটেছে, সেটা আপনাদেরকে রপ্ত করতে হবে। সময়ের চ্যালেঞ্জ গ্রহন করতে না জানলে আমরা হারিয়ে যাব।
প্রতিনিধিদের সম্বোধন করে মারুফ কামাল খান বলেন, আপনারা কেবল সংবাদকর্মী নন। পত্রিকার সার্কুলেশন, বিজ্ঞাপনসহ সকল ক্ষেত্রেই আপনাদের নিজ নিজ এলাকায় দায়িত্ব আছে। অর্থাৎ আপনার এলাকায় সকল ক্ষেত্রেই আপনি এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি। আপনার এলাকায় পত্রিকার প্রচার, প্রসার ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেও আপনি যদি নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেন তাহলে আপনি এবং প্রতিষ্ঠান উভয়েই লাভবান হতে পারেন বলে আমার ধারণা।
তিনি বলেন, আমরা একটি পরিবার। মিলিত উদ্যোগ, উদ্যম, সৃজনশীল ভূমিকা, পেশাগত নৈপুণ্য এবং শ্রম ও মেধা বিনিয়োজিত করে আমরা প্রভূত উৎকর্ষ সাধন করতে পারি। এর জন্য আমাদের হৃদয় ও কর্মযোগকে এক তন্ত্রীতে বাঁধতে হবে। বেসুরো আওয়াজ নয়, ঐক্যতান সৃষ্টি করতে হবে। আজ থেকে হোক তার সূচনা।
তিনি বলেন, যারা বাইরে থেকে এসেছেন তাদের ঢাকা মিশন সফল ও স্বার্থক হোক। ভ্রমণ হোক নিরাপদ ও আনন্দময়।