টিউলিপ সিদ্দিককে গ্রেপ্তার
তোফাজ্জল হোসেন কামাল
প্রকাশ : ২৫ এপ্রিল ২০২৬ ১১:১৭ এএম
আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০২৬ ১১:১৮ এএম
টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিককে গ্রেপ্তারে ইন্টারপোলের মাধ্যমে ‘রেড নোটিস’ জারির বিষয়ে ঢাকার একটি আদালতের নির্দেশ দেওয়ার দুই মাস পার হতে চলেছে, কিন্তু পুলিশ এখনও আবেদনই জানায়নি ইন্টারপোলের কাছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানার মেয়ে টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিককে গ্রেপ্তারে ইন্টারপোলের মাধ্যমে ‘রেড নোটিস’ জারির বিষয়ে ঢাকার একটি আদালতের নির্দেশ দেওয়ার দুই মাস পার হতে চলেছে, কিন্তু পুলিশ এখনও আবেদনই জানায়নি আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের কাছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আবেদনের প্রক্রিয়া শুরু করলেও সেটি এখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের লাল ফিতায় বন্দি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতামতের অপেক্ষায় আছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। যার ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ পুলিশ।
প্রসঙ্গত, টিউলিপ সিদ্দিক যুক্তরাজ্যের ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির সংসদ সদস্য (এমপি) ও সাবেক মন্ত্রী। তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ পুলিশকে ইন্টারপোলের কাছে আবেদন করতে হলে নানা প্রক্রিয়ায় এগোতে হবে। এছাড়া রেড নোটিস জারির আবেদনের পর দুই দেশের বিদ্যমান কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কেমন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে, তা নিয়েও চলছে নানা বিশ্লেষণ।
পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে শেখ রেহানার নামে রাজউকের ১০ কাঠার একটি প্লট বরাদ্দে অনিয়মের মামলায় গত বছরের ১ ডিসেম্বর রায় দেন ঢাকার একটি আদালত। রায়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পাঁচ বছর, তার বোন শেখ রেহানাকে সাত বছর এবং রেহানার মেয়ে টিউলিপকে দুই বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এর পাশাপাশি টিউলিপসহ তিন আসামিকেই ১ লাখ টাকা জরিমানা অনাদায়ে ছয় মাসের কারাদণ্ডের রায় দেন আদালত। বাংলাদেশের কোনো আদালতে যুক্তরাজ্য তথা বিদেশি কোনো আইনপ্রণেতার বিরুদ্ধে সাজার রায় এটিই প্রথম। এ রায় দেওয়া হয় টিউলিপ সিদ্দিকের অনুপস্থিতিতেই।
যুক্তরাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকায় তার এই সাজা ভোগ করার সম্ভাবনা কম বিধায় টিউলিপকে ইন্টারপোলের মাধ্যমে দেশে ফেরাতেই দুদক আদালতের দ্বারস্থ হয়। আদালত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন। এই নির্দেশ পেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক অনুবিভাগ থেকে বেশ কিছুদিন আগে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতামত চেয়ে চিঠি পাঠায়। সেই চিঠি এখন সেখানে পড়ে আছে বলে জানা গেছে।
এর আগে চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের প্রেক্ষিতে ঢাকা মহানগর সিনিয়র বিশেষ জজ মো. সাব্বির ফয়েজ টিউলিপ সিদ্দিককে গ্রেপ্তারে ইন্টারপোলের মাধ্যমে ‘রেড নোটিস’ জারির ব্যবস্থা নিতে আদেশ দেয়। ওই দিন ‘রেড নোটিস’ জারির আবেদন করেন দুদকের সহকারী পরিচালক একেএম মর্তুজা আলী সাগর।
আবেদনে বলা হয়, টিউলিপ তার খালা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতার অপব্যবহার করেন। তিনি রাজউকের আইন কর্মকর্তাকে প্রভাবিত করেন। অবৈধ সুবিধা দেওয়া-নেওয়ার মাধ্যমে তিনি বিনামূল্যে রাজধানীর গুলশানে ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডের একটি ফ্ল্যাটের দখল বুঝে নেন। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। কিন্তু মামলা করার আগেই তিনি দেশত্যাগ করেন। তিনি মামলা প্রমাণে সহায়ক প্রমাণসহ আলামত বিনষ্ট করার চেষ্টা করছেন। এ কারণে তাকে গ্রেপ্তার করা প্রয়োজন। তবে তিনি ইতোমধ্যে দেশত্যাগ করায় তাকে গ্রেপ্তারের জন্য ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিস জারি করা প্রয়োজন।
এরও আগে চলতি বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর গুলশান-২ এলাকায় ফ্ল্যাট জালিয়াতির অভিযোগে দুদকে করা মামলায় টিউলিপসহ দুজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। দুদকের অভিযোগপত্র গ্রহণ করে সেদিন ঢাকা মহানগর সিনিয়র বিশেষ জজ মো. সাব্বির ফয়েজ এই আদেশ দেন। এ মামলার অপর আসামি হলেন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সাবেক সহকারী আইন উপদেষ্টা সরদার মোশাররফ হোসেন।
অবৈধ সুবিধা নিয়ে ঢাকার গুলশানে ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডের ফ্ল্যাট নেওয়ার অভিযোগে গত বছরের ১৫ এপ্রিল টিউলিপ সিদ্দিক, রাজউকের সাবেক সহকারী আইন উপদেষ্টা শাহ মো. খসরুজ্জামান ও সাবেক সহকারী আইন উপদেষ্টা-১ সরদার মোশারফ হোসেনের বিরুদ্ধে মামলা করেন দুদকের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম। তবে দুদকের সহকারী পরিচালক একেএম মর্তুজা আলী সাগর তদন্ত শেষে দুজনের বিরুদ্ধে চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি অভিযোগপত্র জমা দেন।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, টিউলিপ, মোশাররফ ও খসরুজ্জামান পরস্পর যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিশ্বাস ভঙ্গ ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে কোনো টাকা পরিশোধ না করেই অবৈধভাবে ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডের কাছ থেকে গুলশান-২-এ ২৪৩৬ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট দখলে নেন ও পরে রেজিস্ট্রি করেনÑ যা দুদক আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক অনুবিভাগের একাধিক সূত্র প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, যুক্তরাজ্যের এমপি টিউলিপকে গ্রেপ্তারে ব্যবস্থা নিতে আদালতের নির্দেশ যথাযথ প্রক্রিয়ায় পাওয়ার পর সেটি নিয়ে কাজ শুরু করা হয়। মতামত চেয়ে এই বিভাগ থেকে এক মাসেরও বেশি সময় আগে একটি চিঠি পাঠানো হয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। কিন্তু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এখনও কোনো মতামত না পাওয়ায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
জানতে চেয়ে গত সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম ভুইয়ার মোবাইলে একাধিকবার কল করা হলে শেষোক্তবার তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, তিনি একটি অনুষ্ঠানে আছেন, যা বলার সংক্ষেপে বলতে হবে। টিউলিপ সিদ্দিকের প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে এই কর্মকর্তা জানান, এ বিষয়ে তিনি কিছু বলতে পারছেন না। আর কে এ বিষয়টি দেখেন, তাও তার জানা নেই। পরদিন খোঁজ নেবেন Ñএ কথা জানিয়ে তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
এরপর গত মঙ্গলবার মোবাইল ফোনে জনসংযোগ কর্মকর্তাকে পুনরায় কল করা হলে তিনি এ ব্যাপারে কিছু জানাতে অপারগতা প্রকাশ করে জানান, ইউরোপ শাখা এই বিষয়টি দেখতে পারে। সংশ্লিষ্ট শাখায় খোঁজ নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি হোয়াটসঅ্যাপে অনির্বাণ নিয়োগী নামের এক কর্মকর্তার মোবাইল ফোন নম্বর পাঠান। পূর্ব ইউরোপ ও সিআইএস অনুবিভাগের পরিচালক অনির্বাণ নিয়োগীর সঙ্গে কথা বললে তিনি জানান, টিউলিপের বিষয়টি তার কাছে আসেনি। তবে মন্ত্রীর পিএস পরিচালক জাকির আহমেদ এ সম্পর্কে বলতে পারবেন।
পরিচালক জাকির আহমেদকে দুই দিনে দুবার কল করা হলে শেষবার তিনি রিসিভ করে আফ্রিকায় থাকার কথা জানান। তিনি বলেন, ‘কিছুক্ষণের মধ্যেই মিটিং হবে। তাই সংক্ষেপে বলতে হবে।’ এ সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাঠানো চিঠি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পরিচালক জাকির আহমেদ বলেন, বিষয়টি তার জানা নেই। তিনি পূর্ব ইউরোপ ও সিআইএস অনুবিভাগের মহাপরিচালক মোশারফ হোসেনের সাথে এ বিষয়ে কথা বলার পরামর্শ দেন। তিনি আরও বলেন, ‘বিষয়টি আইনসম্পৃক্ত, তাই লিগ্যাল অ্যাফেয়ার্স অনুবিভাগের মহাপরিচালক ড. জাকেরুল আবেদীনের সঙ্গে কথা বলে দেখতে পারেন।’
ড. জাকেরুল আবেদীনের সঙ্গে গত বুধবার দুই দফায় মোবাইলে কথা বলার চেষ্টা করা হয়। সন্ধ্যায় তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমার যতটুকু মনে পড়ে, এ ধরনের কোনো চিঠি আমার এখানে আসেনি।’ +তিনি পরদিন বৃহস্পতিবার (গতকাল) যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।
ড. জাকেরুলের পরামর্শ অনুসারে তার দেওয়া সময়সীমা অনুসারে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে তিনবার ফোন করা হয়। তৃতীয় দফায় ফোন রিসিভ করে তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, তার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দাপ্তরিক কাজে ব্যস্ত। তারপর তিনি নোট রাখার জন্য এ প্রতিবেদককে কতিপয় প্রশ্ন করেন। উত্তর দেওয়া হলে তিনি বলেন, ‘আপনি ইউরোপ বিষয়ক বিভাগে যোগাযোগ করতে পারেন।’ সেখানে যোগাযোগ করা হয়েছে বলা হলে তিনি বলেন, ‘আপনার দেওয়া নোট রাখলাম। আপনি নিশ্চিত থাকেন যে, আমরা এটা অনুসন্ধান করে আপনাকে সঠিক তথ্য দেওয়ার চেষ্টা করব। তার আগে একটু সিনিয়র কর্মকর্তার সঙ্গে কথাও বলে নিতে হবে।’ এরপর কয়েক দফা ফোন করেও তাকে পাওয়া যায়নি। বিকালে মিটিংয়ে আছেন জানিয়ে মোবাইলে মেসেজ পাঠান তিনি। সন্ধ্যা ৭.০৯ মিনিটের দিকে ফোন করে তিনি এ প্রতিবেদককে প্রশ্ন করে বলেন, ‘আপনার সঙ্গে আমার পরিচালক কথা বলেননি? আপনার সঙ্গে কথা বলার জন্য আমি তো তাকে বলে দিয়েছিলাম।’ তিনি সারা দিনের ব্যস্ততার কথা জানিয়ে বলেন, এ ধরনের কাগজপত্রগুলো থাকে রেকর্ড রুমে। কিন্তু সেখানকার সংশ্লিষ্ট দুজন কর্মকর্তাই বাইরে ছিলেন। এ কারণে রেকর্ড দেখা সম্ভব হয়নি। আগামী রবিবার চেক করে দেখা হবে এ ধরনের কোনো কাগজপত্র এসেছে কি না। তিনি আবারও জানান, এরপর সিনিয়র কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে।
উল্লেখ্য, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দুর্নীতির নানা অভিযোগ নিয়ে যুক্তরাজ্যে চাপের মধ্যে রয়েছেন লেবার পার্টির এমপি টিউলিপ সিদ্দিক। তার বিরুদ্ধে লন্ডনে বাড়ি সংক্রান্ত দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, যার সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতাদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
চব্বিশের গণভ্যুত্থানের আগে যুক্তরাজ্যে লেবার পার্টির নেতা কিয়ার স্টারমার সরকার গঠনের পর তার মন্ত্রিসভায় সিটি মিনিস্টার করেছিলেন টিউলিপকে। কিন্তু দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর টিউলিপকে পদত্যাগ করতে হয়। ৪৩ বছর বয়সী টিউলিপ অবশ্য তার বিরুদ্ধে আনা দুর্নীতির সব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছেন। বাংলাদেশে দুদকের এ মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর তিনি বলেছিলেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনের হ্যাম্পস্টিড অ্যান্ড হাইগেট আসনের এমপি টিউলিপ সপরিবারে সেখানেই বসবাস করছেন। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এই ব্রিটিশ নাগরিক ২০১৫ সালে প্রথম এমপি হন। তারপর এ নিয়ে চতুর্থবার হাউস অব কমনসে প্রতিনিধিত্ব করছেন তিনি।