প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০২৬ ২১:৪৪ পিএম
ঢাকার বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) কার্যালয়ে ‘মানব স্বাস্থ্য ও পরিবেশের উপর ব্যবহৃত রান্নার তেলের ক্ষতিকর প্রভাব’ শীর্ষক সেমিনার সোমবার অনুষ্ঠিত হয়। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
প্রতিবছর ২ লাখ ৭৮ হাজার মানুষের মৃত্যুর কারণ শিল্পজাত ট্রান্স ফ্যাট গ্রহণ, যা ট্রান্সফ্যাট রক্তনালিতে জমে গিয়ে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ায়। বাংলাদেশে প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় ৫৯ জন হৃদরোগে মারা যায়, এবং এদের মধ্যে প্রায় ৪% মৃত্যুর সঙ্গে ট্রান্স ফ্যাট ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অথচ দেশের বেকারি ও রেস্তোরার খাবারে এর পরিমাণ ১০ শতাংশ।
ঢাকার বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) কার্যালয়ে ‘মানব স্বাস্থ্য ও পরিবেশের উপর ব্যবহৃত রান্নার তেলের ক্ষতিকর প্রভাব’ শীর্ষক সেমিনারে সোমবার এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
যৌথভাবে সেমিনারটির আয়োজন করে বিএফএসএ ও মুনজের।
এতে প্রধান অতিথি ছিলেন বিএফএসএর চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার, এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিএফএসএ সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব।
বিএফএসএর এক গবেষণায় উঠে এসেছে, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সংগৃহীত ভোজ্যতেলের নমুনা পরীক্ষা করে দেখা গেছে সেখানে সয়াবিন তেলের ১১টির মধ্যে ৭টি (৬৩%), ডালডার ৯৫টির মধ্যে ৯৩টি (৯৭%), মাখনের ৩০টির মধ্যে ২৬টি (৮৬%) এবং মার্জারিনের ১৪টির মধ্যে ৬টি (৪২%) নমুনায় ট্রান্সফ্যাটের মাত্রা নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি।
বিএফএস জানায়, ট্রান্স ফ্যাটি অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা ২০২১” অনুযায়ী প্রাকৃতিক উৎস ব্যতীত ট্রান্সফ্যাটের সর্বোচ্চ সীমা ২% নির্ধারণ করা হয়েছে, যা ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর। এই বিধান সব ধরনের প্রক্রিয়াজাত, প্যাকেটজাত ও প্রস্তুত খাবারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
সংস্থাটি জানায়, হোটেল-রেস্তোরাঁয় তদারকিতে প্রায়ই একই তেল বারবার ব্যবহার করার প্রবণতা ধরা পড়ে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। রমজান মাসে ৭২০টি মনিটরিং কার্যক্রম
পরিচালনার তথ্য তুলে ধরে বিএফএসের উপপরিচালক রুহুল আমিন বলেন, অনেক ব্যবসায়ী আমাদের সঙ্গে সহযোগিতা করেছেন। আমরা তাদের ব্যবহৃত তেল কীভাবে নিরাপদে নিষ্পত্তি করতে হবে এবং এর অর্থনৈতিক সুবিধাও রয়েছে—সে বিষয়ে অবহিত করেছি।
মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, পোড়া তেল ব্যবহার না করা থেকে আমাদের বিরত থাকতে হবে। এজন্য পোড়া তেল ব্যবহার না করতে প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের মধ্যে প্রচারণা চালাতে হবে। তিনি বলেন, প্রতিদিন আমাদের খাদ্যে ২০০০ ক্যালরি দরকার হয়। গ্রামের মানুষের সেই ক্যালরি আসে কার্বোহাইহেড থেকে।
তিনি বলেন, আমরা খুব ভাগ্যবান যে এই পৃথিবীতে বসবাস করার সুযোগ পেয়েছি। অন্য কোনো গ্রহ বসবাসের জন্য এতোটা উপযুক্ত না। আমরা যদি সুস্থভাবে জীবন-যাপন করতে চাই, তাহলে অবশ্যই পোড়াতেলের ব্যবহার বাদ দিতে হবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিএফএসএর চিফ সাইন্টিফিক ড. মো. মোস্তফা বলেন, একবারে কালো তেলের রং দেখে পোড়া তেল ব্যবহার বাদ দিতে হবে। তিনি বলেন, ৮ বিভাগে আমাদের ৮টি মোবাইল ল্যাব রয়েছে সেখ্নে পরীক্ষা করা যায়। আমাদের দেশে ২৭ গ্রাম তেল ও ৫ শতাংশ ট্রান্স ফ্যাট খাই।
মুক্ত আলোচনায় মুয়েঞ্জার বাংলা প্রাইভেট লিমিটেডর ডেপুটি ম্যানেজার তানভির আহমেদ বলেন, প্রতি মাসে অন্তত ৩ বার করে তেল সংগ্রহ করা হয়। সাধারণত ৫-৭ লিটার তেল সংগ্রহ করা হয়। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল এন্ড রিচার্স ইন্সটিটিউটের অ্যাসিস্টেন্ট সায়েন্টিস্ট ড. আহমেদ খায়রুল আবরার বলেন, পোড়া তেল ক্যান্সারের সৃষ্টি হয়। কোন তেলে ২-৩ বারের বেশি ব্যবহার করলে স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
সেমিনারে জার্মান প্রতিষ্ঠান মুয়েঞ্জার জানায়, রান্নার তেল ১৮০–২০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় বারবার ব্যবহার করলে এতে রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে এবং বিষাক্ত যৌগ তৈরি হয়। এসব উপাদান হৃদরোগ, ক্যান্সারসহ নানা দীর্ঘমেয়াদি রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত। বাংলাদেশে ট্রান্সফ্যাট তৈরির প্রধান উৎস— আংশিক হাইড্রোজেনেটেড তেল (ডালডা/ভ্যানাস্পতি), একই তেল বারবার ব্যবহার।
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব জানান, বেকারি ও রেস্তোরাঁয় ব্যবহৃত এসব তেলে ট্রান্সফ্যাটের পরিমাণ ১০% এরও বেশি হতে পারে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমার (২%) অনেক উপরে। তিনি বলেন, প্রতিবছর ২ লাখ ৭৮ হাজার মানুষের মৃত্যু শিল্পজাত ট্রান্স ফ্যাট গ্রহণের কারণে ঘটে।
ট্রান্সফ্যাট রক্তনালিতে জমে গিয়ে হার্ট এটাকের ঝুঁকি বাড়ায়। গবেষণায় দেখা যায়- বাংলাদেশে প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় ৫৯ জন হৃদরোগে মারা যায় এবং এদের মধ্যে প্রায় ৪% মৃত্যুর সাথে ট্রান্স ফ্যাট ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
অর্থনৈতিক কারণ ও বড় ঝুঁকি সম্পর্কে তিনি বলেন, কম খরচের কারণে অনেক পথখাবার বিক্রেতা একই তেল বহুবার ব্যবহার করেন। দেশে প্রতিবছর ১ লাখ টনের বেশি ব্যবহৃত তেল উৎপন্ন হয়, যার বড় অংশ অবৈধভাবে আবার খাদ্যচক্রে প্রবেশ করে—যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি।
পরিবেশের উপর প্রভাব নিয়ে ড. মোহাম্মদ শোয়েব কলেন, গৃহস্থালি পর্যায়েও ব্যবহৃত তেল অতিরিক্ত ব্যবহার, নতুন তেলের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলা কিংবা ড্রেনে ফেলে দেওয়ার কারণে পরিবেশ দূষণ ও ড্রেনেজ জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
মুয়েঞ্জার জানায়, তারা বছরে প্রায় ১৬ মেট্রিক টন ব্যবহৃত তেল সংগ্রহ করে। তবে ২০২৩ সালের এপ্রিল-জুন সময়েই প্রায় ৮৫ মেট্রিক টন পোড়া তেল সংগ্রহ করা হয়। অধিকাংশ হোটেল-রেস্তোরাঁ থেকে অন্তত ১০০ মেট্রিক টন ব্যবহৃত তেল সংগ্রহের সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানানো হয়।
সচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে মুয়েঞ্জারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এভাল্ড-মার্কাস বলেন, স্বাস্থ্য হাসপাতাল থেকে শুরু হয় না, শুরু হয় আমাদের দৈনন্দিন জীবন—বিশেষ করে রান্নাঘর থেকে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তদারকি জোরদার ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।