হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:৫৬ পিএম
অপারেটর নিয়োগ জটিলতায় গত দুই বছরেও চালু করা সম্ভব হয়নি সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং প্রকল্প। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
দেশের জ্বালানি খাতে আধুনিকতার নতুন দিগন্ত খুলে দেওয়ার কথা ছিল ‘সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং’ (এসপিএম) প্রকল্পের মাধ্যমে। এর মাধ্যমে বড় জাহাজে আনা ১ লাখ ২০ হাজার টন জ্বালানি তেল মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় বহির্নোঙর থেকে পাইপলাইনে খালাসের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রায় ৮ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই মেগা প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার পরও অপারেটর নিয়োগ জটিলতায় গত দুই বছরেও চালু করা সম্ভব হয়নি। ফলে জ্বালানি সংকটের এই সময়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোটি কার্যত ‘অচল’ হয়ে আছে।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এসপিএম চালুর প্রধান বাধা পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের (ওঅ্যান্ডএম) জন্য অপারেটর নিয়োগ। শুরুতে ঠিকাদার চীনা প্রতিষ্ঠানকেই সরাসরি এই দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার সেই পরিকল্পনা বাতিল করে প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের সিদ্ধান্ত নেয়।
গত বছরের ৩০ এপ্রিল প্রথম দফায় দরপত্র ডাকা হলেও পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে পূর্ণ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত না হওয়ায় তা বাতিল করা হয়। পরে ডিসেম্বরে পরামর্শক সংস্থা আইএলএফ কনসাল্টিংয়ের সহযোগিতায় দরপত্র দলিল প্রস্তুত করে আবারও দরপত্র আহ্বান করা হয়। কিন্তু নানা জটিলতায় সেই প্রক্রিয়া এখনও শেষ করা সম্ভব হয়নি।
এ সম্পর্কে জানতে পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা কেউ মন্তব্য করতে রাজি হননি।
গতানুগতিক পদ্ধতি সময়সাপেক্ষ, ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল হওয়ায় গভীর সমুদ্র থেকে সরাসরি পাইপলাইনে জ্বালানি তেল সরবরাহের জন্য ২০১৫ সালে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্প নেয় ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড। শুরুতে তিন বছরের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা থাকলেও পরে দুই দফায় সময় বাড়ানো হয়। তৃতীয় সংশোধনী অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন মেয়াদ শেষ হয় ২০২৩ সালের ৩০ জুন। এরপর চতুর্থ দফায় আরও এক বছর মেয়াদ বাড়ানো হয়। চতুর্থ দফায় বাড়ানো মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ২০২৪ সালের মার্চ মাসে প্রকল্পটি কমিশনিংয়ের কাজ শেষ হয়। কিন্তু এরপর দুই বছরের বেশি সময় পার হলেও প্রকল্পটি চালু করতে পারেনি বিপিসি। প্রকল্পটি পরিচালনার জন্য অপারেটর নিয়োগ দিতে না পারায় কমিশনিংয়ের পরও এতদিন অলস ফেলে রাখা হয়।
অথচ প্রকল্পটি চালু হলে সময় এবং অর্থ দুটোই সাশ্রয় হতো। প্রকল্প নিরীক্ষায় বলা হয়েছিল, এটি বাস্তবায়ন হলে তেল পরিবহনে বছরে সাশ্রয় হবে ৮০০ কোটি টাকা। গতানুগতিক পদ্ধতিতে ১ লাখ ২০ হাজার টন জ্বালানি তেল বহির্নোঙর থেকে খালাস করতে যেখানে ১১ দিন সময় লাগছে, সেখানে প্রকল্পটি চালু হলে এই পরিমাণ তেল বহির্নোঙর থেকে পাইপলাইনে খালাস করতে সময় লাগবে মাত্র ৪৮ ঘণ্ট। কিন্তু ৮ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা খরচ করে এটি বাস্তবায়ন করা হলেও শুধু অপারেটর নিয়োগ না হওয়ায় প্রকল্পটি চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। প্রকল্পটির অধীনে মহেশখালীতে পাম্পিং স্টেশন ও ট্যাংক ফার্ম (পিএসটিএফ) এলাকায় ৬টি স্টোরেজ ট্যাংক ২ লাখ ৪০ হাজার টন জ্বালানি তেল মজুদের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। প্রকল্পটি চালু না হওয়া জ্বালানি মজুদের এই সুযোগটিও কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
২০২৪ সালের মার্চে প্রকল্পের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান সিপিপিইসিকে প্রকল্পের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার কথা ছিল। এ বিষয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনাও এগিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই আলোচনা থেমে যায়। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করে।
বিপিসি সূত্রে জানা যায়, অপারেটর নিয়োগের জন্য ২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল ওয়ান স্টেজ টু এনভেলপ টেন্ডারিং মেথড (ওএসটিইটিএম) পদ্ধতিতে আন্তর্জাতিক দরপত্র প্রকাশ করে বিপিসি। ওইদিন শুরু হওয়ার পর ১৮ মে পর্যন্ত দরপত্র বিক্রি করা হবে। এরপর ১৯ মে দরপত্র খোলা হবে।
অপারেশন অ্যান্ড মেনটেন্যান্স (কিউঅ্যান্ডএম) সার্ভিসেস অ্যান্ড মেরিন সার্ভিস ফর দ্য বিপিসি ইনস্টলেশন সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং উইথ ডাবল পাইপলাইন সিস্টেম শিরোনামে আহ্বান করা দরপত্রে শর্ত হিসেবে সাত বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। দরপত্রে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক টার্নওভার কমপক্ষে ২৫ মিলিয়ন ডলার হতে হবে। জয়েন্ট ভেঞ্চারে অংশীদার দুজন থাকতে হবে। কিন্তু পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে পূর্ণ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত না হওয়ায় গত নভেম্বরে তা বাতিল করা হয়।
পরে ডিসেম্বরে পরামর্শক সংস্থা আইএলএফ কনসাল্টিংয়ের সহযোগিতায় দরপত্র দলিল প্রস্তুত করে আবারও দরপত্র আহ্বান করা হয়। দুই দফা মেয়াদ বৃদ্ধির পর সর্বশেষ গত ১৭ ফেব্রুয়ারি উন্মুক্ত করা হয়। কিন্তু নানা কারণে এই দরপত্র মূল্যায়নের প্রক্রিয়াও এখনও শেষ করা সম্ভব হয়নি।
প্রকল্প প্রস্তাবনা সূত্রে জানা যায়, ‘ইনস্টলেশন অব সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) উইথ ডাবল পাইপলাইন’ শীর্ষক প্রকল্পটি বাংলাদেশ সরকার এবং চীন সরকারের মধ্যে জিটুজি ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা হয়। এ প্রকল্পের আওতায় মহেশখালী দ্বীপের পশ্চিমে (বঙ্গোপসাগরে) একটি এসপিএম তথা ভাসমান জেটি স্থাপন করা হয়। প্রকল্পের অধীনে নির্মিত ভাসমান জেটি থেকে চট্টগ্রাম নগরীর পতেঙ্গা এলাকায় ইস্টার্ন রিফাইনারি পর্যন্ত পাইপলাইন স্থাপনের পাশাপাশি মহেশখালীতে প্রকল্পের পাম্পিং স্টেশন ও ট্যাংক ফার্ম (পিএসটিএফ) এলাকায় ৬টি স্টোরেজ ট্যাংক এবং অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। মহেশখালীর ধলঘাটায় একটি এবং চট্টগ্রামের গহিরা ও ডাঙ্গারচরে দুটি ব্লক ভালভ স্টেশন এবং চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে মাইক্রোয়েভ রিলে টাওয়ারের নির্মাণ করা হয়। প্রকল্পটি চালু না হওয়ায় এসব স্থাপনাও এখন অযত্ন-অবেহলায় পড়ে আছে।