প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:২৪ এএম
সংকট কাটছে না জ্বালানি তেলের। পেট্রল পাম্পের দীর্ঘ সারি বহাল আছে। এরই মধ্যে রাজধানীর পরিবাগে পাম্পে তেল নেওয়ার জন্য জেনারেটর নিয়ে হাজির হতে দেখা যায় দুজনকে। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের ফলে আমদানিনির্ভর জ্বালানি খাতে চলমান সরবরাহ সংকটের মধ্যেই তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ঊর্ধ্বগতি এবং আমদানি খরচ সমন্বয় করার লক্ষ্যে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। রবিবার থেকে সারা দেশে নতুন মূল্য কার্যকর হয়েছে। তবে সংবেদনশীল পণ্য হিসেবে পরিচিত জ্বালানি তেলের এই মূল্য বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত জনজীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলতে চলেছে। কৃষি, পরিবহন ও বিদ্যুৎ খাত এবং উৎপাদনশীল শিল্পসহ সবখানেই এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এর ফলে জনদুর্ভোগ আরও বাড়বে এবং অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে। একই সঙ্গে ভোগান্তি বাড়বে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষেরÑ যারা মোট জনসংখ্যার বড় অংশ। অন্যদিকে ভোক্তা পর্যায়ে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম বৃদ্ধির ঘোষণাও এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করবে।
এদিকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, ‘এটা করতে বাধ্য হয়েছি আমরা, কারণ এটা বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে কিনতে হয়। তাই দাম কিছুটা বাড়িয়ে যাতে সহনীয় জায়গায় থাকতে পারি, সেই ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ যুদ্ধে শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বে প্রভাব পড়েছে। দাম বাড়ার পরও ভর্তুকি আছে। তবে ভর্তুকির হিসাব মন্ত্রণালয় পরে দিতে পারবে। বৈশ্বিক এই চাপের মধ্যেও ভোক্তাদের স্বস্তি দিতে দেশে তেলের দাম খুব সামান্য বাড়ানো হয়েছে।’
এর আগে গত শনিবার রাতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয় সরকার। চার ধরনের তেলের নতুন দর লিটারপ্রতি আগের চেয়ে সর্বনিম্ন ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়, যা গতকাল রোববার থেকেই কার্যকর হয়েছে। ডিজেলের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা, অকটেন ১৪০, পেট্রোল ১৩৫ এবং কেরোসিন ১৩০ টাকা। এতে করে লিটারপ্রতি ডিজেলের দাম বেড়েছে ১৫ টাকা (আগের দর ১০০ টাকা), অকটেন বেড়েছে ২০ টাকা (আগের দর ১২০), পেট্রোল বেড়েছে ১৯ টাকা (আগের দর ১১৬) এবং কেরোসিন বেড়েছে ১৮ টাকা (আগের দর ১১২)।
জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়ার পর পরই গতকাল রোববার ভোক্তা পর্যায়ে সরকারের পক্ষ থেকে চলতি মাসে দ্বিতীয় বারের মতো বেসরকারি খাতের এলপিজির দামও বাড়ানো হয়। এবার প্রতি কেজিতে বেড়েছে ১৭ টাকা ৬২ পয়সা। এর আগে এপ্রিলের শুরুতে বেড়েছিল ৩২ টাকা ৩০ পয়সা। এতে বাজারে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের নতুন দাম ১ হাজার ৭২৮ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৯৪০ টাকা। ১২ কেজিতে দাম বেড়েছে ২১২ টাকা। বাসাবাড়িতে রান্নার কাজে ব্যবহৃত এই এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খরচও বাড়বে।
দাম বেড়েছে ৯৫ দেশে
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের ফলে জ্বালানি করিডোর হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালী ও মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো আমদানিনির্ভর হওয়ায় এ অঞ্চলে এর সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে। এখন পর্যন্ত ৯৫টিরও বেশি দেশে জ্বালানির দাম বেড়েছে বলে জানা গেছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তানে সবচেয়ে বেশিÑ প্রায় ৪০ শতাংশ মূল্য বাড়ানো হয়েছে। তবে জনগণকে স্বস্তি দিতে সেখানে গণপরিবহনে চলাচল ফ্রি করে দেওয়া হয়েছে। ভারত কর কমিয়ে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার পন্থা অবলম্বন করেছে।
সর্বগ্রাসী সংকটের মুখে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৬৩ শতাংশই ডিজেলনির্ভর। পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতের মূল চালিকাশক্তি এই জ্বালানি। রাজধানী থেকে শুরু করে প্রান্তিক কৃষিজমিÑ সর্বত্রই জ্বালানি তেলের জন্য হাহাকার ও দীর্ঘ অপেক্ষা তাই গভীর সংকট সৃষ্টি করতে চলেছে। ডিজেল-সংকটের ফলে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক খাতের উৎপাদনসক্ষমতা ২৫-৩০ শতাংশ কমে গেছে বলে উদ্যোক্তারা দাবি করছেন। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক অবস্থা দেখা দিয়েছে কৃষি খাতে। বোরো আবাদের ভরা মৌসুমে সেচযন্ত্রের ডিজেলের জন্য পাম্পে পাম্পে ড্রাম নিয়ে কৃষকরা দিনরাত অপেক্ষা করছে। কিন্তু সরবরাহ-শৃঙ্খলে বড় ধরনের ফাটল ধরায় তাদের কাছে ডিজেল পৌঁছাচ্ছে না।
বোরো মৌসুমে দেশের ৬০ শতাংশ খাদ্য উৎপাদন হয়। পুরোপুরি সেচনির্ভর বোরো আবার ডিজেলনির্ভর। ডিজেল লিটারে ১৫ টাকা বৃদ্ধির ফলে এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে কৃষিতে। কেরোসিনের দাম বেড়েছে প্রতি লিটারে ১৮ টাকা। এর ফলে কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। খাদ্য সংকট তৈরির আশঙ্কাও করছেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা।
এ ব্যাপারে কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘এমনতিই আমাদের দেশে দীর্ঘদিন ধরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি তুঙ্গে। তারপর আবার জ্বালানির দাম বৃদ্ধি করায় চলতি বোরো মৌসুমে খাদ্য উৎপাদন কমে যাবে। কেননা অনেক জায়গায় সেচের প্রয়োজন হবে। কিন্তু বেশি টাকা ব্যয় ও জ্বালানি না পেয়ে সঠিক সময়ে সেচ দিতে পারবে না। এতে উৎপাদন কমবে। তা ছাড়া আউশ ও আমন এবং রবিশস্যেও এর নেতিবাচক প্রভাবের কারণে খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে।’
কৃষি অর্থনীতিবিদ ও শেরে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. রিপন কুমার মন্ডল বলছেন, ‘মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও পোল্ট্রি খাতে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কেননা জ্বালানির দাম বাড়লে বিদ্যুতের দামও বাড়ে এবং সামগ্রিকভাবে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। বড় চাষি ও খামারিরা এ সংকট কাটিয়ে উঠতে পারলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি চাষিÑ খামারিরা বিপদে পড়বেন। কারণ অতিরিক্ত ব্যয় বহনের সক্ষমতা তো সকলের নেই।’
গণপরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধির প্রস্তাব
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়বে পরিবহন সেক্টরে। বিশেষ করে গণপরিবহন ও রাইট শেয়ারিংয়ের মতো গণবাহনগুলোতে বাড়তি ভাড়া পরিশোধ করতে হবে সাধারণ মানুষকে। এরই মধ্যে ভাড়া বাড়ানোর জন্য বাস মালিক সমিতি বৈঠক করেছে। গত রবিবার থেকেই দেশের সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি কার্যকর হওয়ায় দ্রুত বাস ও লঞ্চ ভাড়া বাড়ানোর আবেদন করেছে সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম গতকাল গণমাধ্যমকে বলেন, ‘মালিকপক্ষ বৈঠকে নতুন ভাড়ার প্রস্তাব দেবে।’ তিনি দাবি করেন, ‘ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে দ্রুত ভাড়া সমন্বয় প্রয়োজন।’
পরিবহন মালিক সমিতির প্রস্তাব অনুযায়ী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ মহানগরীগুলোতে বাস ভাড়া ৬৪ শতাংশ এবং দূরপাল্লার বাসে ৩৭ শতাংশ ভাড়া বাড়াতে চান মালিকরা। এদিকে অভ্যন্তরীণ নৌপথে যাত্রীবাহী লঞ্চের ভাড়া ৩৬ থেকে ৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল যাত্রী পরিবহন (যাপ) সংস্থা। প্রস্তাব অনুযায়ী ১০০ কিলোমিটারের কম ও বেশি উভয় দূরত্বে কিলোপ্রতি এক টাকা ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব ইতোমধ্যেই অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) কাছে পাঠিয়েছে সংস্থাটি। এ ছাড়া যাত্রীপ্রতি সর্বনিম্ন ভাড়া ২৯ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩৫ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বাস মালিক সমিতির দেওয়া একটি খসড়া প্রস্তাবের ভিত্তিতে গতকাল সন্ধ্যায় (এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত) ভাড়া নির্ধারণ কমিটির জরুরি বৈঠক চলছিল। এদিকে গণপরিবহনে ভাড়া না বাড়ানোর জন্য সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।
এদিকে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির যে সিদ্ধান্ত সরকার নিয়েছে, তাতে মূল্যস্ফীতি বাড়বে কি না, তা নিরূপণের বিষয়টি ‘সময়ের ওপর’ ছেড়ে দিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। মূল্যস্ফীতির বিষয়টিকে চাহিদা ও সরবরাহনির্ভর বিষয় হিসেবে বর্ণনা করে তিনি বলেন, ‘বাড়তে পারে, আবার নাও বাড়তে পারে। এটা সময়ের ওপর নির্ভর করে।’ দাতা সংস্থার চাপে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়নি বলেও মন্তব্য করেন অর্থমন্ত্রী।