× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পুলিশের চার স্তরে গোয়েন্দা সংস্থার ‘নীরব তদন্ত’

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৪১ এএম

আপডেট : ১৮ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৪৮ এএম

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ছবি: সংগৃহীত

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ছবি: সংগৃহীত

দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ওপর নীরব কিন্তু বিস্তৃত এক তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পুলিশের ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি, পুলিশ সুপার (এসপি) এবং থানা পর্যায়ের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)Ñ এই চার স্তরের কর্মকর্তাদের অতীত ভূমিকা, পদায়ন প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে সরকারের নির্দেশে কাজ করছে দুটি প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন ইউনিটে পাঠানো গোপন নির্দেশনায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিগত কর্মকালীন কর্মকাণ্ড, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন এবং রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে।

সরকারের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে ‘অদৃশ্য প্রভাব’ চিহ্নিত করার উদ্যোগের অংশ হিসেবেই এই তদন্ত শুরু হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের পদায়ন নিয়ে বিতর্ক

সূত্র জানাচ্ছে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের অনুগত হিসেবে বিবেচিত কর্মকর্তাদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হয়েছিল। রেঞ্জ, জেলা, থানা এবং বিশেষ ইউনিটগুলোতে এসব পদায়ন নিয়ে তখন থেকেই প্রশাসনের ভেতর ও বাইরে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। বিশেষ করে নির্বাচনের এক মাস পূর্বে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো অভিযোগ তোলে, নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পরিকল্পিতভাবে মাঠপর্যায়ে ও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে পক্ষপাতদুষ্ট কর্মকর্তাদের বসানো হয়েছে। সংসদ নির্বাচনকালে এবং তার আগে বিভিন্ন এলাকায় নির্দিষ্ট একটি রাজনৈতিক দলের প্রতি পুলিশের সহানুভূতিশীল আচরণ নিয়েও অভিযোগ ওঠে। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছিল।

নির্বাচনের ফল ও পাল্টে যাওয়া প্রেক্ষাপট

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বিপুল ভোটে জয়লাভ করে। ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হয়। এর পরপরই প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে ‘পক্ষপাতমূলক প্রভাব’ দূর করার বিষয়টি গুরুত্ব পেতে শুরু করে। কারণ নতুন সরকারের কাছে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

কীভাবে চলছে নীরব গোয়েন্দা তদন্ত

সূত্র জানাচ্ছে, এ কার্যক্রমটি মূলত দুই স্তরে পরিচালিত হচ্ছে। প্রথমত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত, বিশেষ করে রেঞ্জ ডিআইজি, এসপি ও ওসিদের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালীন দায়িত্ব পালন; আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং রাজনৈতিক কর্মসূচির সময় তাদের ভূমিকাও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, তাদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত নেটওয়ার্কÑ যেমন কার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল বা আছে, কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল কি না কিংবা কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর প্রতি ঝোঁক ছিল কি নাÑ সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ বিষয়ও যাচাই করা হচ্ছে।

গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মাঠপর্যায়ে গোপন অনুসন্ধানের পাশাপাশি বিভিন্ন তথ্যপ্রযুক্তি-নির্ভর পদ্ধতিও ব্যবহার করছে। সামাজিক মাধ্যমে কার্যক্রম, কল রেকর্ডÑ এমনকি কিছু ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেনের তথ্যও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

পুলিশ প্রশাসনে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা

এই তদন্ত কার্যক্রমের প্রভাব ইতোমধ্যে পুলিশের ভেতরে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, যারা মাঠপর্যায়ে কাজ করেন, অনেক সময় তাদের পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এখন সেই সিদ্ধান্তগুলো রাজনৈতিকভাবে ব্যাখ্যা করা হলে সমস্যায় পড়তে পারেন তারা।

ট্যাগের রাজনীতি ও অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেট

এদিকে তদন্তের মধ্যেই অভিযোগ উঠেছে, একটি সুবিধাভোগী গোষ্ঠী নিজেদের অবস্থান রক্ষায় অঘোষিত সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে। এই গোষ্ঠীটি গোয়েন্দাদের কাছে সহকর্মীদের ‘আওয়ামী লীগ ঘরানা’ বা ‘জামায়াতপন্থী’ হিসেবে চিহ্নিত করছে এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্য দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তারা ব্যক্তিগত বা পেশাগত প্রতিযোগিতাকে রাজনৈতিক রঙ দিচ্ছে। ফলে দলনিরপেক্ষ বা পেশাদার কর্মকর্তারাও ট্যাগিংয়ের শিকার হচ্ছেন। অভিযোগ, ছাত্রজীবনে বিএনপি সমর্থক ছিলেনÑ এমন কর্মকর্তাদেরও ট্যাগ দিয়ে বদলি বা সংযুক্তির অপচেষ্টাও চলছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অতিরিক্ত ডিআইজি পর্যায়ের কর্মকর্তা এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছেÑ কে কোন ট্যাগে পড়বে। বাস্তব কাজের মূল্যায়নের চেয়ে কে কাকে কীভাবে উপস্থাপন করছে, সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।’

এ প্রসঙ্গে জনপ্রশাসন বিশ্লেষক ও সাবেক আমলা ড. আব্দুস সবুর বলেন, ‘রাষ্ট্রযন্ত্রের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা যেকোনো সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে তদন্ত যেন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার রূপ না নেয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। না হলে এটি প্রশাসনে ভয় তৈরি করবে, যা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর।’

তিনি মনে করেন, ‘বাংলাদেশের প্রশাসনে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ রয়েছে। এই তদন্ত যদি সত্যিকার অর্থে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের অংশ হয়, তাহলে এটি ইতিবাচক হতে পারে। তবে এর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।’

নিরাপত্তা বিশ্লেষক কর্নেল (অব.) কাজী শরীফ উদ্দিন বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে রাজনৈতিক বিভাজন তৈরি হলে সেটি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। তাই এই তদন্তকে শুধু ব্যক্তি নয়, একটি সিস্টেমিক সমস্যা হিসেবে দেখা উচিত।’

সূত্র জানাচ্ছে, যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পক্ষপাতমূলক আচরণের প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। এর মধ্যে বদলি, পদাবনতি বা বাধ্যতামূলক অবসরের মতো সিদ্ধান্ত থাকতে পারে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে পদায়নের ক্ষেত্রে নতুন নীতিমালা প্রণয়নের কথাও ভাবা হচ্ছে। যাতে করে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি পেশাদার পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলা যায়।

যদিও এই উদ্যোগ ও তদন্ত কার্যক্রম কতটা নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে। তারা বলছেন, এটি কি সত্যিকার অর্থে পেশাদারত্ব ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা নাকি ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রশাসনের পুনর্বিন্যাস? বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই উদ্যোগ যদি সত্যিকার অর্থে পেশাদারত্ব ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার দিকে এগোয়, তাহলে তা বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোয় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা