প্রবা প্রতিবেদক, ঢাকা ও চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৩৬ এএম
বৈশ্বিক অস্থিরতার মাঝেও ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার পথে এগোচ্ছে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বৈশ্বিক অস্থিরতার মাঝেও ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার পথে এগোচ্ছে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের সরবরাহ সংকটে বিভিন্ন দেশ যখন কঠিন সময় পার করছে, তখন স্বস্তির বার্তা নিয়ে একের পর এক জ্বালানি তেলবাহী জাহাজ ভিড়ছে দেশের অন্যতম প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামে। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী ১৫ দিনের জ্বালানি মজুদ রয়েছে। আরও বিপুল পরিমাণ জ্বালানি পাইপলাইনে আছে। সব মিলিয়ে ধারণা করা হচ্ছে তেল সংকট কেটে যাচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত দিনে জ্বালানি নিয়ে বন্দরে এসেছে ৯ জাহাজ। এর মধ্যে চারটিতে এসেছে ১ লাখ ৪০ হাজার টন ডিজেল। ১৯ এপ্রিল ৩৩ হাজার টন ডিজেল নিয়ে আরেকটি জাহাজের বন্দরে আসার কথা। বিপিসি বলছে, এই পাঁচ জাহাজে আমদানি করা ডিজেল দিয়ে চাহিদা মেটানো যাবে প্রায় ১৫ দিনের।
এর বাইরে গত সাত দিনে ভারত থেকে পাইপলাইনে দেশে এসেছে ১৩ হাজার টন ডিজেল। এর মধ্যে ৫ হাজার টন আসা শুরু হয় বৃহস্পতিবার। বাকি ৮ হাজার টন ডিজেল ভারত থেকে পাইপলাইনে আনা হয় ১৪ এপ্রিল।
ধারাবাহিকভাবে গত এক সপ্তাহে জ্বালানি তেলবাহী জাহাজ আগমনের ফলে মজুদ পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেকটাই স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। ঠিক এই সময়ে আরেকটি স্বস্তির বার্তা দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। রাশিয়ার জ্বালানি তেল আমদানিতে বাংলাদেশকে নতুন করে ৬০ দিনের ছাড় দিল দেশটি। এ অবস্থায় দেশে আগামী দুই মাস জ্বালানি তেলের সংকট তৈরি হবে না বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি তেল নিয়ে জাহাজের এই ধারাবাহিক আগমন, ভারত থেকে পাইপলাইনে তেল আমদানি, রাশিয়ার তেল আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের ছাড়, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দেশের জ্বালানি সরবরাহে যে চাপ তৈরি করেছিল, তা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি জ্বালানি আমদানির এই সরবরাহ যদি ঠিক রাখা যায়, তাহলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প-কারখানা ও পরিবহন খাত স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরতে পারবে।
জানতে চাইলে ক্যাবের সিনিয়র সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বর্তমান সংকটকালীন সময়ে জ্বালানি তেল নিয়ে একের পর এক জাহাজ আসাটা স্বস্তির। তবে এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। কারণ জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক রাখতে পারলেই বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প-কারখানা ও পরিবহন খাত স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরতে পারবে। অন্যথায় এখন জ্বালানি সংকটে এসব খাতে যে সংকট তৈরি হয়েছেÑ সেটি আরও ঘনীভূত হবে। সংকট মোকাবিলায় জ্বালানি তেল আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি সৌরশক্তির ওপর জোর দেওয়ার কথা জানান।
এদিকে জ্বালানি তেল নিয়ে একের পর এক জাহাজ ভেড়ার কারণে আমদানিতে স্বস্তি ফিরলেও ফিলিং স্টেশনে গিয়ে চাহিদামতো তেল পাচ্ছেন না গাড়ির চালক-মালিকরা। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে দিন দিন বাড়ছে গাড়ির লাইন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে চাহিদামতো তেল পাচ্ছেন না গ্রাহক।
এক দিনে চট্টগ্রাম বন্দরে তেল নিয়ে এলো চার জাহাজ
১ লাখ ৩৫ হাজার ৩৬৩ টন জ্বালানি তেল নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে এসেছে চার জাহাজ। শুক্রবার চারটি জাহাজ তেল নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামীম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। চারটি জাহাজের মধ্যে তিনটি ৯৮ হাজার টন ডিজেল, অন্যটিতে ২৭ হাজার ৩৬৩ টন মোগাস অয়েল আমদানি করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
এ নিয়ে গত সাত দিনে জ্বালানি নিয়ে ৯টি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে আসে। নয়টি জাহাজের মধ্যে চারটিতে ডিজেল, দুটিতে এলপিজি, একটিতে এলএনজি, একটিতে জেট ফুয়েল ও অন্যটিতে মোগাস অয়েল আমদানি করা হয়। এর আগে সর্বশেষ ১৪ এপ্রিল রাতে ৩২ হাজার টন ডিজেল নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আসে ‘এমটি টর্ম দামিনি’ জাহাজ। চার জাহাজে সব মিলিয়ে ডিজেল এসেছে ১ লাখ ৪০ হাজার টন।
চার জাহাজে আমদানি করা এই ডিজেল দিয়ে ১২ দিনের চাহিদা পূরণ হবে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে দৈনিক ডিজেলের চাহিদা সাড়ে ১২ হাজার টন। সেই হিসাবে ১ লাখ ৪০ হাজার টন ডিজেলে চাহিদা মিটবে প্রায় ১২ দিনের। এর বাইরে ১৯ এপ্রিল আসবে আরও ৩৩ হাজার টন ডিজেল। এই ডিজেলগুলোতে চাহিদা মিটবে আরও তিন দিনের। এই হিসাবে এক সপ্তাহের মধ্যে পাঁচ জাহাজে আমদানি করা ডিজেলে চাহিদা মিটবে প্রায় ১৫ দিনের।
বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার যে চারটি জাহাজ জ্বালানি তেল নিয়ে এসেছে সেগুলো হলোÑ এমটি ওকট্রি, এমটি কেপ বনি, এমটি লিয়ান সং হু ও এমটি ন্যাব চিলো। চারটি জাহাজের মধ্যে এমটি ওকট্রি জাহাজে করে মালয়েশিয়া থেকে ৩৩ হাজার টন ডিজেল, এমটি কেপ বনি জাহাজে একই দেশ থেকে আরও ৩৩ হাজার টন ডিজেল ও এমটি লিয়ান সং হু জাহাজে করে ভারত থেকে ৪২ হাজার টন ডিজেল আমদানি করা হয়। এমটি ন্যাব চিলো নামের অপর জাহাজটিতে করে মালয়েশিয়া থেকে ২৭ হাজার ৩৬৩ টন মোগাস অয়েল আমদানি করা হয়।
আজ শনি ও কাল রবিবার জ্বালানি নিয়ে আরও দুটি জাহাজ বন্দরে আসার কথা রয়েছে। দুটির মধ্যে এমটি লোবিটো নামের একটি জাহাজে আসছে এলএনজি। এমটি গোল্ডেন হরিজন নামের অপরটিতে মালয়েশিয়ার ৩৩ হাজার টন ডিজেল আমদানি করা হচ্ছে।
রাশিয়ার জ্বালানি তেল আমদানিতে ছাড়
রাশিয়ার জ্বালানি আমদানিতে বাংলাদেশকে নতুন করে ৬০ দিনের জন্য নিষেধাজ্ঞা থেকে ছাড় দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বজুড়ে চলমান জ্বালানি সংকটের অস্থিরতার মধ্যে বাংলাদেশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই ছাড় দেওয়া হয়।
গত ১১ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, ১১ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়া এই ছাড়ের মেয়াদ আগামী ৯ জুন পর্যন্ত বহাল থাকবে। এর আগে গত ১২ মার্চ মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ রুশ অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য-সংক্রান্ত লেনদেনে ৩০ দিনের ছাড় দিয়েছিল, যার মেয়াদ শেষ হয় ১১ এপ্রিল। গত ৩০ মার্চ মার্কিন সরকারকে পাঠানো এক চিঠিতে জ্বালানি বিভাগ আনুষ্ঠানিকভাবে সীমিত সময়ের জন্য এই নিষেধাজ্ঞায় ছাড় চেয়েছিল। ওই চিঠিতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধি ও মধ্যপ্রাচ্যের প্রথাগত উৎসগুলো থেকে জ্বালানি সংগ্রহের চ্যালেঞ্জগুলো উল্লেখ করা হয়।
চিঠিতে আরও বলা হয়, জ্বালানি সম্পদের সহজলভ্যতা এবং দ্রুত সরবরাহের সক্ষমতার কারণে রাশিয়া এখন একটি নির্ভরযোগ্য বিকল্প সরবরাহকারী হিসেবে সামনে এসেছে।
ভারত থেকে পাইপলাইনে আসছে ডিজেল
ভারত থেকে ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইনের মাধ্যমে দেশে ডিজেল সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় নতুন করে আরও ৫ হাজার টন ডিজেল আসা শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই পার্বতীপুর রেলহেড ডিপোতে এই ডিজেল আসা শুরু হয় বলে জানিয়েছে মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড।
এর আগে ১৪ এপ্রিল ভারতের নুমালীগড় থেকে এই পাইপলাইনের মাধ্যমে আরও ৮ হাজার টন ডিজেল ঢুকেছে পার্বতীপুর রেলহেড ডিপোতে।
মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড বলছে, ৫ হাজার টন ডিজেল আসতে সময় লাগবে আনুমানিক ৫০ ঘণ্টা। এই তেল আসা শেষ হলে আগামী চার থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে আবারও ৭ হাজার টন ডিজেল আসবে ভারতের নুমালীগড় রিফাইনারি লিমিটেড থেকে। সব মিলিয়ে এপ্রিলে ভারত থেকে পাইপলাইনে মোট ২৫ হাজার টন জ্বালানি তেল আসবে।
জ্বালানি তেলের মজুদ নিয়ে যা বললেন প্রতিমন্ত্রী
দেশে এপ্রিল মে মাসের পূর্ণ জ্বালানি সক্ষমতা রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। শুক্রবার চট্টগ্রামে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন।
প্রতিমন্ত্রী জানান, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে আমাদের আমদানিকৃত সকল জ্বালানি এসেছে। মার্চ ও এপ্রিলে কিছুটা বিঘ্নিত হলেও এপ্রিল ও মে মাসের জ্বালানি চাহিদা মেটানোর পূর্ণ সক্ষমতা রয়েছে। বর্তমানে জুন মাসের চাহিদা মাথায় রেখে পর্যাপ্ত মজুদ নিশ্চিতের কাজ চলছে। জ্বালানি চাহিদা নিরবচ্ছিন্ন রাখতে সরকার ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে। সরকার বিকল্প উৎস থেকে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত জ্বালানি আমদানির চেষ্টা করছে।
পরিশোধিত জ্বালানি তেল সরবরাহও বাড়ানো হচ্ছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, বর্তমানে দেশে ইতিহাসের সর্বোচ্চ জ্বালানি মজুদ রয়েছে। পাশাপাশি সরকার বিকল্প উৎস থেকে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত জ্বালানি আমদানির চেষ্টা করছে। ইস্টার্ন রিফাইনারির জন্য মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বিকল্প উৎসে অপরিশোধিত জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে এখন রিফাইনারিতে পরিশোধন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় পরিশোধিত জ্বালানি আমদানিতে মনোযোগ দিয়েছে সরকার।
লোডশেডিং প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে বর্তমানে কৃষি ও শিল্প খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে। এ কারণে গৃহস্থালি খাতে তুলনামূলকভাবে কম বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে মে মাসে ফসল সংগ্রহ শুরু হলে গৃহস্থালি খাতকে আবারও অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
এর আগে গত ১৫ এপ্রিল জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশে অকটেন ও পেট্রোলের যে মজুদ আছে তাতে আগামী দুই মাসেও কোনো সমস্যা হবে না। দেশে ডিজেল রয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ৮৫ টন, অকটেন ৩১ হাজার ৮২১ টন। পেট্রোল রয়েছে ১৮ হাজার ২১ টন ও ফার্নেস অয়েল ৭৭ হাজার ৫৪৬ টন।