× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

গলদের ফাঁদে গৃহায়নের ২৪৭ কোটি টাকার প্রকল্প

রাহাত হুসাইন

প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০২৬ ১১:১৯ এএম

আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২৬ ১৯:৪৩ পিএম

পরিকল্পনাগত দুর্বলতা ও প্রশাসনিক জটিলতায় আট বছরেও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। ছবি: সংগৃহীত

পরিকল্পনাগত দুর্বলতা ও প্রশাসনিক জটিলতায় আট বছরেও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। ছবি: সংগৃহীত

প্রকল্প নেওয়ার আগে যাচাই করা হয়নি সক্ষমতা, এমনকি নিশ্চিত করা যায়নি ভূমি অধিগ্রহণও। এর মধ্যেই তিন দফা বেড়েছে সময়। তবুও লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ (এনএইচএ)। ২০১৮ সালে রাজধানীর ধানমন্ডি ও মোহাম্মদপুরের ছয়টি প্লটে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের আবাসনের সুযোগ তৈরির লক্ষ্য নিয়ে এনএইচএ প্রকল্পটি হাতে নিয়েছিল। কিন্তু পরিকল্পনাগত দুর্বলতা ও প্রশাসনিক জটিলতায় আট বছরেও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জিত হয়নি।

বিগত সরকারি আমলের এই প্রকল্প এখন জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতার বড় উদাহরণ হয়ে উঠেছে। প্রকল্পের শুরুতে ২২৪ কোটি ১৩ লাখ ৭১ হাজার টাকা ব্যয় ধরা হলেও প্রথম সংশোধনীতে তা বাড়িয়ে ২৪৭ কোটি ৯৩ লাখ ৬০ হাজার টাকায় উন্নীত করা হয়। বরাদ্দ বাড়লেও উল্টো কমেছে ফ্ল্যাট ও গ্যারেজের সংখ্যা; নকশায়ও বার বার পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর মধ্যেই কয়েক দফা পরিবর্তন করা হয়েছে প্রকল্প পরিচালক (পিডি)। চলতি বছরের জুনে প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা।

এ প্রকল্পের দৃশ্যমান অগ্রগতি বেশ সীমিত। তবে তদারকির নামে তিনটি মোটরসাইকেল ক্রয়ে ব্যয় করা হয়েছে ৭ লাখ ২৯ হাজার টাকা। শুধু তাই নয়, সরকারি স্থাপত্য অধিদপ্তরকে পাশ কাটিয়ে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নকশা প্রণয়ন করা হয়। এ খাতে ইতোমধ্যে ২ কোটি ৬ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। প্রকল্পের আর্থিক বিশৃঙ্খলার চিত্র উঠে এসেছে অডিট আপত্তিতে। এজি অডিট প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে কোনো বাজেট বরাদ্দ বা অনুমোদিত ডিপিপি ছাড়াই ৭৪ কোটি ৪৯ লাখ ৮১ হাজার টাকা ব্যয় করা হয়েছে, যা আর্থিক শৃঙ্খলার পরিপন্থী। এ বিষয়ে সরকারের প্রকল্প বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) বলছে, যথাযথ নথিপত্র ছাড়াই এই বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করা হয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় ধানমন্ডি ও মোহাম্মদপুর এলাকায় ৩টি করে মোট ৬টি প্লটে বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। অথচ এগুলোর মধ্যে ৩টি প্লটই এখনও কর্তৃপক্ষের দখলে আসেনি। ২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটির (পিএসসি) সভার তথ্য অনুযায়ী, ভূমি অধিগ্রহণের জন্যে বরাদ্দকৃত ৮১ কোটি টাকার মধ্যে ইতোমধ্যেই ২৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে।

নথিপত্রে দেখা যায়, মোহাম্মদপুরের হুমায়ুন রোডের ব্লক-বি ৬/২৪ নম্বর বাড়িটি অধিগ্রহণের জন্য ২০১৮ সালের ৭ জানুয়ারি ঢাকার জেলা প্রশাসককে ৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা দেওয়া হয়। কিন্তু এখনও এনএইচএ’র দখলে আসেনি এবং এ নিয়ে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে। একইভাবে, মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডের ব্লক-এ ১২/৩ নম্বর বাড়ির জন্য ১ কোটি ৯৪ লাখ টাকা দেওয়া হলেও সেটি এখনও পুরোপুরি দখলে নেওয়া সম্ভব হয়নি। একটি অংশ দখলে নিয়ে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ সাইনবোর্ড স্থাপন করেছে, কিন্তু বাকি অংশটি এখনও একটি পরিবারের দখলে রয়েছে। এ নিয়েও মামলা চলছে।

মোহাম্মদপুরের আসাদ অ্যাভিনিউর ৩৮-৩৯/সি নম্বর প্লটেও নির্মাণকাজ কিছুটা হওয়ার পর অগ্রগতি থেমে আছে। ২০২৩ সালের ২০ মার্চ প্রথম তলার ছাদ ঢালাই সম্পন্ন হওয়ার পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘ সময় কাজ বন্ধ রাখে। পরে কাজ শুরু হলেও নির্ধারিত সময়সীমা ২০২৪ সালের ১৫ মার্চের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি তা শেষ করতে ব্যর্থ হয়। ফলে ওই কাজের দায়িত্বে থাকা ‘মেসার্স পোদ্দার এন্টারপ্রাইজ ও কবির ট্রেডার্স (জেভি)’-এর কার্যাদেশ বাতিল করে নতুন দরপত্র আহ্বানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ।

অন্যদিকে ধানমন্ডির তিনটি প্লটের একটি এখনও জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের দখলে আসেনি। প্রকল্পের আওতায় থাকা ১ নম্বর সড়কের ২৯ নম্বর বাড়িটি দখলে নিতে পেরেছে এনএইচএ। এ জমির চারপাশ টিন দিয়ে ঘেরা, ভেতরে ঝোপঝাড়ের মধ্যে ঝুলছে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সাইনবোর্ড। ২ নম্বর রোডের ৩০ নম্বর বাড়িটিও এখনও দখলে নিতে পারেনি সংস্থাটি।

যতটুকু অর্জন তা সম্ভব হয়েছে কেবল ধানমন্ডির ৬/এ নম্বর রোডের ৬৩ নম্বর প্লটে। ধানমন্ডি ৬/এ এলাকার ৬৩ নম্বর প্লটে ১২ কাঠা জমির ওপর নির্মাণাধীন ১৪ তলা ভবনের মূল অবকাঠামোগত কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন করেছে জাতীয় এনএইচএ। ভবনটি দৃশ্যমান রূপ পেলেও এখনও এটি পুরোপুরি বসবাসের উপযোগী হয়ে ওঠেনি। ভবনের ফ্লোর ও দেয়ালে টাইলস বসানোর কাজ এখনও শেষ হয়নি। বাকি রয়েছে দরজা-জানালার কাজ। এ ছাড়া পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব হয়নি। একইভাবে ইলেকট্রিক্যাল কাজও অসম্পূর্ণ। 

নথি অনুযায়ী, ধানমন্ডির ৬/এ নম্বর রোডের ৬৩ নম্বর প্লটে নির্মিতব্য ভবনের নকশায় শেষ মুহূর্তে আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগের নকশায় ভবনের ১৩ ও ১৪ তলায় ‘ডুপ্লেক্স’ ফ্ল্যাট নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও তা বাতিল করা হয়েছে। এখন সাধারণ ফ্ল্যাট করে কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এই ভবন নির্মাণের জন্য ২০২২ সালের ২১ মার্চ চুক্তি করা হয়েছিল। তবে ভিত্তি ঢালাইয়ের পর নির্বাচিত ঠিকাদারের কাজের গতি সন্তোষজনক না হওয়ায় সেই চুক্তি বাতিল করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। পরে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ দিয়ে ২০২৪ সালের জুনে পুনরায় কাজ শুরু করা হয়। প্রকল্পের মেয়াদ শেষের মুখে এসে এখন লিফটসহ অন্যান্য বৈদ্যুতিক কাজের জন্য নতুন করে দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া চলছে।

শুধু এখানেই শেষ নয়। সরকারের পাওনা আদায়ের ক্ষেত্রেও গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা স্পষ্ট। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে লিকুইডেটেড ড্যামেজ বা জরিমানা বাবদ ৬ কোটি ৮২ লাখ টাকা অনাদায়ী রয়েছে। নথি বলছে, ধানমন্ডির ৬৩ নম্বর প্লটের কাজ বাস্তবায়নের জন্য শুরুতে যে ঠিকাদারকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, তার মৃত্যুজনিত কারণে চুক্তি বাতিল করা হয়। তবে সেই বাতিল হওয়া কাজের বিপরীতে আরোপিত জরিমানা এবং পুনরায় কাজ শুরু করতে গিয়ে যে অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে, তা আদায় করা সম্ভব হয়নি।

এ প্রসঙ্গে ধানমন্ডি ও মোহাম্মদপুরের আবাসন প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা মিরপুর গৃহসংস্থানের নির্বাহী প্রকৌশলী কাওসার মোর্শেদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, ‘ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে লিকুইডেটেড ড্যামেজ আদায়ের লক্ষ্যে মামলা করা হয়েছে।’

দীর্ঘদিন ধরে মামলা চলমান থাকায় বিষয়টি নিষ্পত্তিতে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এতে সরকারের অর্থ ও সময় অপচয়ের পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়ন দীর্ঘসূত্রতায় আটকে রয়েছে। তবে এ প্রসঙ্গে সংস্থাটির আইন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, ‘মামলাগুলো লড়ার জন্য আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সেগুলো যাতে দ্রুত শেষ হয়, সেজন্য অ্যাটর্নি অফিস এবং সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি আদালতের সিদ্ধান্তের বিষয়। ইতোমধ্যে ধানমন্ডির ১ নম্বর সড়কের ২৯ নম্বর বাড়ির মামলায় জয় পেয়েছি।’

প্রকল্পের এই জটিলতা থেকে উত্তরণের জন্য আইএমইডি প্রকল্পটিকে দুই ভাগে বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে। দখলে থাকা প্লটগুলো দ্রুত শেষ করা এবং দখলহীন প্লটগুলোকে আলাদা পর্যায়ে নেওয়া। একই সঙ্গে অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অনিশ্চিত প্লটগুলো প্রকল্প থেকে বাদ দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

এ প্রকল্প সম্পর্কে জানতে চাইলে গণপূর্ত ও গৃহায়ন মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অধিশাখার যুগ্ম সচিব আবুল বাকের মো. তৌহিদ বলেন, ‘মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেÑ যেসব জমি এখনও বুঝে পাওয়া যায়নি, সেগুলো বাদ দিয়ে প্রকল্পটি সংশোধন করা হবে। এর মাধ্যমে বর্তমানে কর্তৃপক্ষের দখলে থাকা জমিগুলোতে দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা