× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা বহরে যুক্ত হচ্ছে ‘শ্যাডো প্রটোকল’

তানভীর হাসান ও নূর মোহাম্মদ মিঠু

প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৩৮ এএম

আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৪১ এএম

ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সাদামাটা প্রটোকলে চলাফেরা করছেন। ছবি: সংগৃহীত

ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সাদামাটা প্রটোকলে চলাফেরা করছেন। ছবি: সংগৃহীত

ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সাদামাটা প্রটোকলে চলাফেরা করছেন। এমনকি তার নিরাপত্তার বহরও কমিয়ে এনেছেন। জনদুর্ভোগ কমাতে তার চলাফেরার রুটে ট্রাফিক ব্যবস্থাকেও রেখেছেন সাধারণ পর্যায়ে। সবার প্রশংসা পেয়েছে প্রধানমন্ত্রীর এ সিদ্ধান্ত। তবে দেশের প্রধানমন্ত্রীর এমন চলাফেরাকে কেন্দ্র করে দুষ্কৃতকারীরা যেন সুযোগ নিতে না পারে এজন্য ছায়াসঙ্গী হচ্ছেন সাদা পোশাকের গোয়েন্দারা। অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর স্বাভাবিক নিরাপত্তা বলয়ের বাইরেও থাকবে আলাদা ‘শ্যাডো প্রটোকল’। এই টিমের সদস্যরা আগে থেকেই প্রধানমন্ত্রীর চলাফেরার রুটের নিয়ন্ত্রণ নিলেও জনদুর্ভোগ হবে না বলেও একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে।

গোয়েন্দা সংস্থার এমন উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এ ধরনের উদ্যোগ আরও আগেই নেওয়া উচিত ছিল। আমাদের দেশের ঘনবসতিপূর্ণ শহরে প্রধানমন্ত্রীর এমন চলাফেরায় নিরাপত্তার ঝুঁকি থেকেই যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল‍্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক সমাজ-অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী যেভাবে চলছেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এ ধরনের নেতৃত্বই সাধারণ মানুষ বেশি পছন্দ করে। কারণ জনগণ চায়, যেমন নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে, তেমনই সরকারপ্রধানও যেন অংশগ্রহণমূলক আচরণ করেন। সরকার তখনই প্রকৃত অর্থে অংশগ্রহণমূলক হয়ে ওঠে, যখন সরকারপ্রধান সাধারণ মানুষের বাস্তবতা, ভোগান্তি ও প্রত্যাশাকে মাথায় রেখে চলাফেরা করেন। জনসম্পৃক্ততার এই বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই প্রধানমন্ত্রী তার মুভমেন্ট পরিচালনা করছেন।

তিনি আরও বলেন, গণতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রধানমন্ত্রীর এই ধরনের স্বাভাবিক ও সরল মুভমেন্ট অবশ্যই ইতিবাচক এবং গ্রহণযোগ্য। তবে বাংলাদেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, রাজনৈতিক বিভাজন এবং ভুয়া বা অস্থিতিশীল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় একটি নীরব নিরাপত্তা শঙ্কা থেকেই যায়। এই বাস্তবতায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তায় নিয়োজিত সংস্থাগুলোর উচিত একটি কার্যকর শ্যাডো প্রটোকল নিশ্চিত করাÑ তা তারা যে পোশাকেই করুক, যেভাবেই করুক না কেন। প্রধানমন্ত্রী জনগণের সঙ্গে মিশে যাচ্ছেন, স্বাভাবিক ট্রাফিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে চলাচল করছেন। সাধারণ মানুষ তার সঙ্গে কথা বলতে পারছেন, আবার তিনি নিজেও মানুষের সঙ্গে কথা বলছেনÑ যা গণতান্ত্রিক চর্চার একটি শক্তিশালী প্রতিফলন। তবে এই প্রক্রিয়ার মধ্যেও বিশ্বের অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশগুলোর মতো রাষ্ট্রপ্রধানের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সব সময় সম্পৃক্ত থাকেন। সেই নিরাপত্তা এতটাই সূক্ষ্মভাবে পরিচালিত হয় যে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ না করলে তা বোঝা কঠিন।

তিনি মনে করেন, বাংলাদেশেও ঠিক এমন একটি ব্যবস্থাই গড়ে তোলা প্রয়োজনÑ যেখানে প্রধানমন্ত্রীর স্বাভাবিক চলাফেরা ও জনগণের সঙ্গে সংযোগ বজায় থাকবে, কিন্তু একই সঙ্গে অদৃশ্যভাবে শক্তিশালী নিরাপত্তা বলয় কার্যকর থাকবে। বর্তমান যেভাবে প্রধানমন্ত্রী চলছেন, তা তার জনগণের সঙ্গে সংযুক্ত থাকার অভিপ্রায়েরই প্রতিফলন। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচিত হবে না এই অভিপ্রায়ের ওপর পুরো নিরাপত্তা ছেড়ে দেওয়া। বরং তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে। জনসম্পৃক্ততা ও নিরাপত্তা এই দুয়ের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় তৈরি করতে পারলেই উভয় কূল রক্ষা সম্ভব হবে বলে মনে করেন তৌহিদুল হক। 

জানা গেছে, দেশের ভিন্ন ও পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধানের নিরাপত্তা নিয়ে দায়িত্বের জায়গা থেকেই নড়েচড়ে বসেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে ইতোমধ্যে শ্যাডো প্রটোকলের পরিকল্পনাও গ্রহণ করা হয়েছে। কারণ প্রধানমন্ত্রীর মুভমেন্টে শ্যাডো নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য সুপারিশও করেছে একটি গোয়েন্দা সংস্থাÑ যা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী সম্মতি দিয়েছে। যদিও বাড়তি নিরাপত্তা চান না প্রধানমন্ত্রী নিজেই।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, একটা দেশের প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট সবগুলোর সংস্থারই একটি দায়িত্ব রয়েছে। প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে সেই পরিকল্পনা গ্রহণও করা হয়েছে। সূত্রটি বলছে, সম্প্রতি জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের বিল পাসের পর দলটির নেতাকর্মীরা সামাজিক মাধ্যমে বিভিন্ন কড়া মন্তব্য করেছেন। এ ছাড়া বিরোধী দলগুলোও নানা ইস্যুতে সরকারি দলের বিরুদ্ধে সরব রয়েছেন। সরব রয়েছে জুলাই অভ্যুত্থানের যোদ্ধা পরিচয়ধারী নানা সংগঠন ও গোষ্ঠী। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হচ্ছে, ২০০৬ সালে বিএনপি সরকার আমলে ২ বিচারক হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয় শায়খ আব্দুর রহমান ও সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলাভাইসহ ৬ শীর্ষ জঙ্গি নেতা। পরে তাদের ফাঁসি কার্যকর হয়। অসংখ্য জঙ্গিকে গ্রেপ্তারও করা হয় সেসময়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সেসব জঙ্গিদের অনেকেই ঢালাও মুক্তি পায়। এ ছাড়া ঢাকার আদালত প্রাঙ্গণ থেকে জঙ্গিরা পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাও রয়েছে। ময়মনসিংহে পুলিশের ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে আসামি ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটেছে অতীতে। যাদের বেশিরভাগই এখনও গ্রেপ্তার হয়নি। পলাতক এসব জঙ্গিদের ক্ষোভের টার্গেটেও থাকতে পারেন রাষ্ট্রপ্রধানÑ এমন ধারণাও পুষছেন গোয়েন্দারা। পূর্বাপর এসব ঘটনা বিশ্লেষণ করেই শ্যাডো প্রটোকলের সুপারিশ করা হয়েছে বলে ধারণা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর।

তবে নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী এতে রাজি নন। তিনি সাদামাটা মুভমেন্টেই আগ্রহী। যদিও প্রধানমন্ত্রীর শ্যাডো নিরাপত্তায় জোর দিয়ে গোয়েন্দা সংস্থার করা সুপারিশকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন সরকার দলীয় সংসদ সদস্যরা। যে কারণে প্রধানমন্ত্রীর অজান্তেই শ্যাডো প্রটোকলের বিষয়টি নিয়ে ভাবছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম-৬ আসনের সংসদ সদস্য গিয়াস কাদের চৌধুরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাদামাটা প্রটোকলে নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে আমি শঙ্কিত। কারণ শুধু দেশেই নয়, দেশের বাইরেও তার অনেক শত্রু রয়েছে। যে কারণে তার নিরাপত্তা বাড়ানো উচিত বলে আমি মনে করি।

শ্যাডো নিরাপত্তার বিষয়ে তিনি বলেন, শ্যাডো নিরাপত্তার বিষয়টি দৃশ্যমান না। বাহ্যিকভাবে এর তেমন কোনো প্রভাবও পড়ে না। এ কারণে শ্যাডো নিরাপত্তা কতটুকু কার্যকর হবে সেটাও একটা প্রশ্ন।

সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিটি সফর কিংবা মুভমেন্টে রুটপ্ল্যান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাদা পোশাকধারী সদস্য ও অস্ত্রধারী সদস্যদের শ্যাডো প্রটোকলে রাখার অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিকল্পনা চলছে। শ্যাডো নিরাপত্তার অধীনে ট্রেসিং ও টেকনিক্যাল সাপোর্টের বিষয়টি উল্লেখ করে একটি গোয়েন্দা সূত্র জানায়, জিপিএস ট্র্যাকিং এবং ড্রোন বা সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে কন্ট্রোল রুম থেকে সার্বক্ষণিক প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান পর্যবেক্ষণ করা হবে। এতে তার নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকলেও তা অনেকাংশেই কমে আসবে বলে দাবি করছে সূত্রটি। তারা এটি বাস্তবায়ন নিশ্চিতের জন্যও সতর্ক করছেন। সেক্ষেত্রে জনদুর্ভোগের বিষয়টিও মাথায় রাখা হচ্ছে।

জানা গেছে, চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি রাত ১১টা ৪০ মিনিটে গুলশানে নিজ কার্যালয় থেকে বাসায় ফেরার পথে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কড়া নিরাপত্তাবেষ্টিত গাড়িবহরে একটি অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটে। দ্রুতগতির একটি মোটরসাইকেল নিরাপত্তা বলয় ভেদ করে তার বুলেটপ্রুফ গাড়ির কাছে গিয়ে আঠা দিয়ে একটি সাদা খাম লাগিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়। ঘটনার প্রায় তিন মাস পরও কাউকে আটক করা যায়নি, মোটরসাইকেল শনাক্ত হয়নি, এমনকি খামের ভেতরের বিষয়বস্তুও প্রকাশ করা হয়নি। এতে জনমনে রহস্য ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পুলিশ গুলশান থানায় জিডি করে তদন্ত শুরু করলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গুলশান বিভাগের ডিসি এম তানভীর আহমেদ ও গুলশান থানার ওসি মো. দাউদ হোসেনও এ ঘটনার কোনো অগ্রগতি জানাতে পারেননি। যদিও ঘটনার সময়ে পুলিশের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা স্বীকার করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কনভয় সুরক্ষায় ফাঁক, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার অভাব ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি হতে পারে সতর্কবার্তা, নিরাপত্তা পরীক্ষা বা ভবিষ্যৎ হামলার পূর্বাভাস। ফলে ঘটনাটি ছোট হলেও এটিকে উচ্চঝুঁকির সংকেত হিসেবে বিবেচনা করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুনর্মূল্যায়ন জরুরি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নিরাপত্তা বিশ্লেষক লে. কর্নেল কাজী শরীফ উদ্দিন (অব.) প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বাংলাদেশে ভিভিআইপিরা যখন দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে মুভমেন্ট করেন, তখন ডিজিএফআই, এনএসআইসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সব সংস্থাই সক্রিয় থাকে। নিরাপত্তা নিশ্চিতে যা করার সবই তারা নিশ্চিত করে। যদিও বাহ্যিকভাবে নিরাপত্তার বিষয়টি হালকা বলে মনে হয়। তবে তা নয়, সার্বিক নিরাপত্তাই নিশ্চিত করা থাকে।

তিনি বলেন, নতুন করে সুপারিশ করার স্কোপ নেই। কারণ আধুনিক যুগে নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে সব ধরনের আধুনিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। আগ্নেয়াস্ত্র-সাইবার হামলা প্রতিরোধসহ সব ধরনের অত্যাধুনিক প্রশিক্ষণই দেওয়া হয়। ভিভিআইপি মুভমেন্টে সব ধরনের প্রোটেকশন টেকনিক নেওয়া হয়। এতে একেবারে উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো তেমন কিছু নেই।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা