× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

অনুমোদনহীন স্লিপার কোচ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে মহাসড়ক

মাসুদুল হাসান

প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০২৬ ১১:৩৬ এএম

আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০২৬ ১১:৩৭ এএম

 সারা বাংলাদেশে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অনুমোদনহীন দূরপাল্লার বাস ‘স্লিপার কোচ’। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

সারা বাংলাদেশে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অনুমোদনহীন দূরপাল্লার বাস ‘স্লিপার কোচ’। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

চলতি বছরের ৮ জানুয়ারি চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ঢাকামুখী লেনে কাঠবোঝাই ট্রাকের পেছনে ধাক্কা দিয়েছে একটি দ্বিতল যাত্রীবাহী স্লিপার কোচ। এ দুর্ঘটনায় বাসটির তিন যাত্রী নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও পাঁচজন। এ বছরের ২৯ মার্চ সকাল ৬টার দিকে দিনাজপুর-গোবিন্দগঞ্জ মহাসড়কের বিরামপুরের চণ্ডিপুর এলাকায় মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বালুবাহী ট্রাকের পেছনে ঢাকাগামী স্লিপার কোচের ধাক্কায় দুজন নিহত ও ছয়জন যাত্রী আহত হয়েছেন। গত বছরের ৮ ডিসেম্বর কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের চিওড় এলাকায় যাত্রীবাহী স্লিপার বাসের ধাক্কায় পিকআপ ভ্যানে থাকা আব্দুল জব্বার নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন।

প্রতিনিয়ত স্লিপার কোচের দুর্ঘটনা বাড়ছে। ঢাকা থেকে সারা বাংলাদেশে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অনুমোদনহীন দূরপাল্লার বাস ‘স্লিপার কোচ’। নিয়মিত চেয়ার কোচকে দেশীয় মিস্ত্রিদের মাধ্যমে উচ্চতা বাড়িয়ে ঘুমানোর আসনের ব্যবস্থা করে তৈরি হচ্ছে এসব বাস। চেয়ার কোচের বসার আসনের ওপর ধাতব কাঠামো দিয়ে পাটাতন করে একাধিক স্লিপার আসন তৈরি করে দূরপাল্লায় যাত্রী বহন করছে। এর মধ্যে ‘মেডিকেল আসন’ ও সাধারণ ঘুমানোর আসন রয়েছে বলে মিস্ত্রিরা জানান।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব বাসের সরকারি অনুমোদন নেই, নেই কোনো বিশেষজ্ঞ নিরাপত্তা ছাড়পত্র এবং নির্মাণ প্রক্রিয়ায়ও ত্রুটি থেকে যাচ্ছে। ফলে যাত্রাপথে যেকোনো সময় ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটার শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা থেকে জামালপুরগামী একটি চেয়ার কোচের চালক বলেন, এসব বাসের চেসিস তৈরি করা হয় যে ওজন বহন করার জন্য, চেয়ার কোচে রূপান্তর করার পর বাসের ওজন কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এতে অনেক সময় চলন্ত অবস্থায় গতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয় না। গাবতলী বাস টার্মিনালে একজন চালক জানান, স্লিপার কোচ চালানোর জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় না, প্রায়ই সাধারণ বাসের চালকরাই এ বাস চালানÑ যা দুর্ঘটনা ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানী থেকে প্রায় প্রতিটি বড় বাস কোম্পানি স্লিপার কোচ সার্ভিস পরিচালনা করছে।

বাস তৈরি কারখানার খোঁজ করতে গিয়ে পাওয়া গেল চাঞ্চল্যকর তথ্য। ঢাকার অদূরে গাবতলী ব্রিজ পার হয়ে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে মধুমতি মডেল টাউনে ১৫টির বেশি বাস তৈরির কারখানার সন্ধান মিলেছে। আমিনবাজার ব্রিজ পার হয়ে ৫ কিলোমিটার এগিয়ে গেলে আবাসন প্রকল্পটি। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে এর ভেতরে বাস তৈরির এত বড় কর্মযজ্ঞ। প্রকল্পটির মূল প্রবেশ গেট পার হয়ে প্রায় আধা কিলোমিটার হেঁটে ভেতরে গেলে ডানপাশে কয়েকটি বাস তৈরির গ্যারেজ চোখে পড়ে। প্রথমে কথা হয় সবুজ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সবুজের সাথে। এই প্রতিবেদক ক্রেতা সেজে স্লিপার কোচ তৈরির আগ্রহের কথা জানালে হিসেব করে ৩৭ লাখ টাকার একটি লিখিত হিসেব ধরিয়ে দেন সবুজ। আবাসিক প্রকল্পটির আরও ভেতরে গেলে এখানকার ইয়াসিন মিস্ত্রির গ্যারেজে কথা হয়। ৩৫ লাখ টাকায় স্লিপার কোচ তৈরির কথা জানান তিনি। এমআর বডি বিল্ডার্সের মাসুদ রানা, জসিম বডি বিল্ডার্সের জসিমউদ্দিনসহ আরও কয়েকজন গ্যারেজ মালিক স্লিপার কোচ তৈরির জন্য একই রেটের কথা বলেন। 

এসব গ্যারেজ মালিক জানান, সাধারণ চেয়ার কোচ পুনর্নির্মাণ করে চেয়ার কোচে রূপান্তর করতে ২০-৩০ দিন সময় লাগবে। ইয়াসিন নামে একজন গ্যারেজ মালিক একটি স্লিপার কোচ নির্মাণকাঠামোতে ব্যবহৃত ধাতব রড ও পাতের বিষয়ে বলেন। এতে দেখা যায়, ৩৬-৪০ আসনের নিয়মিত সাধারণ চেয়ার কোচগুলোকে ধাতব যন্ত্রাংশের মাধ্যমে উচ্চতা বাড়িয়ে এই স্লিপার কোচ তৈরি করা হয়। তবে এতে মান নিয়ন্ত্রণের কোনো বালাই নেই। সরকারের কোনো অনুমোদন না থাকায় এর মান নিয়ন্ত্রণের কোনো প্রক্রিয়া নেই। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে ডাবল ডেকার স্লিপার বাসের উচ্চতা ও ওজন সাধারণ বাসের তুলনায় বেশি হওয়ায় দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বহুগুণে বাড়ে। হঠাৎ ব্রেক, তীব্র বাঁক বা নিচু ব্রিজের সঙ্গে সংঘর্ষে বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় দীর্ঘপথে চলাচলকারী স্লিপার বাসগুলো যাত্রীদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।

এ বিষয়ে বুয়েটের দুর্ঘটনা রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক হাদিউজ্জামান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, সড়ক পরিবহন আইন লঙ্ঘন করে তৈরি করা হচ্ছে স্লিপার কোচ।

সরকারের অনুমোদনের বিষয়ে জানতে চাইলে একজন গ্যারেজ মালিক বলেন, উপযুক্ত লোক ধরলে ও ৫-৭ লাখ টাকা খরচ করলে বিআরটিএ থেকে অনুমোদন পাওয়া যায়। এসব গ্যারেজে আলাপচারিতায় ইফাদ মোটরসের রাজন নামের একজন কর্মকর্তার বিআরটিএ থেকে নিবন্ধন পেতে ‘সাহায্য’ করার বিষয়টি উঠে আসে। এই বিষয়ে ইফাদ মোটরসের বিক্রয় ও বিপণন বিভাগের কর্মকর্তা রাজনের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এই প্রতিবেদককে জানান, স্লিপার কোচের অনুমোদনের কোনো টাকা লেনদেনের সাথে তিনি জড়িত নন।

জানা যায়, ঢাকা-বরিশাল-কুয়াকাটা রুটে ইউরোকোচ ও আইকনিক এন্টারপ্রাইজ স্লিপার কোচ রয়েছে। জানা গেছে, ইউরো কোচের প্রতিদিন দুটি স্লিপার বাস চলে। এ ছাড়া ঢাকা-বরিশাল-কুয়াকাটা রুটে ইম্পেরিয়াল এক্সপ্রেসে প্রতিদিন স্লিপার বাস চালু আছে। এসব বাসের অনুমোদন ও নিয়ম মেনে তৈরি কি না এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাসের সাথে সংশ্লিষ্টরা কোনো কথা বলতে চাননি। বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. শরফুদ্দীন জানান, কোন কোন বাস চলাচল করে, পাশাপাশি অনুমোদনের বিষয়টি আমরা দেখব।

রংপুরে অনুমোদন ছাড়াই চলছে ডাবল ডেকার স্লিপার বাস। বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ বলছে, এখন পর্যন্ত রংপুর অফিস থেকে কোনো স্লিপার বাস অনুমোদন নেয়নি। নিম্নমানের চেসিসে বডি তৈরি, সেইফটি ফিচার না থাকা এবং ফিটনেসবিহীন বাসকে প্রকৌশল মান না মেনে রূপান্তর করে সড়কে নামছে। রংপুর জেলা মোটর মালিক সমিতি জানিয়েছে, নগরীর কামারপাড়া বাসস্ট্যান্ড থেকে ১০টি স্লিপার বাস ঢাকাসহ বিভিন্ন রুটে চলাচল করে। এ ছাড়া রংপুর বিভাগের পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী, দিনাজপুর, লালমনিরহাটসহ বিভিন্ন জেলা থেকে আরও ২০টির মতো স্লিপার বাস চলাচল করে। এসব বাসের রুট পারমিট নেই। রংপুর মোটর মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ওয়াসিম বারী রাজ বলেন, রংপুর থেকে যেসব স্লিপার বাস চলাচল করে তাদের রুট পারমিট নেই। বিআরটিএ রংপুর অফিসের সহকারী পরিচালক শফিকুল আলম সরকার বলেন, রংপুর থেকে কোনো ডাবল ডেকার স্লিপার বাসের অনুমোদন দেওয়া হয়নি। 

এ বিষয়ে বিআরটিএ চেয়ারম্যান মীর আহমেদ তারিকুল ওমর প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, এসব অবৈধ স্লিপার কোচের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করার কথা চিন্তা করছেন তারা। অনুমোদনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিআরটিএ এই বাসগুলোর কোনো অনুমোদন দেয়নি।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা