× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

দুর্ভোগের দিনলিপি

লাইনেই দিন কেটে যায় তেলের আশায়...

দীপক দেব

প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৩৫ এএম

আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৫৮ এএম

দেশের সব পাম্পে একই দৃশ্য। রবিবার তেজগাঁও ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশন থেকে তোলা। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

দেশের সব পাম্পে একই দৃশ্য। রবিবার তেজগাঁও ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশন থেকে তোলা। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

এসএমসি কোম্পানিতে গাড়িচালকের কাজ করেন আব্দুর রহমান মিয়া। নিজেই পেট্রোল পাম্পে এসে জ্বালানি তেল সংগ্রহ করেন তিনি। সবকিছুই ঠিকঠাক মতো চলছিল। তবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের জ্বালানি খাত পেরিয়ে তার জীবনেও। শুধু আব্দুর রহিমই নয়, তার মতো লাখ লাখ মানুষের জীবনে চরম দুর্ভোগ নেমে এসেছে।

গতকাল দুপুর ১টার কিছু আগে মহাখালী বাসস্ট্যান্ডের উল্টোদিকে অবস্থিত ক্লিন ফুয়েল থেকে অফিসের গাড়ির জন্য জ্বালানি তেল নিতে এসেছিলেন আব্দুর রহমান। তেল নেওয়ার জন্য গাড়ির লাইন তখন চলে এসেছে তেজগাঁও এলাকার ইমপালস হাসপাতালের সামনে। সেখান থেকে আধা কিলোমিটার পথ আসতে সময় লাগে সাড়ে ৩ ঘণ্টারও বেশি। তখনও মহাখালীতে অবস্থিত ক্লিন ফুয়েল পাম্প পর্যন্ত পৌঁছাতে আরও প্রায় আধা কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হবে। এই পুরোটা সময় বলতে গেলে তাকেই নিরুপায় হয়ে গাড়ির সঙ্গে থাকতে হচ্ছে। একটু-একটু করে গাড়ি এগোয় পাম্পের দিকে; কিন্তু এই সময় খাওয়াদাওয়া করার সুযোগটুকুও পান না তিনি। বাথরুমের সমস্যাও চরমভাবে ভোগাচ্ছে অপেক্ষমাণদের। আশপাশের অফিস বা বিপণিবিতান, এমনকি হোটেলগুলোও কোনো মানবিকতাও দেখাচ্ছে না তাদের। এর সঙ্গে গতকাল থেকে যুক্ত হয়েছে অসহনীয় গরম।

অসহায়ের মতো এই অসহনীয় দুর্ভোগের কথাই বলছিলেন চালক আব্দুর রহমান মিয়া, ‘কেউ আমাদের কথা শোনে না। এই দুর্ভোগ এখন আমাদের মতো মানুষদের জীবনের অংশ হয়ে গেছে। দুই থেকে তিন দিন পরপরই পোহাতে হচ্ছে এই দুর্ভোগ। কারণ দুই হাজার টাকার বেশি অকটেন দেয় না। তা দিয়ে সর্বোচ্চ দেড় থেকে দুই দিন যায়। অনেক হিসাব করে চালিয়েও ম্যানেজ করা যাচ্ছে না। পাম্প পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য অর্ধেক পথ আসতেই চলে গেছে সাড়ে ৩ ঘণ্টা। তেল পেতে লাগবে কমপক্ষে সাড়ে ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা। তিন-চার দিন আগেও একই সময় লেগেছে। গরমের কারণে আজ কষ্টটা বেশি।’

প্রসঙ্গত, গতকাল ছিল চৈত্র মাসের ২৯ তারিখ। বেলা ৩টা পর্যন্ত ঢাকার তাপমাত্রা ছিল ৩৬ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। 

সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে নিজে থেকেই এগিয়ে আসেন গ্রামীণফোন কোম্পানির গাড়িচালক মো. লিটন। তিনি বলেন, ‘ভাই এই পাম্প থেকেই তেল নিয়ে থাকি। আমাদের জন্য এখানকার মানুষজনের কোনো মায়া-দয়া নাই। প্রস্রাবের চাপ এলেও কেউ বাথরুম ব্যবহার করতে দেয় না। মুখের ওপর না বলে দেয়। এই বিষয় নিয়ে চালকরা খুব সমস্যার মধ্যে আছে। কারণ গাড়ি রেখে বেশি দূরে যাওয়ার সুযোগ নাই। এই কথা বুঝিয়ে বললেও কেউ আমাদের সঙ্গে মানবিকতা দেখায় না।’ বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে জ্বালানি তেল দেওয়ার পরিমাণ আরও বাড়ানোর জোর দাবি জানান গাড়িচালকরা। 

ক্লিন ফুয়েল পেট্রোল পাম্প পার হওয়ার পর এক থেকে দেড়শ গজ সামনে যাওয়ার পর শুরু হওয়া গাড়ির পার্স মার্কেটের সামনের রাস্তায় দেখা গেল আবারও গাড়ির লাইন। এক গাড়িচালক জানালেন, ‘প্রায় দেড় থেকে দুই কিলোমিটার দূরে বিজয় সরণিতে অবস্থিত ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনের লাইন এটা।’ বিকাল সাড়ে ৪টার পরে সেখানে অবস্থান করলে তেল পেতে পেতে কতক্ষণ লাগতে জানতে চাইলে পঞ্চাশোর্ধ্ব জাহাঙ্গীর মিয়া জানান, ‘কী করে বলব? তিন-চার দিন আগে এর থেকেও সামনে ছিলাম। সেই দিন মহাখালী সিগন্যাল থেকে প্রায় ৬ ঘণ্টা লেগেছিল। আজ কতক্ষণ লাগবে কে জানে।’

রবিবার রাজধানীর রমনা পাম্প থেকে শুরু করে সাতরাস্তার সিটি ফিলিং, মহাখালীর ক্লিন ফুয়েল ও ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনের চিত্র ছিল প্রায় একই রকম। প্রতিটি পাম্পের সামনে প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেলের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। লাইনে দাঁড়ানো মোটরসাইকেলের অধিকাংশই রাইট শেয়ারিংয়ের চালক। সিটি পাম্পের সামনে লাইনে দাঁড়ানো অবস্থায় সাইফুল নামের এক পাঠাও চালাক দেড় ঘণ্টার বেশি সময় ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে তেল নেওয়ার কথা জানিয়ে ক্ষোভ ঝাড়লেন। তিনি বলেন, ‘দিনের বেশি সময় যদি তেল নিতেই চলে যায় তাহলে খ্যাপ মারব কখন? বউ-বাচ্চারে কী খাওয়ামু?’ 

সাধারণত পাম্পগুলোতে পেট্রোল অকটেন ও ডিজেল সংগ্রহ করতে আসে প্রাইভোট কার, মোটরসাইকেল ও ছোটবড় মিকআপ ও কাভার্ডভ্যানের চালকরা। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) দেওয়া হিসাব অনুযায়ী প্রতিদিন সারা দেশে ডিজেল প্রয়োজন হয় ১৩ হাজার টন। প্রতিদিন পেট্রোল লাগে এক হাজার ৪০০ টন ও অকটেন লাগে এক হাজার ২০০ টন। সিটি পাম্পে তেল প্রদানের দায়িত্বে আছেন রফিক। তিনি জানান, বাইরের জেলার গাড়িগুলোকে দূরত্ব অনুযায়ী ডিজেল সরবরাহ করা হচ্ছে। এ ছাড়া ঢাকার গাড়িগুলোর মধ্যে কাভার্ড ভ্যানকে ৫০ লিটার, তিনটনি পিকআপগুলোকে ৩০ লিটার আর ছোট পিকআপগুলোকে দশ লিটার করে ডিজেল দেওয়া হচ্ছে।

বরাদ্দ বেশি করার দাবি চালকদের

রবিবার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে রমনা পেট্রোল পাম্পের সামনে কথা হয় ডাক্তার মাহবুবুল ইসলামের সঙ্গে। নিজেকে সার্জন পরিচয় দিয়ে তিনি বলেন, যাত্রাবাড়ীতে তিনি একটা ক্লিনিক চালান। যাতায়াতের সুবিধা ও জ্যামের কথা বিবেচনায় নিয়ে অধিকাংশ সময় সেগুনবাগিচার বাসা থেকে যাত্রাবাড়ী যান মোটরসাইকেল চালিয়ে। তিনি বলেন, ‘মাত্র ৫০০ টাকার তেল দিয়ে খুব বেশি লাভ হয় না। তিন থেকে চার দিন পর পরই তেল নিতে আসতে হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে থেকে কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। এজন্য ফুয়েল অ্যাপ ব্যবহারের মাধ্যমে কর্মজীবীদের এক দফায় ট্যাংক ফুল করে দিলে সকলের জন্যই ভালো হবে। মানুষের কর্মঘণ্টাও বাঁচবে।’

২৪ টাকা ৫৯ পয়সা বাড়ল ফার্নেস অয়েলের দাম

দেশে ফার্নেস অয়েলের (এইচএফও) বড় ধরনের দাম বৃদ্ধি করেছে বাংলাদেশ জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিইআরসি)। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতি লিটার ফার্নেস অয়েলের দাম ৭০ টাকা ১০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৯৪ টাকা ৬৯ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ লিটারে দাম বেড়েছে ২৪ টাকা ৫৯ পয়সা। নতুন এই মূল্য গতকাল রোববার মধ্যরাত ১২টা থেকে কার্যকর হয়েছে।

রবিবার জারি করা এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে কমিশন জানায়, বাংলাদেশ জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ কমিশন আইন, ২০০৩-এর ধারা ৩৪(৪) ও ৩৪(৬) অনুসারে এই মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এবং তেল বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে গণশুনানি শেষে বিস্তারিত পর্যালোচনা করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। চলতি বছরের মার্চ মাসে অপরিশোধিত তেল আমদানি না হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে পরিশোধিত ফার্নেস অয়েলের গড় দর এবং মার্কিন ডলারের বিনিময় হার বিবেচনায় নিয়ে মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। দাম বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প খাত এবং বৃহৎ জ্বালানিনির্ভর প্রতিষ্ঠানের ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

পরিধি বাড়ছে ফুয়েল অ্যাপের

গ্রাহক হয়রানি কমানো, সরবরাহ ঠিক রাখা ও অবৈধ মজুদ ঠেকাতে পরীক্ষামূলকভাবে রাজধানীতে ফুয়েল অ্যাপ চালু করার পর আস্তে আস্তে অন্য শহরগুলোতেও চালু করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে গতকাল রবিবার থেকে রাজশাহীতে ‘ফুয়েল ম্যানেজমেন্ট’ নামে মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে জ্বালানি তেল সরবরাহ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, নতুন এ ব্যবস্থায় রেশনিং পদ্ধতিতে জ্বালানি তেল বিক্রি করা হবে। একজন মোটরসাইকেলচালক পাঁচ দিনে একবার সর্বোচ্চ ৫০০ টাকার এবং মাইক্রোবাস বা প্রাইভেট কারের চালক সর্বোচ্চ ২ হাজার টাকার পেট্রোল বা ডিজেল কিনতে পারবেন।

এলএনজি নিয়ে বন্দরে ভিড়ল আরেক জাহাজ

এলএনজি নিয়ে আরও একটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে এসে পৌঁছেছে। কংটং নামের জাহাজটি রবিবার চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পৌঁছায় বলে জানিয়েছেন বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি জানান, জাহাজটিতে ৬৫ হাজার মেট্রিক টন এলএনজি আমদানি করা হয়েছে। এ নিয়ে গত তিন দিনে এলএনজি নিয়ে দুটি এবং এলপিজি নিয়ে চারটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে এসছে।

ইউপি চেয়ারম্যানের বাড়ি থেকে ডিজেল জব্দ

সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার মৌতলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ফেরদৌস মোড়লের বাড়ি থেকে রবিবার ১ হাজার ২০০ লিটার ডিজেল জব্দ করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। পরে ওই ঘটনায় তাকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

নারায়ণগঞ্জে ২২ হাজার লিটার জ্বালানি তেল জব্দ

নারায়ণগঞ্জের কাশীপুর সংলগ্ন চর সৈয়দপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রায় ২২ হাজার লিটার অবৈধভাবে মজুদকৃত জ্বালানি তেল জব্দ করেছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। রবিবার বিকালে কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

জীবননগরে অবৈধভাবে জ্বালানি তেল মজুদে জরিমানা

চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে পাম্পে তেল নিতে গিয়ে নির্দেশনা অমান্য করে বিশৃঙ্খলা এবং অবৈধ মজুদের দায়ে তিনজনকে চার হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। রবিবার জীবননগরের নাসিম ফিলিং স্টেশন ও অঙ্গন ফিলিং স্টেশনে অভিযান চালিয়ে এই জরিমানা করেন জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জমির উদ্দিন। তিনি বলেন, জনস্বার্থে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা