হাওরাঞ্চল
ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ১২ এপ্রিল ২০২৬ ১০:৩০ এএম
আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০২৬ ১৭:১০ পিএম
নেত্রকোনার মদন উপজেলার দেওসহিলা হাওরের বৃষ্টির পানিতে ডুবে গেছে ধান। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
হাওরাঞ্চলে শুরু হতে যাচ্ছে ধান কাটার উৎসবÑ কোথাও কোথাও আংশিকভাবে কাটাও শুরু হয়েছে। তবে অকাল বৃষ্টির পানিতে নিমজ্জিত হয়ে প্রায় সাড়ে তিন হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক স্থানে জমে থাকা পানির কারণে ধান কাটায় যন্ত্রের তুলনায় শ্রমিকের ওপর বেশি নির্ভর করতে হবে। ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে মৌসুম শুরু হলেও প্রয়োজনীয় সংখ্যক কম্বাইন হার্ভেস্টর নেই। ফলে দ্রুত ধান কেটে ঘরে তোলা নিয়ে কৃষকদের মধ্যে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) সূত্রে জানা গেছে, হাওরভুক্ত ৭টি জেলার আবাদকৃত জমির পরিমাণ প্রায় ৭ লাখ ৪০ হাজার ১৮৩ হেক্টর। যেখানে শুধু হাওরগুলোতেই সাড়ে চার লাখ হেক্টরে ধানের আবাদ হয়েছে। জেলার সব ধান দ্রুত কাটতে অন্তত সাড়ে ৭ হাজার কম্বাইন হার্ভেস্টর প্রয়োজন। যেখানে এই যন্ত্রটি সচল অবস্থায় আছে মাত্র ২ হাজার ৯৩০টি এবং মেরামতের অভাবে অচল অবস্থায় রয়েছে প্রায় ৪৪৫টি হার্ভেষ্টর। কৃষকরা বলছেন, সরকার যদি যন্ত্রগুলো সচলে সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত সহযোগিতা পাওয়া যেত তাহলে এই যন্ত্রগুলো দ্রুত সচল করে ধান কাটায় কাজে লাগানো যেত।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একেকটি হার্ভেষ্টর দিনে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টায় ৪ থেকে ৫ হেক্টর জমির ধান কাটতে পারে। তবে এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। একদিকে যেমন হার্ভেস্টর নষ্ট হয়ে পড়ে আছে, অন্যদিকে বিভিন্ন জেলা থেকে যন্ত্র আসা নিয়েও রয়েছে শঙ্কা। কেননা মার্কিন-ইসরায়েলের ইরানে আগ্রাসনের কারণে দেশে যন্ত্র চালানোর পর্যাপ্ত তেল পাওয়া নিয়েও রয়েছে অস্থিরতা। ফলে হাওরাঞ্চলে হার্ভেষ্টরের ঘাটতিও মাথাব্যথার কারণ হতে পারে।
নেত্রকোনা জেলার কৃষক সজিব আহমেদ জানান, তার একটি এমএম ওয়ার্ল্ড কম্বাইন হারভেস্টার রয়েছে। সেটির মেরামত চলছে। তবে মেরামতের জন্য অনেক খুচরা যন্ত্রাংশ কিনে সচল করতে হবে। খুচরা যন্ত্রাংশ পাওয়া নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে মেরামতের খরচেও তিনি উদ্বিগ্ন। এটি দিয়ে পুরো মৌসুমে চলবে কিনা সেই অনিশ্চয়তায়ও আছে।
সুনামগঞ্জ জেলার জামালগঞ্জ উপজেলার আব্দুল হান্নান বলছেন, সপ্তহের ব্যবধানে এখানে ধান কাটা শুরু হবে। আমার হারভেস্টারটি নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। কিছু যন্ত্রাংশের সহযোগিতা পেলে সচল করা সম্ভব হবে। এ অঞ্চলে অনেকের যন্ত্রই এভাবে পড়ে আছে। কিন্তু এগুলো দ্রুত সারানোর মত অবস্থা তাদের এখানে নেই। তিনি বলেন, হওরগুলোতে এ ধরনের বহু কম্বাইন হারভেস্টার রয়েছে যারা দ্রুত কিছু খুচরা যন্ত্রাংশের সাপোর্ট পেলেই অচল যন্ত্র থেকে সচল করতে পারে।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত ২ বছর যাবৎ সরকার কম্বাইন হারভেস্টারসহ বিভিন্ন কৃষিযন্ত্রে কোন ভর্তুকি দেয়নি। যার কারণে নতুন কোন কম্বাইন হারভেস্টার যন্ত্র কৃষকের হাতে পৌঁছেনি। পুরাতন যে সকল যন্ত্র রয়েছে তার মধ্যে বহু যন্ত্র মেরামতের অভাবে অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হাওরে ১৫ এপ্রিলের মধ্যে পুরোদমে ধান কাটা শুরু হবে। এই সময়ে হার্ভেষ্টরের সর্বোচ্চ প্রয়োজন। কারণ- যেকোন সময়ে হাওরে পাহাড়ি ঢল, বন্যা, বা অতিবৃষ্টিতে ফসলের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। এজন্য পাকা ধান ঘরে তোলার তোড়জোর থাকে প্রতি বছরই। কারণ, সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হাওরগুলোতে দেশের বোরো ধানের প্রায় ২০ শতাংশ আবাদ হয়। এবারে ইতোমধ্যেই শিলাবৃষ্টির কারণে সুনামগঞ্জে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছিল। যা উৎপাদনকেও ক্ষতির মুখে ফেলেছে।
সম্প্রতি ডিএই ও হাওরভুক্ত জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে একটি সভা করে। তবে সেখানে যন্ত্রের ব্যবহার, অন্য জেলা থেকে যন্ত্র সরবরাহ করা, অকেজো যন্ত্র মেরামত, পর্যাপ্ত তেলের সরবরাহ কীভাবে হবে না নিয়ে কোন নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। কৃষকরা বলছেন, এই সময়ে পর্যাপ্ত হার্ভেষ্ট না পেলে এবং পাকা ধান কোন কারণে দুর্যোগের কবলে পড়লে সংকটে পড়তে হবে কৃষককে। যার প্রভাব পড়বে দেশের খাদ্য নিরাপত্তার উপর।
কৃষি মন্ত্রণালয়ে গত ৫ এপ্রিল একটি সভা হয়। সেখানে বলা হয়, হাওরভুক্ত মোট ৭টি জেলায় এবারে ৪ লাখ ৫৫ হাজার ১৫৩ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হয়েছে। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি। এর মধ্যে সিলেট ও সুনামগঞ্জের হাওড়ে ইতোমধ্যেই অল্প পরিসরে ধান কাটা শুরু হয়েছে। এর মধ্যে কিশোরগঞ্জের হাওড়ভুক্ত ১১টি উপজেলায় ১২ থেকে ১৫ এপ্রিলের মধ্যে ধান কাটা শুরু হবে। যেখানে কোন অঞ্চলে কতটি হার্ভেষ্টর প্রয়োজন তার একটি তালিকা উপস্থাপন করা হলেও এর মধ্যে অকেজো হার্ভেষ্টরের সংখ্যা তুলে ধরা হয়নি।
সে সময় কৃষিমন্ত্রী আমিন উর রশিদ হাওড় অঞ্চলের আবহাওয়া পরিস্থিতি নজরে রাখার পাশাপাশি যে কোন জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলায় আগাম প্রস্তুতি রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ধান কাটার কম্বাইন্ড হার্ভেষ্টর যাতে পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রস্তুত রাখা হয় এবং যেগুলো অচল সেগুলো দ্রুত সচল করতে হবে। একইসঙ্গে হার্ভেষ্টার চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় তেলের কোন সংকট যাতে না হয় সেটাও সমন্বয় করার নির্দেশনা দেন।
কিন্তু এখন পর্যন্ত ডিএই এর পক্ষ থেকে অচল যন্ত্রগুলো সচল করা, অন্য জেলা থেকে হার্ভেষ্টর নিয়ে আসা কৃষকরা কিভাবে তেল সংগ্রহ করবেন সেসব বিষয়ে কার্যকর কোন পদক্ষেপ নেয়নি বলে জানা গেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সিলেট অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক ড. মোঃ মোশাররফ হোসেন বলেন, ৩ হাজার ৬৪০ হেক্টর জমি পানিতে নিমজ্জিত ছিল। সেখানে ৪০ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাকীগুলো রিকভারি হয়েছে। বিচ্ছিন্নভাবে ধান কাটা চলছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী সপ্তাহ থেকে পুরোদমে ধান কাটা শুরু হবে।
তিনি বলেন, এ বছর যন্ত্র ও শ্রমিক দুইভাবেই ধান কাটতে হবে। কেননা অনেক জমিতে বৃষ্টির কারণে হাওরে পানি জমায় হারভেস্টর চালানো সম্ভব হবে না। সিলেট বিভাগে ১৪০০ বেশি যন্ত্র সচল রয়েছে, আরো কিছু মেরামতের কাজ চলছে। পানি জমার কারণে হারভেস্টরের চেয়ে শ্রমিক দিয়ে ধান কাটাকে এ বছর প্রধান্য দিতে হচ্ছে।
হাওরে ধান কাটতে হারভেস্টরের সংকট কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে কৃষি সচিব রফিকুল ই মোহামেদ বলেন, আমাদের ১০৮টির মত হারভেস্টর যন্ত্র নষ্ট আছে, সেগুলো মেরামতের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এগুলো মেরামত হলে আশা করি কোন অসুবিধা হবে না। আর এ বছর আনুষ্ঠানিকভাবে ধান কাটার মত পরিস্থিতি হয়নি। অনেক স্থানে ধানে দুধ রয়ে গেছে, পরিপুষ্ট হয়নি। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয়ে কোন কৃষক ধান কেটে ফেললে তাতে ২০-৩০ শতাংশ চাল ওজনে কম হবে। এ ক্ষেত্রে কী নির্দেশনা রয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ধানের শক্তদানা না হলে কাটা যাবে না। কেননা দানা শক্ত হলে পরে ঘরে নিয়ে রাখলেও সেটি পরিপুষ্ট হয়ে যায়। তাই কোনভাবেই অপরিপক্ত ধান কাটা যাবে না।