ঢাকায় দূতাবাসের নিরাপত্তা
ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ১২ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৩৪ এএম
আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৩৫ এএম
ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস। ছবি: সংগৃহীত
ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে চায় দেশটি। এ লক্ষ্যে সন্ত্রাসবিরোধী সহায়তা কর্মসূচির আওতায় ‘বিশেষায়িত কুইক রেসপন্স’ তথা ‘জরুরি পুলিশ প্রতিক্রিয়া ইউনিট’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে মার্কিন সরকার। সম্প্রতি দূতাবাস থেকে এ সংক্রান্ত একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে। সেটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিদ্যমান একটি সমঝোতা স্মারক অনুসরণের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। এ নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখাগুলোর কাছে মতামত চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা চলছে। সংশ্লিষ্ট শাখা এ বিষয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সচিবকে অবহিত করবে বলে জানা গেছে।
সূত্র বলছে, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও যুক্তরাষ্ট্র সরকার ঢাকায় দূতাবাসের নিরাপত্তা জোরদার করতে এ ধরনের প্রস্তাব দিয়েছিল। সেটি নিয়ে দুদেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে একাধিকবার আলোচনাও হয়েছিল। তবে শেষপর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। পরে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার গঠনের পর বিষয়টি নিয়ে আবারও আলোচনা হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারের কাছে এ সংক্রান্ত প্রস্তাবনাও উপস্থাপন করেছে মার্কিন সরকার। সরকার সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তারা দুদেশের সমঝোতা স্মারকের আইনি কাঠামো এবং প্রাসঙ্গিকতা নিয়েও চুলচেরা বিশ্লেষণ করছে। প্রস্তাবটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারক অনুসরণের বিষয়টি সরকার খুব গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।
নিরাপত্তা সহযোগিতার নতুন অধ্যায় : বিশ্লেষকরা বলছেন, সন্ত্রাসবিরোধী সহায়তা কর্মসূচির আওতাধীন বিশেষায়িত পুলিশ কুইক রেসপন্স ইউনিট মূলত দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল নিরাপত্তা ইউনিটÑ যা উচ্চঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে সক্ষম। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্র তাদের কূটনৈতিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা জোরদারে এ ধরনের ইউনিট গঠনে সহায়তা করে। ঢাকায় এ ইউনিট গঠনের প্রস্তাব আসার অর্থ, বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি, সন্ত্রাসবাদ ও কূটনৈতিক স্থাপনায় হামলার ঝুঁকি বিবেচনায় এ উদ্যোগকে সময়োপযোগী বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করেন, ‘এটি শুধু একটি দূতাবাসের নিরাপত্তা উদ্যোগ নয়; বরং এটি দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতার গভীরতার একটি ইঙ্গিত।’
সমঝোতা স্মারকের আইনি কাঠামো ও প্রাসঙ্গিকতা : প্রস্তাবনায় উল্লেখিত সমঝোতা স্মারকটি মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে ‘সন্ত্রাস দমনে জোরদার সহযোগিতা ও সহায়তা’ বিষয়ক একটি কাঠামো। যদিও প্রস্তাবে কিছু বানান ও ভাষাগত অস্পষ্টতা রয়েছে, তবুও ধারণা করা হচ্ছে, এটি সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তার ওপর ভিত্তি করে গঠিত।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘যেকোনো বিদেশি সহায়তায় নিরাপত্তা ইউনিট গঠনের ক্ষেত্রে সার্বভৌমত্ব, আইনি এখতিয়ার এবং জবাবদিহিতাÑ এই তিনটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’ তাদের মতে, সমঝোতা স্মারকের শর্তাবলি স্পষ্টভাবে নির্ধারণ না হলে ভবিষ্যতে প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হতে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সমঝোতা স্মারক অনুসরণ করা হলে সেটির প্রতিটি ধারা খুঁটিয়ে দেখা জরুরি। বিশেষ করে কে কী নিয়ন্ত্রণ করবে, কার অধীনে কাজ করবে এবং তথ্য আদান-প্রদানের সীমা কোথায় ইত্যাদি নির্ধারণ করতে হবে। কারণ এসব সমঝোতা স্মারক বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টিভঙ্গি : এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখায় মতামত চাওয়ার নথি পাঠানোয় পর্যবেক্ষকদের অনেকে মনে করছেন, সরকার বিষয়টিকে গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করছে। একাধিক সংস্থা যেমনÑ পুলিশ, র্যাব এবং সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে মত নিয়ে এ বিষয়ে একটি সমন্বিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
নীতিনির্ধারকদের মতে, বাংলাদেশে বিদেশি কূটনৈতিক মিশনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আর সেই দায়িত্ব পালনে বিদেশি সহায়তা নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করাও জরুরি। তারা আরও বলেন, যদি এ ইউনিট গঠন করা হয়, তাহলে সেটি সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণেই থাকতে হবে এবং কোনোভাবেই বিদেশি বাহিনীর ভূমিকা সরাসরি অপারেশনাল থাকা উচিত নয়।
সন্ত্রাসবিরোধী সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ : এ ক্ষেত্রে সন্ত্রাসবিরোধী সহায়তা কর্মসূচির বিশেষায়িত পুলিশ জরুরি প্রতিক্রিয়া ইউনিট গঠনের মাধ্যমে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আধুনিক প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম ও কৌশলগত সহায়তা পেতে পারেÑ এমনটাই মনে করছেন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন, ইউনিটটি দ্রুত প্রতিক্রিয়া, ঝুঁকি বিশ্লেষণ, হোস্টেজ রেসকিউ এবং বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয়করণে দক্ষতা বাড়াবে। আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ বাংলাদেশের বাহিনীগুলোকে আরও দক্ষ ও পেশাদার করে তুলবে। বিশেষ করে নগর নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় এটি একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। তবে এ উদ্যোগ নিয়ে কিছু প্রশ্নও উঠছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘যেকোনো বিদেশি অংশগ্রহণ যেন দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থায় প্রভাব না ফেলেÑ সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।’ তাদের মতে, যদি এ ইউনিটের কার্যক্রম স্বচ্ছ ও সীমাবদ্ধ রাখা যায়, তাহলে এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। না হলে এটি রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও বাংলাদেশের অবস্থান : বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্র তাদের দূতাবাস নিরাপত্তা জোরদারে এ ধরনের ইউনিট গঠনে সহায়তা করেছে। আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশে এ উদ্যোগ ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানে থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যার অর্থ, বিশেষত ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে একটি সম্ভাবনাময় অংশীদার হিসেবে দেখা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগটি বৃহত্তর কৌশলগত সম্পর্কের অংশ হতে পারে, যা ভবিষ্যতে প্রতিরক্ষা এবং গোয়েন্দা সহযোগিতার পথও উন্মুক্ত করতে পারে।
সুযোগ ও সতর্কতার ভারসাম্য : সব মিলিয়ে, ঢাকায় সন্ত্রাসবিরোধী সহায়তা কর্মসূচির বিশেষায়িত পুলিশ জরুরি প্রতিক্রিয়া ইউনিট গঠনের প্রস্তাবটি একদিকে যেমন বাংলাদেশের নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করছে, অন্যদিকে এটি সার্বভৌমত্ব ও নীতিনির্ধারণী সংবেদনশীলতার একটি পরীক্ষাও হয়ে উঠছে।
এ প্রসঙ্গে নিরাপত্তা বিশ্লেষক কাজী শরীফ উদ্দিন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘সরকার যদি এ প্রস্তাব গ্রহণ করে, তাহলে একটি সুস্পষ্ট আইনি কাঠামো, স্বচ্ছতা এবং পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে জনগণের আস্থা অর্জন এবং রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরিও গুরুত্বপূর্ণ হবে। এটি সুযোগের জানালা।’ তবে সতর্কতার দরজা খোলা রেখেই সে পথে এগোতে হবে বলে মন্তব্য করেন এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক।