বিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০২৬ ১৯:১০ পিএম
আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০২৬ ১৯:১৩ পিএম
ক্ষেতে কৃষক সার দিচ্ছেন। ছবি: ইউএনবি
দেশের প্রায় ৪৪ হাজার নিবন্ধিত খুচরা সার বিক্রেতার কর্মসংস্থান বর্তমানে চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২৫ নীতিমালা’ বাস্তবায়নের ফলে দীর্ঘদিন ধরে অনুমোদিত কার্ডধারী এসব বিক্রেতার কার্যক্রম স্থগিত বা বাতিল করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও হতাশা ছড়িয়ে পড়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নীতিমালাটি পুনর্বিবেচনার দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী বিক্রেতারা।
খুচরা সার বিক্রেতারা জানান, ২০০৯ সাল থেকে সরকারি অনুমোদন নিয়ে তারা মাঠপর্যায়ে কৃষকদের কাছে নিরবচ্ছিন্নভাবে সার সরবরাহ করে আসছেন। দেশের প্রায় ৫ কোটি কৃষকের দোরগোড়ায় প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ পৌঁছে দিতে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। খুচরা সার বিক্রেতা সংগঠনের দাবি, জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধি এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা দীর্ঘ দেড় দশক ধরে কাজ করছেন। তবে নতুন নীতিমালার আওতায় তাদের নিবন্ধন বাতিল বা কার্যক্রম সীমিত করায় এই বিশাল কর্মসংস্থান খাতটি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, ব্যবসা পরিচালনার জন্য তারা বিভিন্ন ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়েছেন। এ ছাড়া কৃষকদের কাছেও তাদের বিপুল পরিমাণ অর্থ বকেয়া পড়ে আছে। নতুন নীতিমালার কারণে ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেলে ব্যাংক ঋণ পরিশোধ এবং কৃষকদের কাছ থেকে পাওনা টাকা আদায় করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
একাধিক বিক্রেতা আক্ষেপ করে বলেন, “আমরা অধিকাংশ সময় কৃষকদের বাকিতে সার দিয়েছি। এখন যদি আমাদের লাইসেন্স বা কার্ড বাতিল করা হয়, তবে সেই টাকা আর ফিরে পাওয়ার কোনো সুযোগ থাকবে না”। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই খাতের সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে যুক্ত কয়েক লাখ কর্মচারী ও তাদের পরিবার বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।
নীতিমালা বাতিলের দাবিতে ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় মানববন্ধন এবং স্মারকলিপি প্রদান করেছেন সার বিক্রেতারা। গত ৩, ৪ ও ১১ মার্চ ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে তারা বড় ধরনের মানববন্ধন ও সমাবেশ কর্মসূচি পালন করেন। তবে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি বলে জানিয়েছেন সংগঠনের নেতারা।
খুচরা সার বিক্রেতা অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি মো. ফোরকান এবং সাধারণ সম্পাদক মো. শাহিনুল ইসলাম (শাহীন) স্বাক্ষরিত এক আবেদনে বলা হয়েছে, কৃষি খাতে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই বিক্রেতাদের বিকল্প কোনো আয়ের উৎস নেই। তারা বলেন, “জীবনের এই পর্যায়ে এসে আমরা দিশেহারা। আমাদের কর্মসংস্থান রক্ষা না হলে হাজার হাজার পরিবার ধ্বংস হয়ে যাবে”।
মানবিক দিক বিবেচনায় নিয়ে এই ‘বৈষম্যমূলক’ নীতিমালা পুনর্বিবেচনা এবং আগের মতো কার্ড বহাল রেখে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিতে তারা প্রধানমন্ত্রীর দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মাঠপর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা এই বিতরণ ব্যবস্থা হঠাৎ ভেঙে পড়লে কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সারের সহজলভ্যতা বিঘ্নিত হলে কৃষকরা সংকটে পড়বেন, যা সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
বর্তমানে ৪৪ হাজার খুচরা বিক্রেতা ও তাদের ওপর নির্ভরশীল লাখ লাখ মানুষ সরকারের একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় দিন গুনছেন। তাদের প্রত্যাশা, সরকার দ্রুত এই সংকটের সমাধান করে দীর্ঘদিনের এই কর্মসংস্থান খাতকে রক্ষা করবে।