× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

চট্টগ্রাম বন্দর

জাহাজ ভিড়ছে বেশি, তেল আসছে কম

হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম

প্রকাশ : ০৬ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:৪৪ পিএম

আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:৫১ পিএম

চট্টগ্রাম বন্দর। ছবি: বাসস

চট্টগ্রাম বন্দর। ছবি: বাসস

গত ৯ মার্চ সিঙ্গাপুর থেকে ২০ হাজার টন হাইসালফার ফুয়েল অয়েল (এইচএসএফও) নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আসে এমটি ইল্যান্ড্রা স্প্রুস জাহাজ। এর ঠিক এক দিন আগে হাফনিয়া ববকাট নামে আরেকটি জাহাজ আসে এইচএসএফও নিয়ে। সেটিতেও আনা হয় ২০ হাজার টন তেল। অথচ চাইলে এই দুটি জাহাজের তেল একটি জাহাজে আনা সম্ভব ছিল। কারণ দুটি জাহাজেরই ধারণ ক্ষমতা ৫০ হাজার টন। 

জাহাজ মনিটরিং সাইট ভেসেল ফাইন্ডারের তথ্য অনুযায়ী, হাফনিয়া ববকাট জাহাজটি ২০১৪ সালে নির্মাণ করা হয়। সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী এ জাহাজটির ধারণক্ষমতা ৪৯ হাজার ৯৯৯ টন। অপর জাহাজ ইল্যান্ড্রা স্প্রুসের ধারণক্ষমতাও এর কাছাকাছি। ভেসেল ফাইন্ডারের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে নির্মিত মার্শাল আইল্যান্ডের পতাকাবাহী জাহাজটির ধারণক্ষমতা ৪৯ হাজার ৯৯০ টন। 

শুধু এ দুটি জাহাজ নয়, আমদানি করা জ্বালানি তেল নিয়ে মার্চ মাসে চট্টগ্রাম বন্দরে আসা প্রায় প্রতিটি জাহাজে ধারণক্ষমতার চেয়ে কম তেল আনা হয়েছে। ১৭ মার্চ সিঙ্গাপুর থেকে হাইসালফার ফুয়েল অয়েল নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আসে দুটি জাহাজ। এসসি গোল্ড ওশান জাহাজে আনা হয় ২৫ হাজার ২২ টন তেল। লেডি অব দরিয়া নামের অপর জাহাজটিতে করে আনা হয় ১৩ হাজার ৩ টন তেল। অথচ চাইলে এই তেল একটি জাহাজে আনা সম্ভব ছিল। কারণ ওইদিন তেল নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আসা দুটি জাহাজেরই ধারণক্ষমতা ছিল এর চেয়ে বেশি। এর মধ্যে বাংলাদেশের পতাকাবাহী লেডি অব দরিয়া জাহাজটিরই ধারণক্ষমতা ছিল ৪৬ হাজার ৮৪৬ টন। 

একটি জাহাজে ধারণক্ষমতার কম তেল নিয়ে এলে দুই ধরনের লোকসানের মুখোমুখি হতে হয় বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘টাইম অথবা ভয়েস চার্টারে জাহাজ ভাড়া করলে একটি জাহাজে যে পরিমাণ ধারণক্ষমতা, তার চেয়ে কম পণ্য নিয়ে আসা লোকসান। কারণ চার্টারার পণ্য কম আনার জন্য কম ভাড়া নেবে না। জাহাজের পূর্ণ ধারণক্ষমতা হিসেব করেই ভাড়া নেবে। ৫০ হাজার টনের জাহাজে আপনি ১০ হাজার টন আনলেন নাকি ২০ হাজার টন আনলেন সেটি ম্যাটার করবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘ধারণক্ষমতার কম পণ্য আনলে সময়েরও অপচয় হয়। কারণ বেশি জাহাজ হ্যান্ডল করতে সময়ও বেশি লাগে। অথচ সরকার চাইলে এখন বড় জাহাজে করেও জ্বালানি তেল আমদানি করতে পারে। বহির্নোঙরে মাদার ভেসেল (বড় জাহাজ) থেকে পাইপলাইনে তেল খালাসের জন্য বিপিসি মহেশখালীতে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। নির্মাণকাজ শেষে প্রকল্পটির কমিশনিং করা হয়েছে। কিন্তু এরপরও প্রকল্পটি এখনও চালু করা হচ্ছে না।’ 

গতানুগতিক পদ্ধতি সময়সাপেক্ষ, ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল হওয়ায় গভীর সমুদ্র থেকে সরাসরি পাইপলাইনে জ্বালানি তেল সরবরাহের জন্য ২০১৫ সালে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং প্রকল্প হাতে নেয় ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড। শুরুতে তিন বছরের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা থাকলেও পরে দুই দফায় সময় বাড়ানো হয়। তৃতীয় সংশোধনী অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন মেয়াদ শেষ হয় ২০২৩ সালের ৩০ জুন। এরপর চতুর্থ দফায় আরও এক বছর মেয়াদ বাড়ানো হয়। চতুর্থ দফায় বাড়ানো মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ২০২৪ সালের মার্চ মাসে প্রকল্পটি কমিশনিংয়ের কাজ শেষ হয়। কিন্তু এরপর দুই বছরের বেশি সময় পেরুলেও প্রকল্পটি চালু করতে পারেনি বিপিসি।

প্রকল্পটি চালু হলে জাহাজে করে আমদানি করা তেল মহেশখালীর গভীর সমুদ্র থেকে সরাসরি পাইপলাইনে ট্যাংকে নিয়ে আসা যাবে। এতে সময় এবং অর্থ দুটোই সাশ্রয় হবে। বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি চালু হলে সমপরিমাণ তেল পরিবহনে সময় লাগবে মাত্র ৪৮ ঘণ্টা। এতে বছরে সাশ্রয় হবে কমপক্ষে ৮০০ কোটি টাকা। 

বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি তেল নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আসে ১৭টি জাহাজ। এর মধ্যে মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুর থেকে ডিজেল নিয়ে আসে ৮টি জাহাজ। এই ৮টি জাহাজে করে মোট ২ লাখ ৩১ হাজার ২২৯ টন ডিজেল আমদানি করা হয়। এইচএসএফও নিয়ে এসেছে চারটি জাহাজ। চারটি জাহাজে করে আমদানি করা হয়েছে ৭৮ হাজার ২৫ টন ডিজেল। এ ছাড়া এবি অলিভিয়া ও অ্যাঞ্জেল নং-১১ নামের দুটি জাহাজে করে আনা হয়েছে ৯ হাজার ৯০৯ টন বেইস অয়েল, বে-ইয়াসু নামের একটি জাহাজে করে আনা হয়েছে ৫ হাজার ১৯ টন এমইজি, হুয়া শান নামের একটি জাহাজে করে ১৪ হাজার ৩৩০ টন কনডেনসেট এবং প্রাইমা ধর্ম নামের একটি জাহাজে করে ৫ হাজার ২২৬ টন ইথাইনেল আনা হয়েছে। 

৮টি জাহাজের প্রায় প্রত্যেকটির ধারণক্ষমতা ৫০ হাজার মেট্রিক টনের কাছাকাছি হলেও এসব জাহাজে করে আমদানি করা হয়েছে ২৭ থেকে সর্বোচ্চ ৩১ হাজার মেট্রিক টন তেল। অথচ চাইলে এসব জাহাজে করে আরও বেশি তেল আমদানি করা যেত। চাইলে একটি জাহাজে করেও এক লাখ টন জ্বালানি তেল আনা সম্ভব। কারণ ক্রুড অয়েল আমদানির ক্ষেত্রে একটি জাহাজে করেই আনা হয় এক লাখ মেট্রিক টনের অধিক তেল। 

শুধু যে মার্চ মাসেই এভাবে জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়েছে তা নয়, সারা বছর এভাবে একটি জাহাজে ২৭ থেকে ৩০ হাজার টন করে ডিজেল আমদানি করা হচ্ছে। এতে করে জ্বালানি তেল নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ আসার সংখ্যা বাড়লেও জ্বালানি তেল আমদানিতে সময়ক্ষেপণ হচ্ছে। 

ডিজেল নিয়ে আসা জাহাজগুলোর তথ্য অনুসন্ধান করে দেখা যায়, গত ৯ মার্চ সিঙ্গাপুর থেকে ডিজেল নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আসে জিউ চি জাহাজ। চীনের পতাকাবাহী জাহাজটির ধারণক্ষমতা ৪৮ হাজার ৭৮১ টন হলেও জাহাজটিতে করে আনা হয়েছে ২৭ হাজার ২০৪ টন ডিজেল। একই দিন সিঙ্গাপুর থেকে ডিজেল নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আসে লিয়ান হুয়ান হু জাহাজ। জাহাজটির ধারণক্ষমতা ৫০ হাজার ২৩৯ টন হলেও এতে করে আমদানি করা হয়েছে ২৭ হাজার ৫ টন ডিজেল। এরপর ১৩ মার্চ মালয়েশিয়া থেকে ডিজেল নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আসে এসপিটি থেমিস নামের জাহাজ। পানামার পতাকাবাহী জাহাজটির ধারণক্ষমতা ৫০ হাজার ২৮৬ টন হলেও জাহাজটিতে করে আমদানি করা হয়েছে ৩০ হাজার ৪৮৪ টন ডিজেল। ১৪ মার্চ সিঙ্গাপুর থেকে ডিজেল নিয়ে আসে এমটি রাফলস্ সামুরা। সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী জাহাজটির ধারণক্ষমতা ৪৫ হাজার ৭১৭ টন হলেও জাহাজটিতে করে আনা হয় ২৮ হাজার টন ডিজেল। ১৫ মার্চ মালয়েশিয়া থেকে আসে চ্যাং হ্যাং হং টু জাহাজ। চীনের পতাকাবাহী জাহাজটির ‍ধারণক্ষমতা ৪৫ হাজার ৭৬৫ টন হলেও জাহাজটিতে করে আনা হয়েছে ৩০ হাজার টন ডিজেল। এরপর ১৯ মার্চ মালয়েশিয়া থেকে তেল নিয়ে আসে প্যাসিফিক ইন্ডিয়াগো জাহাজ। লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী জাহাজটির ধারণক্ষমতা ৪৯ হাজার ৮৮৩ টন হলেও এতে আনা হয়েছে ২৭ হাজার ৩০৬ টন ডিজেল। ২৬ মার্চ সিঙ্গাপুর থেকে তেল নিয়ে আসে গ্র্যান কুভা জাহাজ। হংকংয়ের পতাকাবাহী জাহাজটির ধারণক্ষমতা ৪৭ হাজার ১২৮ টন হলেও জাহাজটিতে করে আনা হয় ৩১ হাজার ২৩০ টন ডিজেল। এরপর ৩০ মার্চ মালয়েশিয়া থেকে তেল নিয়ে আসে পিভিটি সোলানা জাহাজ। পানামার পতাকাবাহী জাহাজটির ধারণক্ষমতা ৫০ হাজার ১২৯ টন হলেও জাহাজটিতে করে আনা হয় ৩০ হাজার টন ডিজেল।

এ সম্পর্কে জানতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্য ও অপারেশনস) মুহাম্মদ মোরশেদ হোসাইন আজাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। এ বিষয়ে তিনি জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের নিযুক্ত ফোকাল পারসনের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। 

পরে এ বিষয়ে জানতে চাইলে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব (অপারেশন) মনির হোসেন চৌধুরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘তেল আমদানির জন্য আমরা যখন কোনো প্রতিষ্ঠানকে নিযুক্ত করি, তখন আমরা বছরের শুরুতে ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করি। সেই চুক্তি অনুযায়ী তিনি যখন সরবরাহ করবেন তখন এটি তার দায়িত্ব। চাইলেও আমরা সেখানে হস্তক্ষেপ করতে পারি না।’

‘চুক্তি অনুযায়ী পাঠালেও ওই প্রতিষ্ঠান তো জাহাজের ভাড়া, ইনস্যুরেন্স বিপিসির কাছ থেকেই আদায় করে। একসঙ্গে বেশি আনা গেলে তো এই ব্যয়টা কমত’Ñ এমন মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বলেন, ‘আপনি যে প্রশ্ন তুলেছেন, সেটিকে অমূলক বলা যাবে না। কিন্তু আমরা যেহেতু চুক্তি করে ফেলেছি, তাই চাইলেও এখন চুক্তির বাইরে গিয়ে আমাকে এক লাখ টন তেল একসঙ্গে পাঠান, সেটি বলতে পারব না। আর এক জাহাজে একসঙ্গে এক লাখ টন ডিজেল হয়তো আনা যাবে। কিন্তু তেল নিয়ে আসা জাহাজ সরাসরি জেটিতে ভেড়ানো যাবে না। বহির্নোঙরে রেখে লাইটার জাহাজের মাধ্যমে খালাস করতে হবে। লাইটারিং করতেও একটা খরচ যায়, সেটিও একেবারে কম না।’

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা